১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সড়ক যাত্রায় জনতার ঢল

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সড়ক যাত্রায় জনতার ঢল
  • আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য হতে পারে না ॥ কাদের

রাজন ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম থেকে ॥ আকাশ ও রেলপথের পর এবার সড়কপথে নির্বাচনী যাত্রা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী যাত্রার ধারাবাহিকতায় শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত তিনদিনের এই সড়কযাত্রা শুরু হয়েছে ক্ষমতাসীন দলটির। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সকালে রাজধানীর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানম-ির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে শুরু হওয়া দেশের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের এই সফরের সড়কযাত্রা রাতে চট্টগ্রাম পৌঁছে। এর আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চারটি জনসভা ও পথসভায় বক্তব্য রেখেছেন ওবায়দুল কাদেরসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রতিটি জনসভা ও পথসভায় হাজার হাজার নেতাকর্মী এবং মানুষের উপস্থিতিতে জনারণ্যে পরিণত হয়েছিল। পথে পথে মানুষের ঢল নেমেছিল। যাত্রাপথে হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার-ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্বাগত জানান নেতাদের। কোথাও কোথাও ফুল ছিটিয়ে বরণ করে নেয়া হয়েছে তাদের। মুহুমুর্হু স্লোগানের পাশাপাশি ব্যান্ডপার্টি ও বাদ্যবাজনার তালে তালে নেচেগেয়ে উৎসবমুখর পরিবেশের সূচনা ঘটায় নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের মনোয়নপ্রত্যাশী ও তাদের সমর্থক নেতাকর্মীদের ব্যাপক শোডাউন ছিল চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে সর্বত্র আগাম নির্বাচনী আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল।

এসব সভায় ওবায়দুল কাদের বিএনপি ও যুক্তফ্রন্ট নেতাদের কথিত ‘জাতীয় ঐক্যের’ কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোন জাতীয় ঐক্য হতে পারে না। বিএনপির এই ঐক্য তথাকথিত জাতীয় ঐক্য। বিএনপি যে ঐক্য করছে সেটা সাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্য। যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে, তাদের নিয়ে জাতীয় ঐক্য হবে- দেশের মানুষ সেটি বিশ্বাস করে না। তারা ঘরের মধ্যে নেতায় নেতায় ঐক্য করে। তাদের ঠিকানা পল্টন, রাজপথ নয়। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে

যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এসব সভায় ওবায়দুল কাদের জনসাধারণের মাঝে আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম তুলে ধরার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচার চালান। তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক নৌকা ভাসতে ভাসতে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছবে। এসব জনসভা ও পথসভায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও বক্তব্য রাখেন দলের সভাপতিম-লীর সদস্য এ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম এনামুল হক শামীম, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকসহ আরও অনেকে।

শনিবার সকাল সাড়ে আটটায় রাজধানীর ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলটির এ নির্বাচনী সড়কযাত্রা শুরু হয়। কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ পৌঁছে সেখানকার রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রথম পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে কুমিল্লা শহরের টাউন হল মাঠে জনসভা, চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠে জনসভা এবং সর্বশেষ ফেনী শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মাঠে পথসভা হয়।

ফেনী পথসভায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জাতিসংঘ প্রতিনিধির সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক প্রসঙ্গে বলেন, জাতিসংঘ থেকে বিএনপিকে দাওয়াত করা হয়নি। এই দাওয়াতের কথা ভুয়া।

বিএনপিও একটি ভুয়া, প্রতারক ও দুর্নীতিবাজের দল। তাদের আমলে দেশ পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে না চাইলে দ্রুত কেন্দ্র কমিটি গঠন করুন। কেন্দ্র রক্ষার ব্যবস্থা করুন। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা করবেন না। মশারির মধ্যে মশারি টানাবেন না। নানা অপকর্ম করে যারা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়েছেন, তারা আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। জনগণের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। ফেনীবাসীর উদ্দেশে সেতুমন্ত্রী বলেন, আমাদের কোন ভুলত্রুটি হয়ে ক্ষমা করে দেবেন। চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে। ভবিষ্যতে ভুলত্রুটি শুধরে চলার চেষ্টা করব। আগামী নির্বাচনে নারী ও তরুণ ভোটাররাই আওয়ামী লীগের বিজয়ের প্রধান হাতিয়ার হবে।

এই পথসভায় সভাপতিত্ব করেন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান বিকম। এর আগে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জনসভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগের বিকল্প আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে হলে আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিএনপি জামায়াত আবারও ক্ষমতায় এলে দেশে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। কেউ বাঁচতে পারবে না, সবাই লাশ হয়ে যাবে। তাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গণজোয়ার দেখে বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার পাঁয়তারা করছে। বিএনপি নেতায় নেতায় ঐক্য করে জনগণের সঙ্গে করে না। তাই তাদের ঠিকানা রাজপথে নয়। আওয়ামী লীগ এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, অক্টোবরে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হবে। আপনারা যাকে চান তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। চৌদ্দগ্রাম হাইস্কুল মাঠের এ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুস সোবহান ভূঁইয়া হাসান।

কুমিল্লা টাউন হল ময়দানের জনসভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি হচ্ছে নালিশ পার্টি। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ছাড়া তারা কিছুই বোঝে না। তারা বিভিন্ন দেশে ঘুরে দেশের বিরুদ্ধে নালিশ ও ষড়যন্ত্র করছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে হারিয়ে সব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে হবে। বিএনপির কাছে দেশের গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার।

কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জের পথসভায় ওবায়দুল কাদের আগামী জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে পথসভাগুলো বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হচ্ছে। এটা আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থার প্রতিফলন।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রতিহত করার নামে বিএনপি যে জ্বালাও-পোড়াও ও আগুন সন্ত্রাস করেছিল এবারও তেমন কিছুর চেষ্টা করলে জনগণকে তা মোকাবেলা করতে হবে। রুখে দিতে হবে।

দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রার্থী হবেন ভাল কথা। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের অপকর্মের বিরুদ্ধে না বলে চায়ের স্টলে বসে নিজ দলের এমপি ও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কথা বলবেন না। এটা যারা করবেন, তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না। নেত্রীর কাছে সবার আমলনামা জমা আছে।

অপকর্মের জন্য যারা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য, তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না।

দলের ভেতরে দ্বন্দ্ব-কোন্দল না করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঘরের মধ্যে ঘর করবেন না। পকেট কমিটি করবেন না। দুঃসময়ের কর্মীদের মূল্যায়ন করবেন। দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরা দল ছেড়ে যায় না। অতিথি পাখিরা দলের দুঃসময় এলে দল ছেড়ে যায়। এর আগে সকালে সড়কযাত্রা শুরুর আগে ধানম-ি কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের কাদের বলেন, মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে আশা করি। সমাবেশে যদি কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়েছে। সর্বশেষ আইআরআইর জরিপে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ৬৬ শতাংশ ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ৬৪ শতাংশ। মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক নৌকা। ডিসেম্বরের নির্বাচনে এই নৌকা ভাসতে ভাসতে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে যাবে।

এদিকে, ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা শনিবার রাতে চট্টগ্রামে রাত্রিযাপন করেছেন। আজ রবিবার কক্সবাজার সফর শেষে আগামীকাল সোমবার বিমানযোগে ঢাকায় ফিরবেন তারা। সফরকালে বিভিন্ন স্থানে সব মিলিয়ে ১০ পথসভা, জনসভা, কর্মীসভা ও সুধী সমাবেশ করার কথা রয়েছে।

এর আগে গত ৩০ আগস্ট আকাশপথে ঢাকা থেকে সিলেট গিয়ে সেখানে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। পরে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা-নীলফামারী নির্বাচনী ট্রেনযাত্রা করে দলটি। আগামী ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা-পটুয়াখালী-বরগুনা লঞ্চযাত্রা করবে তারা।