২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লে. রফিকুল হাসান ॥ আমার প্রিয় ভাইটি

  • মরিয়ম খানম

২৩ সেপ্টেম্বর। আমাদের পরিবারের জন্য একটা কঠিন বিয়োগান্তক দিন। সেই ১৯৮১ সাল থেকে ২০১৮। অপেক্ষার দিন গুনছি। পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, ভেবেছিলামÑ আমার স্নেহের ছোট ভাই লে. রফিকের অপরাধের কালিমা কপাল থেকে মুছে যাবে, কিন্তু তা হয়নি। প্রিয় ভাইটি নির্মমভাবে- বড় অবেলায় এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে আমার মায়ের ‘কোলমোছা’ ছেলে লে. রফিকুল হাসান খানকে যশোর সেন্ট্রাল জেলে নিষ্ঠুরভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। অথচ আমার ভাইটি ডেথ সেলে আব্বার পা ছুঁয়ে বলেছিল, ‘আব্বা, আমি অস্ত্রও ধরিনি। কিভাবে এতবড় অপরাধী হলাম বুঝতেই পারলাম না।’ শেষ চিঠিতে লিখেছিল ‘একদিন সত্য প্রকাশ হবেই।’ মৃত্যুর পূর্বক্ষণে কেউ মিথ্যা বলতে পারে না। আইনের ছাত্রী হিসেবে তাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার ভাই নিরপরাধ ছিল। একজন সামান্য লেফটেন্ট্যাট হয়ে তার মেজর পানিশমেন্ট কিভাবে হয়? আমার মন মানতে রাজি নয়। ছেলেবেলা থেকে বড় হওয়াবধি তার ভেতর যা যা দেখেছি- অত্যন্ত মেধাবী, সুজন, ধার্মিক, ক্যাডেট কলেজের ডবল স্ট্যান্ড করা ছাত্র’ নির্লোভ, সৎ, পড়ুয়া, সাংস্কৃতিকমনা, দূরদর্র্শী একজন অত্যন্ত সুন্দর মানুষ হিসেবে। এমন একজন মানবিক ছেলে কখনও বড় ধরনের অপরাধ করতে পারে না। সে মিথ্যা কলঙ্ক নিয়ে সবার আগে চলে গেল। সেই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে একে একে মা, বাবা, বড়দা মনে ব্যথা নিয়ে ইহলোক ছেড়েছেন। আমরা যারা বেঁচে আছি তারাও সেই নিকশকালো জমাট বাঁধা পাথর বুকে নিয়েই আছি দীর্ঘদিন। ওপারে বসেও হয়ত রফিকের সঙ্গে অযাচিত যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন আমার বাবা-মাও।

আমার পরিবারের সকলেই মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল। আমার বাবা আনসারের উপ-পরিচালক ছিলেন। সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। রফিকও মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীদের সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। তখন সে ক্যাডেট ছিল? পুরো নয় মাসে বাবাসহ আমাদের পরিবারের সকলের অবদান রয়েছে। সেই পরিবারের কপালে এই নির্মম পুরস্কার জুটল! আমার বৃদ্ধ বাবা সে সময়ে কত দৌড়াদৌড়ি, অনশন করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আমার বাবার অনশন ভাঙ্গিয়ে ছিলেন শরবত খাইয়ে। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি।

রফিক আমার পিঠাপিঠি ভাই। ওর সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখের স্মৃতি, খুনসুটি, অন্তরঙ্গতা-স্নেহ-মমতায় জড়ানো জীবন ছিল। অত্যন্ত নির্মল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। জ্ঞানের পরিধিতে সে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই মিষ্টি, সুন্দর ভাইটিকে অসময়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আমার হৃদয়ের প্রতিটি প্রকোষ্ঠে রক্ত ঝরে। বেদনায় টনটন করে। ডেথসেলের স্মৃতি, দৃশ্য, ওর কথা ওর শারীরিক অমানুষিক নির্যাতনের শত শত চিহ্ন দেখে আমি ও মেজ মামা বুক ফাটা আর্তনাদে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম। সেলে থাকা মেজর ইয়াজদানী, লে. কর্নেল দেলোয়ার ও সিকিউরিটি গার্ডরাও কেঁদেছিল। দুই ভাই-বোনের দুঃখস্নাত মিলনে। কয়েকজন গার্ড আমাকে বলেছিল, ‘রফিক স্যার খুব ভাল মানুষ।’ আমাকে দেখা মাত্র রফিক শার্ট গায়ে দিতে দিতে বলে উঠেছিল, ‘ছোড়দি এসেছিস। মন আজ সারাদিন বলছে আমার আপন কেউ আমায় দেখতে আসবে।’ সেই শেষ দেখায়Ñ রফিক খুব খুশি হয়েছিল। রফিকের মতো মেধাবী অফিসার বেঁচে থাকলে দেশে অনেক অবদান রাখত। আমার মনে হয় রফিক অন্য পৃথিবী থেকে আক্ষেপের সুরে যেন বলছে, ‘কত বড় বড় অপরাধী বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকে। আর অপরাধের কারণ না জেনেই মাত্র তেইশ বছর বয়সে আমাকে সুন্দর বাংলাদেশ থেকে চিরবিদায় নিতে হলো। স্বাধীন সুন্দর দেশ উপভোগ করতেও পারলাম না।’

আমার বাবা তার কবরের এপিটাকে লিখে গেছেন, ‘মরণ বিনাশ নহে নবীন বরণ একই নাটকের দৃশ্য বিবিধ ধরন।’

আজ আমার ভাইয়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। বয়স হয়েছে। অসংখ্য স্মৃতি অক্টোপাসের মতো চেপে ধরছে। মন কাঁদছে। শেষ ঈদে বলেছিল, ‘আমাকে তোরা আউট অব সিলেবাস ভাববি। কখন ঢিস্্ ঢিস্্। শুনবি আমি নেই।... এবার তোদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটল। আর কোন ঈদ আমার জীবনে আসবে না। এরপর আমার লাশ আসবে।...’ আমরা বিস্ময়ে হতবাক। ভাবিনি তার সব ব্যথা সত্যি হয়ে যাবে। তার অনেক স্বপ্ন ছিল। শখ ছিল আমাকে হেলিকপ্টারে চড়িয়ে ঘোরাবে। মাকে ‘সেভেন হেভেন’ শাড়ি কিনে পরাবে। আমার বড়দির ছেলে সুইটকে কাছে নিয়ে মানুষ করবে। তার কোন স্বপ্নই পূরণ হয়নি। সে কি দোষ করেছিল আজও আমরা কেউ জানতে পারিনি। সে লিখে গেছে, ‘আমি তোদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আব্বা-মা আমাকে বড় কষ্ট করে মানুষ করেছিল। তাঁদেরও দুঃখ ছাড়া কিছুই দিয়ে যেতে পারলাম না।’

বিদায়ের আগে তার লেখা সংক্ষিপ্ত করে কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করলাম।-

* অন্ধকারের অবসানেই আলো- আত্মাহুতির পরই আত্মার প্রতিষ্ঠা।

* ‘রফিক’ স্মরণ কর তুমি সেই সৌভাগ্যবান : তুমি ‘মরিয়া’ এখনও বাঁচিয়া আছো মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে,

* চরম গ্লানিতে এমন গ্লানি পেয়েছ যার পর সুখ ছাড়া অসম্ভব।

* চরম ভীতিতে এত ভীতি প্রদর্শিত হয়েছ যে, যার পর নিরাপত্তার আশ্রয়ই সম্ভব।

* চরম অসম্মানিতে, এত অসম্মানিত হয়েছ যে, এরপর সম্মানই শুধু সম্ভব।

* ধোঁকাবাজ সংসারের বিশ্বাস ঘাতকতায় বিপন্ন ও ধ্বংস হয়েছ। একবার! সাবধান !! দ্বিতীয়বার আর নয়!

* সবকিছুই আল্লাহর দান। প্রশংসিত আল্লাহ পরম পবিত্র।

* আলহাম্দোল্লিাহে আলা কুল্লে হাল।

আমি কৃতজ্ঞতা জানাই সিনিয়র সাংবাদিক জ.ই মামুনকে। তিনি ওই সময় আমার হতভাগ্য পিতা-মাতার আর্তি শুনেছেন। রক্তমাখা কাপড় দেখেছেন। ছবিসহ আমার বাবা-মার সাক্ষাতকার ছেপেছেন ‘ভোরের কাগজে’। আরও ক’জন সাংবাদিক গেছেন আমার বাবার বাড়িতে। আমি সকলের কাছে দোয়া চাইছি রফিকের আত্মার শান্তির জন্য। মহান সৃষ্টিকর্তার অনুমতি ও আমার সক্ষমতা হলে আমি দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের জন্য ‘লে. রফিক স্মৃতি বৃত্তি’ মেহেরপুরে চালু করে যেতে চাই। এটা আমার জীবনের শেষ স্বপ্ন।

আমাদের পরমপ্রিয় প্রভু যেন আমার ছোট ভাইটির ‘কলঙ্ক’ একদিন দূর করে দেন। এই আমার প্রার্থনা। অপরাধ মুক্তির বার্তা পেলে আমি পরপার থেকে স্নেহাস্পদ রফিককে কোলে জড়িয়ে ধরে সুখের হাসিতে প্লাবিত হব। আমার পরিবারের জীবিত প্রজন্মরা ‘কলঙ্ক’মুক্ত হয়ে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে মেহেরপুরের মাটিতে বেঁচে থাকবে চিরকাল।

লেখক : লে. রফিকের বড় বোন