২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেখা মেলে কালেভদ্রে হারিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা

দেখা মেলে কালেভদ্রে হারিয়ে যাচ্ছে পালতোলা নৌকা
  • নৌপথে যান্ত্রিক সভ্যতা

শেখ আব্দুল আওয়াল ॥ বর্ষার অপার শোভায় বিমোহিত হয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন ‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দমধুর হাওয়া...’। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাস বাংলার প্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন ‘বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাহি না আর...’ বাংলার গানের পাখি কোকিল কণ্ঠ শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছেন (ও) মাঝি নাও ছাইড়া দে, ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে..., ভাটিয়ালি সুরের শিল্পী আব্দুল আলীম তার গানে গেয়েছেন ‘নাইয়া রে নায়ের (নৌকা) বাদাম (পাল) তুইলা কোন দেশে যাও চইলা’। বাঙালী জাতি হিসেবে আমাদের রয়েছে নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। আধুনিক যানবাহনের বহুল প্রচলনের আগে আমাদের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদী আর নৌকা। যুগের হাওয়া লেগেছিল পালে, দ্রুত থেকে দ্রুততর ছুটতে হবে আমাদের। তাই দ্রুত ছুটে যাচ্ছি আমরা মৃত্যুর দিকে, ধারণ করে চলছি যান্ত্রিক সভ্যতা। তাই পাল তোলা নৌকাতে এখন আর আমাদের চলে না। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ মরে যাচ্ছে এতে আমাদের সন্তানেরা পাচ্ছে বিষাক্ত পরিবেশ। ওরা বেড়ে উঠছে এজমা নিয়ে। বর্তমানে কালেভদ্রে দেখা মিলে পাল তোলা নৌকার।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা, গানে, উপন্যাসে বাংলার প্রকৃতির সবকিছুই ফুটে ওঠে। কবি গুরু তার ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে যে বর্ণনা দিয়েছেন বাংলার প্রকৃতির সেই রূপ চিরন্তন হয়ে আছে। বর্ষায় প্রকৃতি মানব হৃদয়ে রোমান্টিকতার যে সুর তুলে ধরে’ তা অন্য কোন ঋতুতে মিলে না। বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর যতই পরিবর্তন হোক বাংলার ষড়ঋতুর হেরফের হতে পারে। কিন্তু বৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসতে এখনও অনেক দেরি। এই সময়টা ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে চোখ পড়ে নদের দিকে উত্তাল ঢেউ নেই, নদীতে জলরাশির স্তব্ধতা আকাশ একটু মেঘলা হলেই ঢেউ নেচে ওঠে। নদীর তীর ও কোথাও সামান্য সবুজ কোথাও নদীর কিনার ঘেঁষে কাশফুল ঘেঁষে যখন নৌকা বয়ে যায় তখন মাঝিদের সঙ্গে যাত্রীরা অনুভব করে অনাবিল সুখ। এই সময়ে প্রকৃতির বাতাস এসে দোল খায় পাল তোলা নৌকায়। একটা সময় নদীর কিনারা দিয়ে গুনটানা (দড়ি) নৌকা চলতো এখন আর তা চোখে পড়ে না। বাতাসের অনুকূলে যাওয়ার জন্য বড় কাপড় দিয়ে আটকানো হতো পাল তোলা নৌকা। আজকাল তাও কমে গেছে নৌকার পালকে কোন কোন এলাকায় বলা হয়ে থাকে বাদাম। যার নৌকায় যত বড় বাদাম থাকত সেই নৌকা বাতাসের গতির সঙ্গে জুড়ে চলত। নদী আর নৌকা ছিল আমাদের গ্রাম জীবনের বহমানতা। বর্তমানে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে পাল তোলা নৌকা। আমাদের দেশে অনেক নৌকা এখন জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনী হিসেবে রয়েছে। তার মধ্যে যাত্রীবাহী কেরাই নৌকা, গয়না, কোসা, ডিঙ্গি, বজরা, সিলেটি নৌকা, পাতাম নৌকা, লক্ষ্মীবিলাস ইত্যাদি।

নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্র তীরবর্তী এক জনপদের সঙ্গে আরেক জনপদের যোগাযোগের সাহায্য করে আসছে নৌকা, বহু বছর আগে থেকেই বাংলাদেশের নদ-নদী খাল-বিল অজস্র এমন অনেক এলাকা রয়েছে আজও, যেখানে মানুষের জীবন নৌকা ছাড়া অচিন্ত্যনীয় কিন্তু এ বাহনটির ইতিহাস অনেকেই জানে না। তবে নৌকার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগে¦দে ।

মানসা মঙ্গল ও বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস কাব্যে বণিক চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যতরী ১৪ ডিঙ্গা নির্মাণ করে বাণিজ্য যাত্রা করে ছিলেন। ক্রিট দ্বীপের মানুষেরা ১ লাখ ৩০ হাজার বছর আগে নৌকার ব্যবহার জানত বলে জানা যায়।

বাংলাদেশে সবচেয়ে পরিচিত নৌকার নাম হচ্ছে ডিঙ্গি। নদীর তীরে যারা বসবাস করেন তারা সকলেই এই নৌকাটি ব্যবহার করেন নদী পারাপার বা অন্যান্য কাজে। আকারে ছোট বলে এই নৌকাটি চালাতে একজন মাঝিই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে এতে পালও লাগানো হয়।

প্রতœতত্ত্ববিদদের আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরনো ৭ থেকে ১০ হাজার বছর আগে কুয়েতের ফাইলাকা দ্বীপে পাওয়া যায় সমুদ্রগামী জাহাজ বা ‘রিড বোড’ তৈরি হয়েছিল ৭ হাজার বছর আগে। মহাসাগরে খ্রীস্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ৩ হাজার সালে প্রচুর জলযানের আনাগোনা ছিল বলে ইতিহাসবিদরা উল্লেখ করেছেন। সিন্দু সভ্যতার বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা রকমের নৌকার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এখন থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে ভূমধ্যসাগরে বহু দাঁড় বিশিষ্ট নৌকা দেখা যেত। নৌকায় দাঁড় টানার কাজে ব্যবহার করা হতো কৃতদাসদের। দাঁড় টেনে নৌকা বাওয়া অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও ক্লান্তিকর। পালের উদ্ভাবন এ অবস্থা থেকে মানুষকে খানিকটা মুক্তি দিয়েছে। দাঁড় টানার সঙ্গে পাল টানানো হলে নৌকার গতি বেড়ে যায় এবং হাওয়ার গতিতে নৌকা আরও বেশি বেগমান হয়। তখন থেকেই নানা ধরনের পালের ব্যবহার শুরু হয় বাতাসের শক্তি কাজে লাগানোর জন্য ।

বাংলার বারোভূঁইয়াদের একটা বিরাট বহর ছিল ঈশা খাঁ ১৫৭৫ খ্রীস্টাব্দে বাংলা থেকে নওয়াবদের বিতারিত করেন রণতরীর সাহায্যে। বিক্রমপুরের কাছে নৌ যুদ্ধে মান সিংহের নৌ বহরের ওপর তার চূড়ান্ত বিজয় ষোড়শ শতকে বাংলার নৌশক্তির এক উজ্জ্বল প্রমাণ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পাল তোলা নৌকার প্রচলন প্রায় উঠে গেছে বললেই চলে। নদীতে মাঝে মধ্যে পালের নৌকা দেখা মেলে। পাল তোলা নৌকা চলাচলের দৃশ্য এখন বিরল, কেবলই স্মৃতি।