২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাংবাদিকদের ফুটবলার ভাবলো জনতা

সাংবাদিকদের ফুটবলার ভাবলো জনতা

রুমেল খান,নীলফামারী থেকে ॥ শুক্রবার আশুরার ছুটির কারণে বাংলাদেশের সব দৈনিক পত্রিকা ছিল বন্ধ। ওই দিনই নীলফামারীর শেখ কামাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় একটি ফিফা আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। যাতে মালদ্বীপের নিউ রেডিয়েন্ট ক্লাব মুখোমুখি হয় স্বাগতিক বসুন্ধরা কিংসের। উপভোগ্য-প্রতিদ্বন্দীতা পূর্ণ এই খেলায় জয়ের হাসি হাসে বসুন্ধরা কিংসই। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের নবাগত এবং নীলফামারীর স্টেডিয়ামটির এই মাঠকে নিজেদের ‘হোম ভেন্যু’ হিসেবে গ্রহণ করা বসুন্ধরা কিংস ‘এক হালি’ গোল উপহার দেয় সফরকারীদের! কোন সন্দেহ নেই, খেলা দেখে গাঁটের পয়সা পুরোপুরি উসুল হয়েছে গ্যালারিতে উপস্থিত ১৫ হাজারেরও বেশি ফুটবলপ্রেমীদের।

এ খেলা উপলক্ষ্যে ঢাকা থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নীলফামারী নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার ১২ ক্রীড়া সাংবাদিককে। যাদের মধ্যে ছিলাম আমি এবং আমার জনকণ্ঠের সহকর্মী জাহিদুল আলম জয়ও। বৃহস্পতিবার রাতে আমাদের বাস যাত্রা শুরু হয়। শুক্রবার সকালে গিয়ে পৌঁছি।

ভেন্যুতে পৌঁছার আগে দারুণ মজার একটি ঘটনার সম্মুখীন হই। আমরা তখন নীলফামারী শহরে ঢুকেছি। স্টেডিয়াম তখনও ১০ কিলোমিটার দূরে। চলন্ত বাসে বসে খেয়াল করলাম আমাদের বাসকে ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে! আর কাজটি করছে বসুন্ধরা কিংসের কিছু সমর্থক। তারা ১০টি মোটর সাইকেলে করে এসেছিল। প্রতিটি মোটর সাইকেলে দুজন করে বসা। সবার মাথায় ক্লাবের লোগো সংবলিত ব্যান্ড। পেছনের আরোহীর হাতে ক্লাবের পতাকা।

এ দৃশ্য দেখে কয়েক মাইলব্যাপী পথের দু’ধারে জমায়েত হাজারো জনতা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লো পুরোপুরি। তারা ধরেই নিল বাসের ভেতরের যাত্রীরাই হচ্ছে বসুন্ধরা কিংসের ফুটবলার, কোচ, ম্যানেজার এবং ফিজিও। এমনটা মনে করার কারণও ছিল। কারণ তারা বাসের জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখছিল বাসের কয়েকজনের পরনে ক্লাবটির জার্সি। যাদের পরনে জার্সি ছিল, তারা ছিল আসলে ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক বসুন্ধরা গ্রুপের কিছু প্রতিনিধি! যাহোক, জনতা আমাদের খেলোয়াড় ভেবে প্রচুর হাততালি দিয়ে, শ্লোগান দিয়ে এবং দুই আঙ্গুলে বিজয়-চিহ্ন দেখিয়ে যথেষ্ট ‘সম্মান’ দিল। এত সম্মান নিজেরা এর আগে কখনও পাইনি বলে সবাই একমত হলাম!

খেলা শেষে তড়িঘড়ি করে আবার ঢাকায় ফেরার পালা। তার আগে অবশ্য দু’দলকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে থাকতে হয়েছে। সেখানে নিউ রেডিয়েন্ট ক্লাবের কোচ সোবাহান মোহাম্মদ জানান, এই ম্যাচের প্রস্তুতির জন্য মাত্র দুই দিনের সময় পেয়েছেন তিনি। বলেন, ‘এখানে এসেছি লং জার্নি করে। কাজেই পুরো দল ক্লান্ত ছিল। তাছাড়া দেশে লীগ চলায় (নিউ রেডিয়েন্ট ক্লাব পয়েন্ট টেবিলের দুই নম্বরে আছে) বিশ্রাম দেবার জন্য আমরা এখানে ইচ্ছে করেই ভাল কিছু খেলোয়াড়কে আনিনি। সব মিলিয়ে ১২ জন। এছাড়া চোটে পড়ায় আমাদের এক নম্বর গোলরক্ষক এবং শীর্ষ ফরোয়ার্ড বাংলাদেশে আসেনি। কাজেই এই বিষয়গুলো খেলায় প্রভাব ফেলেছে। তবে এগুলো হারের জন্য কোন অজুহাত হতে পারে না।’

সোবাহান আরও যোগ করেন ‘কোন সন্দেহ নেই, বসুন্ধরা কিংস যোগ্য দল হিসেবেই এই ম্যাচ জিতেছে। তারা খুবই ভাল খেলেছে। তাদের আফ্রিকান ফরোয়ার্ডটাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে। তবে তাদের কোচের কৌশলই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জয়ের নেপথ্য রূপকার আসলে কোচই।’

সোবাহানের মতে এটা তাদের সেরা পারফরম্যান্স নয়, ‘হারলেও আমরা বেশ ভালই খেলেছি। ম্যাচে আমাদের দুটি নিশ্চিত গোল হয়নি। নইলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো। এটা একটি অনুশীলন ম্যাচ মাত্র। তাই এই ম্যাচের ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’

সবেশেষে তিনি বলেন, ‘মাঠে বিপুল দর্শক সমাগম দেখে সত্যিই অভিভূত হয়েছি। তারা নিশ্চয় খেলাটা বেশ উপভোগই করেছেন। তাছাড়া আমাদের এখানে যেভাবে আতিথেয়তা দেয়া হয়েছে, তার প্রশংসা করতেই হবে।’

বসুন্ধরা কিংসের কোচ অস্কার ব্রুজেন এই ম্যাচের জন্য দুই সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকটি গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে আমরা আরও বড় ব্যবধানে জিততে পারতাম। কাজেই জিতেও আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। বিশেষ করে আমার ডিফেন্ডাররা আজ একাধিক ভুল করেছে। সামনে লীগ। তার আগে তাদের এমন ভুল আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে।’

ব্রুজেন আরও জানান, তাদের দলটি গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। সামনেই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগে প্রথমবারের মতো খেলবে বসুন্ধরা। তার আগে দলের চেহারা কি হবে, এই ম্যাচ খেলার মাধ্যমেই সেটা নিরূপণের চেষ্টা করেছেন তিনি।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে অস্কার বলেন, ‘মালদ্বীপ কোচের সঙ্গে একমত নই। এটা শুধুই একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ ছিল না। এটা ছিল সিরিয়াস একটি ম্যাচ।’

বসুন্ধরা কিংসের অধিনায়ক ফরোয়ার্ড তৌহিদুল আলম সবুজ জানান, তাদের দলটি নতুন। দলের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ৪-৫ মাস ধরে খেলার বাইরে ছিল। সেই অবস্থা থেকে দলটিকে কঠোর প্রশিক্ষণ দিয়ে দাঁড় করিয়েছেন কোচ। তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রথম অধিনায়ক আমি। অভিষেকেই জয় পেয়েছি বলে খুবই রোমাঞ্চিত। আমাদের দলের বিদেশী খেলোয়াড়দের সবাই যে মানসম্পন্ন, সেটা এই খেলার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।’

সবুজ আরও যোগ করেন, ‘এই খেলায় জিতলেও আমাদের রক্ষণভাগে কিছু দুর্বলতা ছিল। আশা করি লীগ শুরুর আগেই এই সমস্যা কাটিয়ে দলকে আরও পরিণত করতে পারবেন কোচ।’

সংবাদ সম্মেলন শেষে বাসে চড়ে আবারও ঢাকায় ফেরার পথে বার বার মানসপটে ভাসতে লাগলো বসুন্ধরা কিংসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের দৃশ্যগুলো। যে দলে আছে রাশিয়া বিশ^কাপে খেলা ফুটবলার (কোস্টারিকান ফরোয়ার্ড ড্যানিয়েল কলিড্রেস), আসন্ন লীগে সেই দল কেমন ফল করবে, সেটা জানতে নিশ্চয়ই উন্মুখ হয়ে থাকবেন বাংলাদেশী ফুটবলপ্রেমীরা। তাই নয় কি?