১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিচ্ছিন্নতা এবং ঘরোয়া বিনোদন

  • মিলু শামস

ব্রিটেন প্রবাসী ভারতীয় গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন বিবিসি টেলিভিশন সম্পর্কে লিখেছিলেন, স্কুলের ভূমিকা থেকে তার ভূমিকা কোন অংশে কম নয়, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে ঢের বেশি। মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার বিপুল আয়োজনে বিবিসি অপরাজেয়। স্কুল-কলেজের ক্লাস ঘরে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচী তো আছেই, তা ছাড়াও দেশ-বিদেশের মানুষ, জীবনধারা ঘটনাবলী, পশুপাখি, গাছপালা ইত্যাদি বিষয়ে খবরাখবর দিতে, দেশ-বিদেশের নানান সমস্যা সম্বন্ধে শিশুদের অবহিত করতে, বিজ্ঞানকে ঘরোয়া ব্যাপার করে তুলতে, কিশোরদের বিশ্ব সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিবিসির আত্মনিবেদন প্রশংসনীয়। সঙ্গীত, নাটক, অপেরা ইত্যাদির পরিবেশন তো আছেই। তা ছাড়া সাহিত্য, চিত্রকলা, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, ধর্ম-দর্শন, বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, চিকিৎসাবিদ্যা, নগর পরিকল্পনা, স্বদেশের এবং বিদেশের সামাজিক সমস্যাবলী ও রাজনৈতিক প্রশ্নাদি, অপরাধ ও দ-নীতি, শিক্ষা, সন্তান পালন, নারী আন্দোলনÑ এমন বিষয় নেই যার ওপরে মননশীল আলোচনা চক্র বা অন্য কোন সুচারু অনুষ্ঠান বিবিসি প্রচার করেনি। এত রকমের এত বিচিত্র দৃশ্য কি টেলিভিশন ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বাড়িতে বসে দেখা যেত? এ যেন ঘরের ভেতরেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বক্তৃতামালার চাইতেও অনুষ্ঠানগুলো সার্থকতর, সুন্দরতর, শব্দ ও দৃশ্যের সমন্বয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্যভেদী।

বৈচিত্র্যময় যে সব অনুষ্ঠান একা বিবিসি প্রচার করত কেবল টিভি নেটওয়ার্ক সেই সব বিষয় ভেঙ্গে প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে আরও বিস্তৃতভাবে দেখাচ্ছে। রুচি ও প্রয়োজন মতো বাটন টিপলেই হলো। এক স্টার টিভি নেটওয়ার্কেরই কত রূপ! আমেরিকায় তার যে রূপ আফ্রিকায় তা একেবারে আলাদা। আবার আফ্রিকার সম্প্রচার পুরোপুরি বদলে যায় ইন্ডিয়ায় এসে। তখন তা ভারতীয় রুচি ও সংস্কৃতির অনুগামী। এখন তো স্টার টিভির বাংলা চ্যানেল স্টার জলসা আর জি নেটওয়ার্কের জিটিভি বাংলা চ্যানেল এ দেশের ঘরে ঘরে। জরিপ করলে হয়ত দেখা যাবে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে এ দু’চ্যানেলের দর্শক বেশি।

এসব চ্যানেলের নিয়মিত দর্শকরা তা নিয়ম করেই দেখছেন এবং ক্রমশ আসক্ত হচ্ছেন। দর্শক মূলত পরিবারের গৃহিণী, গৃহকর্মী এবং বয়স্ক সদস্যরা। প্যাসিভ এন্টারটেইনমেন্ট হিসেবে টেলিভিশনের যত দুর্নামই থাক জীবনের এক বড় অংশজুড়ে এখন টেলিভিশনের অবস্থান। সুতরাং এর মানের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। ভারতীয় নিচু মানের অনুষ্ঠানের দর্শক আসক্তি বাড়ছে, তাতে দেশের অনুষ্ঠান মার খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ব্যবসার স্বার্থে হলেও চ্যানেল মালিকদের গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা ভাবা উচিত। কেবল অপারেটররা ইচ্ছেমতো চ্যানেল চালাচ্ছে কিনা তার খোঁজখবরও রাখা দরকার। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। আইনও আছে।

স্যাটেলাইট টেলিভিশনের স্বেচ্ছাচারিতার জবাব দিতে পারে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বাংলাদেশ টেলিভিশনই দেশের একমাত্র টেরেস্ট্রিয়াল চ্যানেল যার নেটওয়ার্ক দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ এবং ৯২ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত। এ চ্যানেলের জন্য মাস শেষে অপারেটরের টাকাও গুনতে হয় না। কিন্তু সরকারী এ চ্যানেলটি জন্ম থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। তবুও স্যাটেলাইট চ্যানেলের এত চাকচিক্যের পরও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও বিটিভি দেখে।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট বাংলাদেশে টিভি দর্শকদের ওপর এক মতামত জরিপ চালিয়ে দেখেছে দেশের মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগই বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখে। জরিপে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বিটিভি দেখেছে। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ স্যাটেলাইট টিভির অনুষ্ঠান দেখছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনুপাতিক হারে দেখা গেছে, সারাদেশে বিটিভির মোট দর্শক ৮৪ শতাংশ। তবে বিভাগীয় অঞ্চলগুলোয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা এগিয়ে রয়েছে। এখানে স্যাটেলাইট টিভি দেখে ৭০ শতাংশ। বিটিভি দেখে ৬৬ শতাংশ। জেলা শহর বা শহরাঞ্চলে বিটিভি ও স্যাটেলাইট টিভির দর্শক সমান সমানÑ ৬৯ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে ৮৯ শতাংশ দেখছে বিটিভি এবং স্যাটেলাইট টিভি দেখছে ১৮ শতাংশ। জরিপের তথ্য অনুযায়ী বিটিভির গড়ে প্রতিদিন দর্শক ছয় কোটি ৪৪ লাখ। স্যাটেলাইট টিভির গড়ে প্রতিদিন দর্শক তিন কোটি ৭৭ লাখ।

শিশুদের জন্য টেলিভিশন খুব ভাল বন্ধু হতে পারে। ইন্টার-এ্যাকশনধর্মী সৃজনশীল অনুষ্ঠান বিনোদনের সঙ্গে শিশুদের বিভিন্ন বিষয় শেখাতে পারে। গৃহিণীদের চিন্তার সূত্র তৈরিতেও টেলিভিশন ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু টেলিভিশন তা করছে না। মিডিয়া সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করতে পুরোপুরি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এখনকার টেলিভিশন চ্যানেল। সমাজের গতিমুখ এখন পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার দিকে। গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের ধারণা ক্ষয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। একসঙ্গে একই ভবনে থেকেও প্রতিটি পরিবার যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। গসিপিং, শেয়ারিং সবই ওই টেলিভিশনের সঙ্গে। বিশেষ করে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দী সিরিয়ালের সঙ্গে। নারীপ্রধান এসব সিরিয়ালে যাবতীয় ষড়যন্ত্র এবং অশনির ছক আঁকে নারী চরিত্ররা। যেখানে ষড়যন্ত্র সেখানে সাসপেন্স। এই সাসপেন্সের পেছনে ছুটে পর্বের পর পর্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে দর্শক। নিঃসঙ্গ পরিবারকে এভাবে সঙ্গ দেয় টেলিভিশন। কেতকী কুশারীর লেখায় এই নিঃসঙ্গতার রূপ করুণ হয়ে বাজেÑ এ দেশের ছেলেমেয়েরা এমনই স্বাধীনতার ভক্ত যে, বাপ-মায়ের সঙ্গে এক শহরে থাকলেও প্রায়ই চাকরি পেলে বিয়ের আগেই তারা আলাদা ফ্ল্যাটে উঠে যেতে চায়। তারপর তাদের নিজস্ব সংসার পাতার, নতুন পারিবারিক ইউনিট স্থাপন করার সময় তো এসেই পড়ে। প্রৌঢ় বয়স থেকে আবার একলা হয়ে যান অধিকাংশ বাবা-মা এবং স্বামী-স্ত্রীর এক সঙ্গে মৃত্যু যেহেতু দুর্লভ, সেহেতু কোন পরিবারের সভ্যসংখ্যা বিলুপ্তির আগে দুই থেকে একে ঠেকে। বিধবা, বিপতœীক, অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ারা ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা টেলিভিশনের বড় রকম গ্রাহক, দীর্ঘ শীতের সন্ধ্যাগুলোতে টেলিভিশন তাঁদের সময় কাটাতে অমূল্য সাহায্য করে।

নির্জন ঘরে এনে দেয় মানুষের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর, হাস্যরোল ও সান্নিধ্য। যাঁরা বিশেষভাবে জরাগ্রস্ত, বাতের রোগী বা পক্ষাহত, তাঁদের পক্ষে টেলিভিশন দেবতার বরের সমান। কেউ কেউ বসবার ঘরে একটি, শোয়ার ঘরে একটিÑ দুটি সেটের ব্যবস্থা করেন। কোন নিঃসঙ্গ প্রৌঢ়াকে আমি বলতে শুনেছি, ‘টেলিভিশনের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ। যখন একলা লাগে তখন বোঝাই ওই তো পর্দায় আমার বন্ধুদের মুখ, ওই তো ওরা হাসছে আমার সঙ্গে। কথা বলছে, রসিকতা করছে। রিচার্ড বেকার, এ্যাঞ্জেলা রিপন এরা আমার দিকে, আমার মতো কত একলা মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে খবর পড়ছেন।