২১ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৬৪ জেলার মাটির মানচিত্র

ইচ্ছে ছিল সাইকেলে ৬৪ জেলা ঘুরে দেখার, কিন্তু মিলেনি পরিবারের সম্মতি। ইচ্ছেটা অপূর্ণই রয়ে যায় পরিবারের সম্মতির অভাবে। বাস্তবে ইচ্ছে পূরণ না হলেও বিকল্প হিসেবে বেছে নেন হাতের কাছে থাকা কম্পিউটার। গুগল ম্যাপে ভার্চুয়াল স্ক্রিনে ঘুরতেন ৬৪ জেলা। হঠাৎ করেই মাথায় এলো আইডিয়াটা। একভাবে তো সত্যি সত্যি বাংলাদেশটাকে ছুঁয়ে দেখা যায়! এতে কেবল নিজের নয় তার মতো অনেকেরই অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণও সম্ভব। সম্ভব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে ছুঁয়ে দেখা। সে আইডিয়া থেকেই ৬৪ জেলার মাটি দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র বানালেন এক শিক্ষার্থী শুভংকর পাল। বাড়ি ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলায়। বর্তমানে রাজধানীর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শেষ বর্ষের অধ্যয়নরত। এই মাটির মানচিত্রের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে আগামী ৩ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা উন্নয়ন মেলায়।

শুভংকর বলেন, ‘৬৪ জেলা ঘুরে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। কিন্তু শুরুর দিকে পরিবার থেকে এ বিষয়ে সমর্থন পাইনি। প্রায়ই কম্পিউটারে গুগল ম্যাপে ৬৪ জেলা ঘুরতাম ভার্চুয়াল স্ক্রিনে। একদিন হঠাৎ মনে হলো যদি এমন কিছু করা যায় এক জায়গা থেকেই বাংলাদেশটাকে ছুঁয়ে দেখবে সবাই। স্পর্শ করবে গোটা বাংলাদেশকে। শুধু আমি নই আমার মতো যারা ৬৪ জেলা ঘুরে দেখার ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারে না, তারাও ইচ্ছে করলে ৬৪ জেলায় না গিয়েও এক জায়গায় দাঁড়িয়েই বাংলাদেশটাকে স্পর্শ করতে পারবে। আইডিয়াটা এভাবেই মাথার মধ্যে চেপে বসল।’

‘সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হলো বাংলাদেশ নামটি দিয়ে এমন কিছু করার প্রয়োজন যা হবে একদম নতুন। এমন কিছু যা এই নামটি নিয়ে আগে করা হয়নি। বাংলাদেশের মানচিত্র তো অনেক জায়গায় আছে, কিন্তু ৬৪ জেলার মাটি এক ফ্রেমে কি আনা হয়েছে কখনও? অনলাইন সার্চ দিয়ে দেখিÑ নো রেজাল্ট। শুরু করলাম কাজ। ৩ দিন ধরে বাংলাদেশের ম্যাপের ওপর ৬৪ জেলার জন্য কাগজের বক্স, ফ্রেম তৈরি করলাম। এবার মূল কাজ অর্থাৎ ৬৪ জেলা থেকে মাটি সংগ্রহ। শুরুতে নিজে কয়েক জেলার মাটি সংগ্রহ করলাম। সহযোগিতা চাইলাম বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনের। আমি চেয়েছিলাম আমার এই মানচিত্রে ৬৪ জেলার মানুষের ভালবাসার স্পর্শ লেগে থাকুক। কেউ যেন অবহেলা করে মাটি সংগ্রহ না করে। স্বেচ্ছায় আগ্রহ নিয়ে মাটি সংগ্রহ করে পাঠায় সবাই। প্রথমদিকে অনেকেই আমাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি, অনেকে করেছে তুচ্ছতাচ্ছিল্য। এরপর আমার আইডিয়াটা নিয়ে একটি ভিডিও বানিয়ে ইউটিউব, ফেসবুক এবং বিভিন্ন ব্লগে শেয়ার করি। ভিডিওটি প্রকাশের পর সাড়া দেয় অনেকেই। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন অনেকে। মাটি আসতে শুরু করে বিভিন্ন জেলা থেকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে।

শুভংকর জানান, ‘আমার স্বপ্ন কেবল আমার একার স্বপ্ন থাকে না। একঝাঁক মাটি সংগ্রাহকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সে স্বপ্ন। সবারই প্রত্যাশা একটাই ছুঁয়ে দেখব গোটা বাংলাদেশ।

কাজে এক পর্যায়ে আছে মন ভেঙ্গে যাওয়ার গল্প। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে শুভংকর বলেন, ‘অনেকে মাটি দিতে চেয়ে দেয়নি। মাটি সংগ্রহকালীন ছবি পাঠিয়েছে কিন্তু মাটি পাঠায়নি। বার বার ফোন দিয়েছি মাটির জন্য, রিতীমত বিরক্তি প্রকাশ করেছে ফোনের ওপ্রান্তের মানুষটি। বিষয়টি আমাকে প্রচণ্ড কষ্ট দিয়েছে।’

শুধু মনে হয়েছে ৫০০ গ্রাম মাটিই তো এত বন্ধু কত দূরের জেলা থেকে পাঠাল আর কিছু মানুষ শুধুই ঘোরাচ্ছে। তাহলে কি আমার মানচিত্র গড়ার স্বপ্নটি ব্যর্থ হবে? আর একটু বেশি প্রচারণা চালালে খুব সহজেই আমি ১৫-২০ টা জেলার মাটি সংগ্রহ করতে পারতাম। কিন্তু এটা জোর করে হোক এমনটা কখনই চাননি শুভংকর। চেয়েছেন সবার ভালবাসা লেগে থাকুক মাটির মানচিত্রে। প্রজেক্টটি নিয়ে এভাবেই ৩ বছর কেটে যায়। সেভাবে কাজ এগোয়নি। একপর্যায়ে এমনও ভেবেছেন নিজেই বাকি জেলার মাটি সংগ্রহ করবেন। ফেসবুকে পোস্ট দিলেও আরেক সমস্যা, অনেকেই বলত নিজে ফেমাস হওয়ার জন্য এসব করছেন। এটাও খুব কষ্ট দিত। অন্যদিকে মাটির মানচিত্রের অপমান হোক এটাও চাননি। সবমিলিয়ে কার্যক্রমটি স্থগিত থাকে অনেকদিন। এদিকে যারা মানচিত্রের মাটি সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন সবাই মানচিত্র কবে উন্মুক্ত হবে এই নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে। আবার প্রচারণা শুরু করে শুভংকর। বিষয়টি জানতে পেরে আগ্রহ প্রকাশ করেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক এবং নিজেও তাকে সংগ্রহ করে দেন বেশ কয়েকটি জেলার মাটি। অবশেষে অপেক্ষার অবসান, প্রায় ৩ বছর ধরে কাজ করার পর মাটির মানচিত্র তৈরি কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। আগামী ৩ অক্টোবর ফরিদপুরের জেলা উন্নয়ন মেলায় জেলা প্রশাসক এই মাটির মানচিত্রটির উদ্বোধন করবেন বলে জানান শুভংকর। মানচিত্রটি আগামীতে কোথায় রাখা হবে জানতে চাইলে শুভংকর পাল বলেন, ‘যদি জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ মানচিত্রটিকে জাদুঘরে রাখতে চায়, তাহলে আমার দিতে আপত্তি নেই।’

ডিপ্রজন্ম ডেস্ক