১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার

  • যাহিদ হোসেন

(গতকালের চতুরঙ্গ পাতার পর)

বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তা/সৈনিকদের গতিবিধি, অপারেশন প্রকৃতি এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের পরে আগত রাজনৈতিক নেতাদের চলাফেরা এবং কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে এবং কোথায় কোথায় যাতায়াত করছেন ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের আলোচনায় যেসব বক্তব্য উত্থাপিত হতো সেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, পাকিস্তান থেকে আফগাস্তিান হয়ে পাহাড় পর্বত ভয়ঙ্কর রাস্তাঘাট এবং জীবনের অনিশ্চিত নিরাপত্তার সমূহ সম্ভাবনা অতিক্রম করেও যারা নিজেদের জন্মভূমির উদ্দেশ্যে রওনা হতো, তাদের শতভাগই যে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হবে এবং হানাদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা নেবে, এটা সঠিক নয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়ত শুধু জীবনের ভয়ে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসেছেন। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার সঙ্গে জড়িত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুকুর রহমানের মতো অনেকে যে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানী ভাবধারায় ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী একটা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে ভূমিকা গ্রহণে স্বার্থগতভাবে, আর্থিক কারণে অথবা অন্য কোন কারণে ওই সময়ে পাকিস্তান ত্যাগ করে যে আসতে পারেন সে বিষয়টাও আমাদের আলোচনায় স্থান পেত। যেমনভাবে আমাদের আলোচনায় স্থান পেত মুজিব বাহিনীর কথা, তারা ভারতে আলাদাভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছে, সেটা কি মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে না অন্য কারও নির্দেশে, অন্য কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে? এই ধরনের নানা কথা তখন শোনা যেত অনেকের মুখে। তাদের আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যাপারে মুজিবনগর সরকারের বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালনকারী কর্নেল এমএজি ওসমানীর অফিস কি অবহিত ছিল পরিপূর্ণভাবে? তাদের প্রশিক্ষণ উত্তর তৎপরতা অথবা অপারেশন বিষয়ে তথ্যাদি এবং পরিকল্পনা বিষয়ে সেক্টর কমান্ডাররা কি অবহিত ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে কি সমন্বয় করে মুজিব বাহিনীর সদস্যরা দেশের অভ্যন্তরে অপারেশনে যেত, মুজিববাহিনীর অপারেশন পরিচালনার মূল নেতৃত্ব কার হাতে ছিল এবং তাকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অপারেশনে সহায়তা দিত কারা? এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সাপ্তাহিক সভায় অনেক আলাপ-আলোচনা হতো। আমাদের মূল সংশয় ছিল যে, এমন কিছু যাতে না ঘটে যাতে মুক্তিযুদ্ধের অগ্রযাত্রা যেভাবে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে যেন কোন বিঘœ না ঘটে এবং এমন কিছু না ঘটে যা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক প্রক্রিয়াতে নিজেদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি করে। আরও একটা বিষয় নিয়ে আমাদের সাপ্তাহিক সভায় মাঝে মধ্যে আলাপ হতো। সেটা হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবং অন্যান্য কিছু স্থানে ওই সময়ে নকশালদের তৎপরতা ব্যাপক বেড়ে গিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি সহানুভূতি না থাকলেও ভীতি ছিল প্রচুর। সেপ্টেম্বর মাস থেকে দেশের ভেতর মুসলিম লীগ ও জামায়াত ছাড়া ছোট ছোট অনেক রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের পশ্চিমবঙ্গে আসার সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তবে এদের মধ্যে বামপন্থীদের সংখ্যা ছিল বেশি। বিশেষ করে যারা চীনাপন্থী নামে সমধিক পরিচিত ছিল। আমাদের আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্ব পেত সেটা হলো, এসব বাম রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা নকশালদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও কর্মধারাবিরোধী কোন তৎপরতার সঙ্গে জড়িত হয়ে আমাদের জন্য বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের দৈনন্দিন অপারেশনে কোন ব্যাঘাত যাতে ঘটাতে না পারে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখা। এমন কিছু ঘটলে জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার সেটাকে পুরোপুরিভাবে তিলকে তাল বানিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচারণা চালাবে এই বলে যে, বাংলাদেশের তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধারা নানা গ্রুপে বিভক্ত, তাদের মধ্যে কোন একতা নেই। এদের মধ্যে বিরাট একটা গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, কারণ তাদের ভাষায় ভারতীয় আগ্রাসী এই অীভযানকে তারা কোনভাবেই গ্রহণ করতে সম্মত নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের প্রধান শঙ্কা ছিল এই ধরনের কোন কিছু যেন ভবিষ্যতে না ঘটতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে অনেকে সিরাজ শিকদার, মেজর জিয়াউদ্দিন, মোঃ তোহা, আবদুল বাতেন আরও অনেকের কথা উল্লেখ করত। যারা দক্ষিণ অঞ্চলে সুন্দরবন ও পার্বত্য এলাকায় সংগঠিত হওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করছে বা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অসমর্থিত অনেক খবর আমাদের কাছে আসত। এদের অধিকাংশই মূলত বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল এবং এদের চিন্তাধারা পুরোপুরিভাবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ছিল না। চলবে....

লেখক : মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার প্রধানের দায়িত্ব পালনকারী

নির্বাচিত সংবাদ