১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বরিশালে তিন দশকে জনপ্রতিনিধিসহ পাঁচ শতাধিক খুন

বরিশালে তিন দশকে জনপ্রতিনিধিসহ পাঁচ শতাধিক খুন

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল ॥ একসময় সন্ত্রাসের জনপদ বলে খ্যাত ছিল বরিশালের উত্তর জনপদ বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া ও মুলাদী উপজেলা এবং মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা। সন্ত্রাসীরা তিন দশকে এসব অঞ্চলের ১৫জন ইউপি চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও রাজনৈতিক নেতাসহ পাঁচ শতাধিক লোক খুন করেছে। এরমধ্যে গৌরনদীর সরিকল ইউনিয়নেই পাঁচজন নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে হত্যা করা হয়।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে জনমনে ছিলোনা কোন সন্ত্রাসী আতঙ্ক। শান্তিতেই বসবাস করছিলেন এসব অঞ্চলের মানুষ। এরইমধ্যে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে গুলি করে হত্যার পর জনমনে ফের সন্ত্রাসী আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রশিক্ষিত কিলিং মিশনের সন্ত্রাসীরা দীর্ঘদিন ঘাঁপটি মেরে থাকলেও বিশেষ কোন মহলের ইশারার ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে হত্যার মাধ্যমে তাদের আগমনকে জানান দেয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দশকে বরিশালের রক্তাক্ত উত্তর জনপদের জনপ্রতিনিধিসহ পাঁচ শতাধিক লোক সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন। এসব সন্ত্রাসীরা কোন না কোন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বিচরণ করে থাকতো। সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন অপরাধ-খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, বাড়ি দখল, লুটপাট, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা অবাধে চালিয়ে ছিলো এ জনপদে। ফলে সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি হয়ে পরেছিল। একসময় সন্ত্রাসীদের কথায় সব হতো, তারা কৌশলে সবসময় থাকতো সরকারী দলের সাথে। তাই সরকারী দলের ক্ষমতার কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে ভয় পেতো।

সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে জনমনে ছিলোনা সন্ত্রাসী আতঙ্ক। এ জনপদ ছিলো সন্ত্রাসীদের দখল মুক্ত। ফলে মানুষ শান্তিতেই বসবাস করে আসছিলো। সচেতন নাগরিকদের মতে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি বিশেষ মহল শান্তির সুবাতাস বয়ে যাওয়া এ জনপদকে পুরনো রূপে অশান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলশ্রুতিতে তারা জল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে হত্যার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানান দিয়েছে।

নির্ভরযোগ্য একটি গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ঈদ-উল আযহার ভিজিএফ’র চাল আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টু ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দলের অপর এক নেতা আদালতে মামলা দায়ের করেন। এনিয়ে দলের মধ্যে অভ্যন্তরীন কোন্দল চলে আসছে। এসব ঘটনার মধ্যে তৃতীয় কোন পক্ষ একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এ হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটিয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের উপর দায় চাঁপিয়ে দিচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষিত কিলিং মিশনের সন্ত্রাসীরাই যে ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদারকে গুলি করে হত্যা করেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সূত্রমতে, একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অবনী বাড়ৈকে ২০০৩ সালে হত্যা করেছিলো সন্ত্রাসীরা।

সূত্রে আরও জানা গেছে, অতীতের বিভিন্ন সময় খুলনা অঞ্চলের সন্ত্রাসীরা অস্ত্র নিয়ে এসব এলাকায় আশ্রয় নিতো। খুলনার কুখ্যাত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের সহযোগীরাও এ অঞ্চলে আত্মগোপন করেছিলো। ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী রাতে এরশাদ শিকদারের বড়ভাই আশ্রাফ আলী ওরফে বড়মিয়াকে গৌরনদীর সরিকল এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো। এরশাদ শিকদার গ্রেফতার হওয়ার পর আশ্রাফ আলী তার অস্ত্র ভান্ডার ও সহযোগীদের নিয়ে গৌরনদীতে অবস্থান নিয়েছিল। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও অস্ত্রভান্ডার ও সহযোগীদের গ্রেফতারে ব্যর্থ হয়।

একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে উজিরপুরের শিকারপুর ফেরিঘাটে, রাহুতকাঠী ও দোয়ারিকা ফেরিঘাটে নৈশ পরিবহন থেকে ১৪টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। একই বছর মুলাদীর মৃধারহাটে তরিকা লঞ্চের আনসারদের কাছ থেকে লুট হয়েছিলো আটটি অস্ত্র। ১৯৯০ সালে আগৈলঝাড়া পয়সারহাটের লঞ্চ থেকে আটটি অস্ত্র লুট হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে। এসব অস্ত্র লুট করেছিল সন্ত্রাসীরা। এছাড়াও এ অঞ্চলে ছিলো অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের শক্ত ঘাঁটি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাকর্মী অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলো। প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের জন্য ব্যবহার হতো এসব অবৈধ অস্ত্র। যশোর, খুলনা, বেনাপোল, গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া হয়ে পয়সারহাট দিয়ে এসব অস্ত্র এ অঞ্চলে প্রবেশ করতো।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, গত তিন দশকে সন্ত্রাসীরা এ অঞ্চলের ১৫জন ইউপি চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, একজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, রাজনৈতিক নেতা ও সরকারী কর্মচারীসহ পাঁচ শতাধিক লোককে হত্যা করেছে। এরমধ্যে গৌরনদীর সরিকল ইউনিয়নেই পাঁচজন নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে হত্যা করা হয়। সর্বহারা সন্ত্রাসীদের আত্মঘাতী সংঘর্ষের কারণে কামরুল গ্রুপের প্রধান কামরুল ইসলাম বিকাশ, আঞ্চলিক নেতা সুমন, সাদ্দাম, তানি, সালাউদ্দিন, বাচ্চু, আব্দুল মালেক, বাবুল প্যাদা, নুরেআলম খুন হন। সন্ত্রাসীরা বাবুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব খান, মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সাব সেক্টর কমান্ডার নিজাম উদ্দিন আকন, আগরপুর ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, আয়নাল হোসেন, রতœপুরের সত্য ফলিয়া, আজিজ মোল্লা, চুন্নু শাহকে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ১৬ জুলাই রাতে উজিরপুর সদরের নিজ বাড়িতে উপজেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড বাবুলাল শীলকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে ২০০৩ সালের ১০ জুলাই উজিরপুরের কুড়ালিয়া বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় জল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অবনী বাড়ৈকে। এর দুইদিন আগে খুন হন ওয়ার্কার্স পার্টির স্থানীয় নেতা হীরালাল হালদার। ১৯৯৩ সালের ২০ মার্চ দিনে-দুপুরে বরিশাল শহরের সিঅ্যান্ডবি সড়কে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করা হয় সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইপিআই টেকনিশিয়ান ইউনুস খানকে।

সূত্রমতে, বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল অস্ত্র সংগ্রহ করা এসব সন্ত্রাসীরা অতীতে প্রতিটি নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে ভাড়ায় কাজ করতো। রাজনৈতিকভাবে এরা প্রতিপালিত হতো। বিগত সময়ে র্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ারে এ অঞ্চলের অর্ধডজনেরও বেশি সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর তাদের সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীরা বিশেষ কোন দলের মিশন বাস্তবায়নে পুনরায় এ অঞ্চলে ফিরে এসে অত্যন্ত সু-কৌশলে মেতে উঠতে পারে রক্তের হলিখেলায়। এমনটাই আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

যার কিছুটা প্রমানও মিলেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীয় এক কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, জল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুর হত্যাকারীরা নিঃসন্দেহে প্রশিক্ষিত কিলার। ঘটনার দুইদিন আগে কারফা বাজারে অপরিচিত কয়েকজনকে ঘুরতে দেখেছে স্থানীয়রা। এমনকি উপজেলা সদরে প্রভাবশালী এক ব্যক্তির সাথেও অপরিচিত ব্যক্তিরা দেখা করেছে বলেও তাদের কাছে অভিযোগ রয়েছে। সবকিছু সামনে রেখেই তারা নান্টু হত্যার মূলঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য কাজ করছেন।

জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতীতের সন্ত্রাসী বলতে এ জনপদের মানুষ সর্বহারাদের জানতেন। এখন সর্বহারাদের কোনো গ্রুপের অস্তিত্ব নেই। সর্বহারা দলের সক্রিয় নেতা ও সদস্যরা অনেকেই মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোতে পুনর্বাসিত হয়েছেন। তাদের ওপর পুলিশের কড়া নজরদারি রয়েছে।

বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মোঃ ইউনুস বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নয়; উন্নয়ন কর্মকান্ডে বিশ্বাসী। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এখানে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও আমার নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগে কোন অভ্যন্তরীন কোন্দল নেই। আমার সময়ে এখানে কোন সংঘাতের ঘটনাও ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে মন্ত্রী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি’র দিকনির্দেশনায় আমারা যখন উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে বরিশালকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, ঠিক তখনই জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ হালদার নান্টুকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে বরিশালের শান্ত জনপদকে দুর্বৃত্তরা অশান্ত করে তুলেছে। কোন নির্দোষ মানুষকে হয়রানী না করে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে নান্টুর প্রকৃত হত্যাকারীদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।