১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরিবর্তন আর উদ্যোগের নায়ক সুমন সাহা

ডিপ্রজন্ম : যেখান থেকে নিজের গল্পের শুরুটা, পাঠকদের জন্য বলবেন।

সুমন সাহা : খুলনার এক অজ পাড়াগাঁয়ে জন্ম হয়েছিল আমার। সেখান থেকে জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ২০১৫ সালে কম্পিউটার প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করি। এখন ম্যানেজমেন্টে এমবিএ করছি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে।

তবে পড়াশোনার সময় নিজেকে শুধু বইয়ের পাতা আর ক্যাম্পাসের চার দেয়ালের মাঝেই আটকে রাখিনি। স্কুল জীবনে অংশ নিয়েছি ‘ন্যাশনাল এ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড’এ। ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত টানা চার বছর এ প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা আমার কৈশোরের সেরা স্মৃতির তালিকায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখির দিকে আগ্রহ জন্মে। লেখক হিসেবে যুক্ত হই মাসিক বিজ্ঞান ম্যাগাজিন ‘জিরো টু ইনফিনিটির সঙ্গে। কাজ করেছি দৈনিক জনকণ্ঠের আইটি রিপোর্টার হিসেবেও।

এরপর কাজ শুরু করি বিভিন্ন এনজিওতে। শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশ রিসোর্স ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের আইসিটি বিভাগের প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসেবে। এরপর ওয়ার্ল্ড মেরিট (ইংল্যান্ড) এর ‘এসডিজি ০৮’ বিভাগেও প্রজেক্টে ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করি বেশ কিছুদিন। এগুলোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই এগিয়ে যাচ্ছিল আমার স্বপ্ন ‘বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটি’। দেশব্যাপী বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ, বিজ্ঞানের সঠিক বার্তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়া, নিয়মিত বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার মতো কাজগুলো করার লক্ষ্যেই জন্ম হয় এই অলাভজনক সংস্থাটির। এখানে আমি আছি প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে।

২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে আমার আইটি কোম্পানি সাহা টেক। একই বছর জাপানের অলাভজনক সংস্থা ‘সায়েন্স ফোরাম ২১’-এ যোগ দেই কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে। ২০১৭ সালে প্রথম বাঙালী হিসেবে নরওয়ের বিশ্বখ্যাত ইনোভেশন প্রোগ্রাম ইয়াং সাস্টেইনেবল ইমপ্যাক্ট (ওয়াইএসআই)-এ অংশ নেয়ার সুযোগ হয়, যা ছিল আমার জীবনের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওয়াইএসআইতে দীর্ঘ সাড়ে ৩ মাসের এই প্রোগ্রাম থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। সেখান থেকে তো আজ ওয়াইএসআইয়ের বাংলাদেশ শাখা ’ওয়াইএসআই বাংলাদেশ’ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছি। ভাবতেও অবাক লাগে।

ডিপ্রজন্ম : প্রথম কবে মনে হলো জব করব না, উদ্যোক্তা হবো?

সুমন সাহা : সত্যি কথা বলতে, আমার আসলে কখনও চাকরি করার ইচ্ছাই ছিল না। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী। তাই ছোটবেলা থেকে ব্যবসার নেশাটা আমার রক্তেই মিশে আছে। একটু বড় হওয়ার পরপরই তাই আস্তে আস্তে এই দিক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। বুঝতে চেষ্টা করি, সামনের দিনগুলোতে কোন জিনিসগুলো মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে, কোন জিনিসগুলোর চাহিদা হবে সবচেয়ে বেশি। এজন্য বিভিন্ন দিকের অভিজ্ঞতাই নিজের ঝুলিতে পুরেছি, যে কথা একটু আগেই বলেছি। এ অভিজ্ঞতাগুলোই আমার দৃষ্টি এবং লক্ষ্যকে আরও স্বচ্ছ করতে সাহায্য করেছে।

ডিপ্রজন্ম : বর্তমানে কোথায় কোথায় কাজ করছেন?

সুমন সাহা : ওয়াইএসআই বাংলাদেশের সঙ্গে, কাজ করছি এদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সায়েন্স ফোরাম ২১-এর সঙ্গেও কাজ করছি। সেখানে মূলত স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞানবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হয়। বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটির কাজ চলছে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সঙ্গে সাহা টেকের কাজ তো আছেই।

ডিপ্রজন্ম : ওয়াইএসআই বাংলার কী কী কাজ রয়েছে?

সুমন সাহা : ওয়াইএসআই বাংলার কাজ চলছে অনেক বড় পরিসরে, অনেক বড় একটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। আমাদের মূল লক্ষ্য এই দেশের তরুণ সমাজ, যারা সঠিক দক্ষতার অভাবে স্বপ্নকে ছুঁতে পারছেন না। তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়নে সহযোগিতা করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

আমাদের রয়েছে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় একটি অনলাইন শিখন মাধ্যম। সেখানে একাডেমিক কোর্স, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, চাকরির প্রস্তুতিসহ নানাবিধ বিষয়ে কোর্স আসছে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায়। কোর্স নিচ্ছেন দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বাঙালীরাই। তারা তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের জন্য চমৎকার সব কোর্স তৈরি করে দিচ্ছেন। এর পাশাপাশি চুক্তি হচ্ছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও। সামনে এই শিখন মাধ্যমে নিয়ে আসছে আরও বেশ কিছু চমক।

এর পাশাপাশি আমাদের রয়েছে একটি ব্লগসাইট। সেখানে নিত্যনতুন সরকারী-বেসরকারী চাকরির খবরাখবর, স্কলারশিপ, ফেলোশিপ, বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার খবর, ইয়ুথ ইভেন্ট, নিউজ আপডেট, ভিডিও ব্লগসহ তরুণদের জন্য সহায়ক সবকিছুই আছে। এগুলোর মাঝে চাকরি এবং স্কলারশিপ নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় আমরা সেগুলো নিয়ে আলাদাভাবে দুটো পোর্টালও আনতে যাচ্ছি শীঘ্রই।

ডিপ্রজন্ম : বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট জানতে দেশীয় তরুণদের জন্য পরামর্শ দিন।

সুমন সাহা : দেশীয় তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় পরামর্শ হলো, জগতটাকে নতুন করে দেখতে শিখতে হবে। অনেক তরুণের জগতই কেবল পাঠ্যবই আর আশপাশের টুকটাক খবরাখবর রাখার মাঝে আটকে রয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জগতটা বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এখন, সবকিছুই বেশ তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। পরিবর্তনশীল এই জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নিজেকেও নিয়মিত আপডেট রাখতে হবে, জানতে হবে বিশ্বের নানা প্রান্তের ইনোভেশন সম্পর্কে, সেই অনুযায়ী সাজাতে হবে নিজের কর্মপরিকল্পনা। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই সময়ে সবকিছুই বৈশ্বিক হয়ে যাচ্ছে। তাই তরুণদেরও আমি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই চিন্তাভাবনা করতে পরামর্শ দেব।

ডিপ্রজন্ম : নিজেকে ক্যারিয়ারের শেষে যেখানে দেখতে চান।

সুমন সাহা : বেশ কিছু ইচ্ছাই আছে। তবে এর মাঝে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনটি-

১. আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য একজন সফল সিরিয়াল এন্ট্রাপ্রেনার হওয়ার। সমাজের প্রতিটি সমস্যা নিয়ে কাজ করে সেগুলোর টেকসই সমাধান পৃথিবীকে দিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছি আমি।

২. দ্বিতীয় লক্ষ্য এ দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যার সমাধানে অবদান রাখার। আমার একার পক্ষে হয়ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তারপরেও চাইব তাদের সঠিক রূপে দক্ষ করে অন্তত তাদের যোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি করে দিতে ভূমিকা রাখতে।

৩. আমি আমার ভাল কাজের মধ্য দিয়েই মানুষের মনে জায়গা করে নিতে চাই। দেহটা তো নশ্বর, কিন্তু কর্ম অবিনশ্বর। সেই কর্মের মধ্য দিয়েই আমি মানুষের মনে অমর হতে চাই।