২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি-জামায়াত পুনর্বাসনে ঐক্যপ্রকল্প

  • জাফর ওয়াজেদ

ভোটের দামামা বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চজুড়ে শুরু হয়ে গেছে দাপাদাপি। নাটকের মহড়া শেষে যখন মঞ্চায়ন চলছে, তখন দেখা গেছে কুশীলবদের অনেকে ঘুমের রাজ্যে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আসা দেহ আর জেগে থাকার ফুরসত পায় না। দেশভাবনা তাদের এতই বিচলিত করছে যে, দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়ার পথে নেমেছেন সম্ভবত। স্বাধীনতার পূর্বকালে, এমন কী স্বাধীনতা-উত্তর অনেক সময় জুড়ে রাজনীতিকদের একটা বড় অংশ ছিল যাঁদের দিকে মাথা উচুঁ করে তাকাতে হতো। এতটাই বিশাল ছিলেন তাঁরা। সেই উচ্চতা তৈরি করেছিল তাদের শিক্ষা, রুচি, হৃদয়ের ব্যাপ্তি, চিন্তার সৌকর্য। আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও ছিলেন এমন স্তরের নেতৃবৃন্দ, যাদের প্রতি মানুষের সম্মান ছিল গভীরতর। সে সবই সময়ের স্রোতে ভেসে গেছে। এখনকার অধিকাংশ রাজনীতিকদের ভাষা মাথা উঁচুর বদলে হেঁট করে দেয়। ডানে বামে, স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে সেখানে কোন ফারাক নেই। মতের বিরোধিতায় যুক্তি যখন দুর্বল হয়, বিচার বোধ যখন পিছনের সারিতে যায়, স্বর তখনই উচ্চনাদে যায়। এবং ভাষা হতে থাকে অভব্য, অচিন্তনীয়, ক্ষেত্র বিশেষে শ্লীলতার সীমানা ছাড়ানো। দোষটা শুধু তাদেরই দেয়া চলে না। কারণ যে মাঠে অভব্যতার ফোয়ারা ছোটে, সে মাঠেই তুমুল হর্ষধ্বনিতে আরও উৎসাহ যোগায়। অন্যায় প্রশ্রয় পায় শ্রোতাদেরই কাছে। অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রর ভাষাও অরাজনৈতিক আবরণে প্রকম্পিত হয়। ক্ষুদ্র হয়ে বৃহতের উদ্দেশ্যে যদি আস্ফালন করা হয়; তাতেও মুখটা আকাশের দিকেই করতে হয়। আর পুরনো সেই কথাটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আকাশের দিকে ছোড়া থুতু আকাশ স্পর্শ করে না। স্পর্শ করে জানেন ভুক্তভোগীরা।

মহানগর নাট্যমঞ্চে মঞ্চস্থ হয়ে যাওয়া নাটকে নানা কিসিমের রাজনীতিকরা যেভাবে সংলাপ আওড়ালেন, দৃশ্যপটে তুলে ধরলেন নিজেদের স্বপ্নে পাওয়া মহোষৌধ, আর তা জনগণের মাঝে বিতরণের জন্য সোল্লাসে ফেটে পড়লেন। হাতে হাত রেখে শপথ বাক্য পাঠ না করলেও বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, এই হাতেই তারা দিনকে রাত, আর রাতকে দিন করতে চান। স্বপ্ন তাদের ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে দেশবাসীকে সুখের নহরে ভাসাবেন। অথচ নিজেরাও জানেন, সেই ক্ষমতা নেই তাদের। সেরকম কোন কাজের সঙ্গে অতীতেও ছিল না তাদের সম্পৃক্তি। নেতায় নেতায় ঐক্য স্থাপনের যে নাটক মঞ্চস্থ হলো তাতে দৃশ্যমান চরিত্রগুলো সম্পর্কে দেশবাসীর অজানা কিছুই নেই। কার সঙ্গে কার ঐক্য হতে পারে, সেই ঐক্যই বা কি ফল বয়ে আনবে- এ নিয়ে নানামুখী কথাবার্তা হতেই পারে। এতকাল পরে এসে এই যে, জাতীয় ঐক্য গঠনের জন্য চিৎকার চেঁচামেচি, হৈহল্লা শুরু হয়েছে, তা কিসের জন্য? প্রশ্ন উঠতেই পারে, দেশে এমনকি পরিস্থিতি হয়েছে। যার জন্য বৃদ্ধ, প্রবীণ, অতি বৃদ্ধরা একত্রিত হয়েছে? তারা দেশকে বাঁচাতে চায়? কিসের হাত থেকে? মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথ থেকে ফিরিয়ে এনে নিম্ন আয়ের দেশে পরিণত করে মানুষকে গরিব, অতি দরিদ্র, হতদরিদ্র স্তরে নামাতে? মানুষ যাতে ঋণগ্রস্ত হয়ে ক্ষুদ্র ঋণের নাগপাশে বাধা পড়তে পারে, দুবেলা দুমুঠো খাবারের অভাবে যাতে ভিক্ষাবৃত্তিতে ফিরে যেতে পারে, আবার হাওয়া ভবন, খাম্বাকাল চালু হতে পারে- সেসব পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় ঐক্য আজ তাদের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় ঐক্যের নামে জনভিত্তিহীন আসন বঞ্চিত নেতা, রাজনৈতিক দালাল ও বিতর্কিত সুশীলদের তৎপরতা বেড়েছে বুঝি তাই। মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ স্বচ্ছল হয়ে উঠার ফলে অনেক নেতার পক্ষেই দরিদ্রকে পুঁজি করে যেমন রাজনীতি করার সুযোগ নেই, তেমনি ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে শোষণের হাতিয়ার বানানোর সব ক্রিয়াকর্ম নির্বাসিত প্রায়। ফেসবুক বন্ধু ফিরোজ আলম উল্লেখ করেছেন, বর্তমান বাংলাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক লেনদেনের দর কষাকষির ওপর ভিত্তি করে যে যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে; আপাতদৃষ্টিতে তার নেতৃত্বে ড. কামাল হোসেন, ডাঃ বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন এবং নেপথ্যে থাকা ড. মুহম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনের এতিম ও দেউলিয়া হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এরশাদের একদা গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা, যিনি বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে এতিম হিসেবে পরিগণিত। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু মৌসুমি রাজনৈতিক খুচরা ব্যবসায়ী। কুরবানীর চামড়ার ব্যবসার মতো নির্বাচন এলে এরা নেমে যায় চামড়া কেনায়। আবার নির্বাচন শেষে হারিয়ে যায়। বাস্তবসম্মত তার এই বক্তব্য স্পষ্ট করে নাট্যমঞ্চে ঐক্য প্রক্রিয়ায় মূল চরিত্র, পার্শ্ব চরিত্র, ভিলেন চরিত্র, জীবিত ও মৃত সৈনিক চরিত্রে যারা হাজির হয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে নারী চরিত্র নেই। নারী চরিত্র বিবর্জিত হলেও এই নাটকের মূলই হচ্ছেন একজন নারী। যিনি জেলবন্দী। দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেল খাটছেন। অবশ্য তিনি যেখানে অবস্থান করছেন, তা আসলে এখন আর জেলখানা নয়। পরিত্যক্ত কারাগারের একটি কক্ষে তার অবস্থান। যে কারাগারটি অচিরেই হয়ে উঠবে বিনোদন কেন্দ্র। সুসজ্জিত সেই কক্ষে রাখার ব্যবস্থাটুকু করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জেলকোর্ডের বিধি বিধানকে এড়িয়ে এই ব্যবস্থাদি সরকারের মহানুভবতাকেই প্রমাণ করে। সেই কক্ষে এসি, টিভি, ফ্রিজও রয়েছে। রয়েছে ‘মেইড সার্ভেন্ট’। রাজনৈতিকভাবে যদি সরকার তাকে জেলে পাঠাতে চাইতো, তবে ২০১৪, ১৫ ও ১৬ সালে বিএনপি নেত্রী যে ভয়াবহ সন্ত্রাস চালিয়েছেন, তা-ই ছিল যথেষ্ট। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতই তাকে জেলে পাঠিয়েছেন। একজন আইনজীবী হিসেবে ড. কামাল কেমন করে দুর্নীতির জন্য সাজাপ্রাপ্তের মুক্তি চাইছেন? যে মির্জা আলমগীরের হাতে হাত রেখেছেন, সেই বিএনপি মহাসচিবের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি কি উদগ্রীব হতে পারেন? যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া ব্যক্তির দলের সঙ্গে হাত মেলাতে কামাল হোসেনের হাত একটুও কেঁপে উঠতে দেখেনি কেউ। সুশাসন আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই যে এতদিন ধরে বাতচিত করে আসছেন তিনি, তার পরিণতি আজ পরিষ্কার। সাজাপ্রাপ্ত নেতা-নেত্রীদের নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে কামাল হোসেনের ঐক্যতানে টান দেয়ার মধ্য দিয়ে অপরাধের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করারই নামান্তর বলা যায়। কামাল হোসেনদের কাঁধে চড়ে বিএনপি আসলে কোথায় যেতে চায়? বলা হবে এটা নির্বাচনী ঐক্য। কামাল হোসেনগংদের তিনশ আসনে প্রার্থী দেয়ার অবস্থা বা ক্ষমতা নেই। সবাই রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্ব গ্রহণ করেছে। এমনিতেই গণফোরাম নির্বাচনে অংশ নেয় না। সেখানে কামালদের সামনে রেখে বিএনপি অনেক বড় কিছু হাসিল করতে চায়। যদিও তাদের জানা যে, জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে এগুলে কোন ফলাফল আসবে না। তারপরও জনবিচ্ছিন্ন বিএনপি এবং আত্মগোপনে থাকা জামায়াতকে ভর করতে হয়েছে কামালদের ওপর। বিএনপি-জামায়াত চায় ক্ষমতা আর কামালরা চায় ক্ষমতার ভাগ। বানরের পিঠা ভাগের মতো। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার গরজ এই দুই পক্ষের ফিফটি-ফিফটি বা কমবেশি। বিএনপি-জামায়াত তাদের অতীত-দুষ্কর্মকে হালাল করার জন্য কামাল, বদরুদ্দোজা, মঈনুল, ইউনূস, জাফরউল্লাহ, রব, এমনকি হেফাজতে ইসলামকে সঙ্গে নিয়েছে। মূষিকদের ঘাড়ে চড়ে পর্বত পাড়ি দেয়ার জন্য যতই আয়োজন করুক না কেন, এক পর্যায়ে মূষিকের প্রাণসংহার হওয়া ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। তথাপি ১/১১-এর কুশীলবরাও এতে যোগ দিয়েছে। যারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনার পতন, শেখ হাসিনাকে অপমান করা বা তার সরকারের পতনই হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের প্রচেষ্টা। এই পতন ছাড়া খালেদা-তারেকের নাট্যমঞ্চে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ থাকছে না। যদিও এই ঐক্যে তেমন একজনও নেতা নেই যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার ও শাস্তির পক্ষে কথা বলেছেন। বরং অনেকেই সেসব যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীর পক্ষে সাফাই গেয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণ করেছেন।

রাজনীতিতে ড. কামালের সাফল্যের ঝুলি শূন্য। তিনি যেখানেই রেখেছেন হাত, সেখানেই ধ্বংসের বারতা পৌঁছেছে। বাম দলগুলোর সমন্বয়ক কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন এক সময়। সেই বামেরা শতধাবিভক্ত হয়েছে। বিস্ময়কর যে, কামাল হোসেন সমাজতন্ত্রী বা বামঘেঁষা নন। বরং কট্টর ডান। তারই পেছনে বামরা জড়ো হয়েছিল, যারা কামালকে এক সময় ‘সিআইএর দালাল’ বলে অভিহিত করতেন। কামাল হোসেন রাজনীতিতে একজন ব্যর্থকাম মানুষ। এই ব্যর্থকাম মানুষ অনেক সময় অনর্থ ঘটায়। আগামীতেও ঘটাবেন। নিজেকে বনের রাজা সিংহ ভেবে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে এসে গঠন করেছিলেন ‘গণফোরাম’। বাম-ডান সবাই জড়ো হয়েছিল এই সিংহরাজের পেছনে। হা হতোস্মি! এক বছরের মাথায় সেই গণফোরাম শুধুই ফোরামে পরিণত হয়। বহু নেতা, বুদ্ধিজীবী তার সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। যে ঐক্য আজ কামাল হোসেন করেছেন হারিয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া, শতধাবিভক্ত রাজনীতিকদের নিয়ে, স্বার্থের টানে তারাও আবার পিছ পা হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনে প্রার্থী হবার আশায় ও বিএনপির সহায়তায় বিজয়ী হবার স্বপ্নে বিভোর যারা, তারা মনোনয়ন না পেলে খুঁটির রশি ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়া খাঁসির মতোই পালাবেন। ফেসবুক বন্ধু খালেক ঘরামী লিখেছেন ‘পচে যাওয়া কাঁঠালের কোষ ভেতরে একত্রিত থাকে, কিন্তু তা কোন কাজে আসে না। পচা কাঁঠাল গরুতেও খায় না। ঐক্য প্রক্রিয়ার এরা সব রাজনীতিতে পচে যাওয়া কোষ। এরা কোন কাজে আসবে না। এদের শেষ গন্তব্য ডাস্টবিন। জাতি এদের সেখানেই ছুড়ে ফেলে দেবে।’ আসলে দেশবাসী যতই ক্ষোভ, উষ্মা প্রদর্শন করুক না কেন এই নয়া নাটককে নিয়ে, বাস্তবে এসব পচা গন্ধগুলো পরিবেশ দূষণ করবেই। কামাল হোসেন যেসব দাবি দাওয়া করছেন তা সংবিধানবহির্ভূত হলেও তিনি তাতে অনড়। তার এজেন্ডা আর বিএনপির এজেন্ডা মূলত একই। তাই একই মোহনায় এসে মিলিত হয়েছেন তারা। কিন্তু কামাল হোসেন নাবিকের ভূমিকায় ততটা পারঙ্গম হতে পারবেন কিনা সন্দেহ জাগে। বাস্তবে এই যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া সবই বিএনপি-জামায়াত পুনর্বাসন প্রকল্প ছাড়া আর কিছুই নয়। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের দাঁড় করানোর ক্ষমতা তাদের না থাকলেও নষ্টামো করার ক্ষমতা তো রয়েছেই। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের পক্ষে কামালগংদের অবস্থান ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে গেছে। তার পক্ষে আর ন্যায়ের- আইনের শাসনের কথা মানায় না। কামাল হোসেন ও তার সারথীরা টের পাবেন ‘বড়র পীরিতি বালির বাঁধ’ প্রবাদের মাজেজা। বিএনপি-জামায়াত পুনর্বাসিত হওয়ার পর তারা নারকেলের আঁশ হয়ে আবর্জনার স্তূপে ঠাঁই পাবেন। পচনের গান গাইতে গাইতে কামাল হোসেনরা এক সময় দূষণের কারণ হয়ে যাবেন। ফুলের সুবাসও এই গন্ধ দূর করতে পারবে না।