১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আফগানিস্তান বধে ফাইনালের আশায় বাংলাদেশ

আফগানিস্তান বধে ফাইনালের আশায় বাংলাদেশ

মিথুন আশরাফ ॥ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূণ, উত্তেজনায় ভরা ম্যাচ। শেষপর্যন্ত জিতল বাংলাদেশই। আফগানিস্তানকে ৩ রানে হারিয়ে ফাইনালে খেলার আশাও জিঁইয়ে রাখল বাংলাদেশ। আফগানদের বিদায়ও করে দিল বাংলাদেশ। এখন সুপারফোরের শেষ ম্যাচে বুধবার পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতে জিতলেই ফাইনালে খেলা নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ।

অসাধারণ ব্যাটিং করলেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও ইমরুল কায়েস। ৮৭ রানেই ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দুইজন মিলে এতটাই সুন্দর ব্যাটিং করেছেন, দলকে টেনে তুলেছেন, ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ১২৮ রানের রেকর্ড জুটি গড়েছেন, তাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২৫০ রানের টার্গেটও দেয়া গেছে। মাহমুদুল্লাহ ৭৪ রান করে আউট হলেও ইমরুল ৮৯ বলে অপরাজিত ৭২ রান করেন। এরপর বল হাতে ২ উইকেট নেয়া মাশরাফি, মুস্তাফিজের দুর্দান্ত বোলিংয়ে আফগানিস্তান জয়ের কাছাকাছি গেলেও তা বের করে নিতে পারেনি। বাংলাদেশ আফগানিস্তানকে ৫০ ওভারে ২৪৬ রানের বেশি করতে দেয়নি।

আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে টস জিতে আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। ‘সুপারফোরে’র গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এসে আগে টস জেতার সৌভাগ্য ধরা দিয়েছে। যা খুবই দরকার ছিল। আগে ব্যাটিং করে আফগানিস্তানের সামনে বড় স্কোর দাঁড় করাতে পারলেই হয়ে গেল। ব্যাটিংয়ে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের পরিবর্তে ইমরুল কায়েসকে নামিয়ে ব্যাটিং লাইন শক্ত করা হয়। বোলিংয়ে রুবেল হোসেনকে একাদশের বাইরে রেখে নাজমুল ইসলাম অপুকে নেয়া হয়। ওয়ানডে অভিষেক হয় অপুর। যেন স্কোর বড় হলে আফগানিস্তান ব্যাটসম্যানদের স্পিন দিয়ে বিপদে ফেলা যায় সেজন্যই পেসার কমিয়ে স্পিনার বাড়ানো হয়েছে। মাহমুদুল্লাহ ও ইমরুলের রেকর্ড ১২৮ রানের জুটিতে বড় স্কোরই গড়েছে বাংলাদেশ। ৭ উইকেট হারিয়ে ৫০ ওভারে ২৪৯ রান করে বাংলাদেশ। জবাবে ৭ উইকেট হারিয়ে ৫০ ওভারে ২৪৬ রান করে আফগানিস্তান।

শুরুতে ২৬ রানে ২ উইকেট হারায় আফগানিস্তান। তখন মনে হয় ম্যাচটি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণেই চলে এসেছে। কিন্তু ৯ রানে মিঠুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ‘নতুন জীবন’ পাওয়া মোহাম্মদ শাহজাদ ভালই ভোগান। নিজে ৫৩ রান করে আউট হন। দলকেও ৮৯ রানে পৌঁছে দেন। শাহজাদ ও হাসমতুল্লাহ শাহিদির জুটি ভাঙ্গা খুবই দরকার ছিল। মাহমুদুল্লাহ বল হাতে নিয়ে শাহজাদকে সাজঘরে ফিরিয়ে জুটি ভাঙ্গেনও। কিন্তু চতুর্থ উইকেটে গিয়ে আবারও বড় জুটির দেখা মিলে। চরম ভোগান্তিতে পড়েন বাংলাদেশ বোলাররা। কোনভাবেই আফগান ব্যাটসম্যানদের রোখা যাচ্ছিল না। হাসমতুল্লাহ ও আসগর স্ট্যানিকজাই মিলে অনেকদূর এগিয়ে যান। ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এমন মুহূর্তে যখন দুইজন মিলে ৭৮ রানের জুটি গড়ে ফেলেন, আফগানিস্তানও ১৬৭ রানে চলে যায়, তখন মাশরাফি এসে আসগরকে (৩৯) আউট করে স্বস্তি ফেরান। কিন্তু তাতেও স্বস্তি মিলছিল না। একদিকে অন্য ব্যাটসম্যানরা আউট হচ্ছিলেন। কিন্তু হাসমতুল্লাহ যে নিজের স্কোরকে আরও বড় করে চলছিলেন। দলের স্কোরও টার্গেট অতিক্রম করার কাছাকাছিই চলে যাচ্ছিল। শেষপর্যন্ত সেই মাশরাফিই আবার ত্রাতার ভূমিকায় আবির্ভূত হন। দলীয় ১৯২ রানের সময় হাসমতুল্লাহকে (৭১) বোল্ড করে দেন। তখন ৩৬ বলে আফগানিস্তানের জিততে ৫৮ রানের দরকার ছিল। মাশরাফি যথাসময়েই সঠিক কাজটি করেন। সেই সঙ্গে ওয়ানডেতে প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ২৫০ উইকেট পাওয়ার মাইলফলকও স্পর্শ করেন মাশরাফি। কিন্তু আফগান ব্যাটসম্যানরা আতঙ্ক ছড়াতে থাকেন। ২০০ রানও অতিক্রম করে ফেলেন।

দেখতে দেখতে টার্গেট অতিক্রম করার কাছাকাছিও চলে যেতে থাকেন। সাকিবের বলে শিনওয়ারি রিভিউ নিয়ে বেচে ধুমধারাক্কা ব্যাটিং করতে থাকেন। মোহাম্মদ নবীও অভিজ্ঞতার ঝলক দেখাতে থাকেন। ১৮ বলে গিয়ে আফগানিস্তানের জিততে ৩১ রান লাগে। হাতে থাকে ৫ উইকেট। শিনওয়ারিকে আউট করার সুযোগ ধরা দেয়। কিন্তু শান্ত সঠিক জায়গায় না থাকায় বলটি তালুবন্দী করতে পারেননি। উল্টো এত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শান্তর মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে মাঠের ভেতরেই বল পড়ে। চারও হয়ে যায়। আফগানিস্তান ব্যাটসম্যানরা যে দ্রুতই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরিণত হচ্ছেন, তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন বারবার। ১৮তম ওভারে বল করতে এসে মুস্তাফিজ ১২ রান দিয়ে দেন। আফগানিস্তানের সামনে ১২ বলে জিততে ১৯ রানের দরকার থাকে। ১৯তম ওভার করতে আসেন সাকিব। দ্বিতীয় বলেই ছক্কা হাঁকান নবী। পরের বলেই আউট হয়ে যান। কিন্তু তৃতীয় বলেই নবী আবারও ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট হয়ে যান। তখন ৯ বলে জিততে ১২ রানের দরকার থাকে। এই ওভারটিতে ১১ রান নেয়া হয়। শেষ ৬ বলে ৮ রানের প্রয়োজন থাকে। কে জিতবে ম্যাচ? মুস্তাফিজের হাতে বল তুলে দেন মাশরাফি। প্রথম বলেই ২ রান নেন রশিদ খান। দ্বিতীয় বলেই রশিদকে কট এন্ড বোল্ড করে দেন মুস্তাফিজ। খেলায় উত্তেজনা বেড়ে যায়। ৪ বলে আফগানদের জিততে লাগে ৬ রান। পরের ৩ বলে ২ রান হয়। আফগানদের জিততে ১ বলে ৪ রান লাগে। দুর্দান্ত বোলিং করেন মুস্তাফিজ। শেষ বলেও কোন রান হয়নি। আফগানিস্তানও ৩ রানে হারে।

রবিবার দুই ওপেনারকে রেখেই একাদশ সাজায় বাংলাদেশ। আরেকটি সুযোগ মিলে লিটন কুমার দাস ও নাজমুল হোসেন শান্তর। কিন্তু শান্ত ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করলেন। ৭, ৭ এরপর এবার ৬ রানেই আউট শান্ত। পঞ্চম ওভারের শেষ বলে গিয়ে শান্ত আউট হন। ষষ্ঠ ওভারেই ওয়ান ডাউনে নামা মোহাম্মদ মিঠুনও সাজঘরের পথ ধরেন। মুজিব জাদরানের বলটি বুঝতেই পারলেন না মিঠুন (১)! এলবিডাবিøউ হয়ে যান। তাতে করে ১৮ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। বিপদেও পড়ে যায় দল।

উইকেটে আঁকড়ে থাকাই তখন মুখ্য কাজ হয়। সেই কাজটি করতে থাকেন লিটন ও মুশফিকুর রহীম। ১০ ওভারে গিয়ে দলের স্কোরবোর্ডে ৩৪ রান জমা হয়। রান একেবারেই কম হয়। কিন্তু উইকেট আর পরেনি। সেই কাজটিই করার চেষ্টা করেন লিটন ও মুশফিক। উইকেট থাকলে যে পরে রানও তোলা যাবে। দলের ৪০ রান হতেই আরেকটি উইকেট হারাত বাংলাদেশ। মুজিবের বলে ¯িøপে সহজ ক্যাচ ধরতে ব্যর্থ হন অধিনায়ক আসগর স্ট্যানিকজাই। ৯ রান করা মুশফিক আউট হওয়া থেকে বাঁচেন। এর আগেই অবশ্য ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫ হাজার রান করার কৃতিত্ব গড়েন মুশফিক। যখন ৭ রান হয়, তখনই তামিম, সাকিবের পর তৃতীয় বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ৫ হাজার রান করেন মুশফিক।

ক্যাচ মিসের সুযোগে ‘নতুন জীবন’ পান মুশফিক। সেই সুযোগে লিটনকে নিয়ে এগিয়েও যেতে থাকেন মুশফিক। দুইজন মিলে একটা সময় ৫০ রানের জুটিও গড়ে ফেলেন। দুইজনই সমানতালে ব্যাটিং করতে থাকেন। ১৯তম ওভারে গিয়ে রশিদ খান বল হাতে নেন। চতুর্থ বলেই উইকেট শিকার করে ফেরেন। অহেতুক সুইপ করতে গিয়ে (৪১) বল আকাশে তুলে দেন। আউট হন। পরের বলেই সাকিব রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফেরেন। অদৃশ্য এক তাড়াহুড়া সাকিবের মধ্যে যেন কাজ করেছে। মিডউইকেটে বল ঠেলে দিয়েই রান নিতে দৌড়ান। মুশফিক সাড়া দেবেন, এমন কোন পরিস্থিতিই ছিল না। বল মিডউইকেটে থাকা শেনওয়ারির হাতে পড়তেই সরাসরি স্ট্যাম্পে লাগিয়ে দেন । ১৯তম ওভারের শেষ তিন বলে ২ উইকেট পড়তেই বাংলাদেশের ঘাড়ে আবারও বিপদ চেপে ধরে।

কী সুন্দর ব্যাটিং করছিলেন মুশফিক ও লিটন। ৬৩ রানের জুটিও গড়েন। আতঙ্ক বোলার রশিদ বোলিংয়ে আসতেই সব যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। ৮১ রানে গিয়ে আরও ২ উইকেট হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ৬ রান যোগ হতেই মুশফিকও (৩৩) রান আউট হলে যেন ম্যাচ থেকেই ছিটকে পড়ে বাংলাদেশ। ৮৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসে মাশরাফির দল। কী করুণ অবস্থা হয়। রান আউটই এরমধ্যে হন দুইজন (সাকিব ও মুশফিক)! দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান যখন এমন আউট হন, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দল।

এমন পরিস্থিতিতে দলকে একটি ভাল জায়গায় দাঁড় করাতে হলে অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহ ও প্রায় এক বছর পর খেলতে নামা ইমরুল কায়েসকেই হাল ধরতে হতো। তারা দুইজন হাল ধরলেনও। দুইজন মিলে দলকে ১০০ রানে নিয়ে গেলেন। বিপর্যস্ত অবস্থাও দূর করলেন। ৫০ রানের জুটিও গড়া হলো। দলের ১৫০ রানও হয়ে গেল। ১০০ রানের জুটি গড়ার সঙ্গে দলকে ২০০ রানেও নিয়ে যান মাহমুদুল্লাহ ও ইমরুল। অভিজ্ঞতার ঝলক দেখাতে থাকেন। ২০তম ওয়ানডে হাফসেঞ্চুরিও করে ফেলেন মাহমুদুল্লাহ। দলের বিপদ দূর করেন। ইমরুলও পেছনে পড়ে থাকবেন কেন। তিনিও হাফসেঞ্চুরি করে ফেলেন। এই ম্যাচের আগেই দলে যোগ দেন। একাদশেও থাকলেন। ব্যাটিং ঝলকও দেখিয়ে দিলেন। প্রায় একবছর পর দলে ফিরে হাফসেঞ্চুরি করে দলকেও বিপদমুক্ত করলেন।

আল শাহরিয়ার ও খালেদ মাসুদ পাইলটের ১৯৯৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে গড়া ১২৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটির রেকর্ড ভেঙ্গে দেন মাহমুদুল্লাহ-ইমরুল জুটি। দল যখন ২১৫ রানে থাকে, তখনই ৮১ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৭৪ রান করে আউট হন মাহমুদুল্লাহ। আউট হওয়ার ৪ রান আগেই আসলে ষষ্ঠ উইকেটে রেকর্ড জুটি হয়ে যায়। দেশের হয়ে রেকর্ড জুটি হয়। এরপর অধিনায়ক মাশরাফি (১০) ব্যাট হাতে নেমে ধুমধারাক্কা ব্যাটিং করে আউট হয়ে যান। ইমরুল শেষপর্যন্ত টিকে থাকেন। অপরাজিত ৭২ রান করে ৫ রান করা মিরাজকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে বড় স্কোর দাঁড় করিয়েই মাঠ ছাড়েন। রশিদ খানকে নিয়ে সব দলেরই এখন ভয় থাকে। সেই রশিদকে বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা এবার দুর্দান্তভাবে সামলেছেন। শেষপর্যন্ত ব্যাটসম্যানদের দক্ষ ব্যাটিংয়ের পর শেষদিকে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে জিতে বাংলাদেশ। ফাইনালের স্বপ্নও টিকে থাকে।

স্কোর \

বাংলাদেশ ইনিংস ২৪৯/৭; ৫০ ওভার (লিটন ৪১, শান্ত ৬, মিঠুন ১, মুশফিক ৩৩, সাকিব ০, ইমরুল ৭২*, মাহমুদুল্লাহ ৭৪, মাশরাফি ১০, মিরাজ ৫*; আফতাব ৩/৫৪, মুজিব ১/৩৫, রশিদ ১/৪৬)।

আফগানিস্তান ইনিংস ২৪৬/৭; ৫০ ওভার (শাহজাদ ৫৩, ইহসানুল্লাহ ৮, রহমত ১, হাসমতুল্লাহ ৭১, আসগর ৩৯, নবী ৩৮, শিনওয়ারি ২৩*, রশিদ ৫, নাইব ০*; মাশরাফি ২/৬২; মুস্তাফিজ ২/৪৪, সাকিব ১/৫৫, মাহমুদুল্লাহ ১/১৭)।

ফল \ বাংলাদেশ ৩ রানে জয়ী।