২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের পারমাণবিক অভিযাত্রা

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৬১ সালে। ঈশ্বরদীর রূপপুরে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ারও ১০ বছর আগে। ১৯৬২ হতে ১৯৬৮ সালের মধ্যে পদ্মা নদীর তীরে ঈশ্বরদীর রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। সেই সঙ্গে প্রকল্পের জন্য জমিও অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পাকিস্তানী শোষক গোষ্ঠীর দুরভিসন্ধিতে বাঙালীর স্বপ্ন ধূলিসাত হয়ে গিয়েছিল। প্রকল্পটি পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেয়া হয়। স্বাধীনতার পর সীমিত সম্পদের মধ্যেও রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় প্রকল্প পরিচালক পরমাণু বিজ্ঞানী এম ওয়াজেদ মিয়াকে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছিল। দুই দফা সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও অর্থের যোগান না থাকায় প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদকালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সুপারিশ করা হয়েছিল। তৎকালীন পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম এ ওয়াজেদ মিঞার নির্দেশনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার একশন প্লানের অনুমোদন দেয়া হয়। ক্ষমতার পালাবদলে আবারও প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে যায়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতে রাশিয়ার সঙ্গে ‘সমঝোতা স্মারক’ ও ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়। ২০১০ সালের ১০ নবেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০১১ সালের ২ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাশিয়ান ফেডারেশন ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে প্রকল্প নির্মাণে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে পাবনার রূপপুরে দুই হাজার চারশ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য রাশিয়ার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ এবং প্রকল্প গ্রহণের ৫৭ বছর পর ৩০ নবেম্বর ২০১৭ বৃহস্পতিবার দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নকামী নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নিজ হাতে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর জন্য প্রথম কংক্রিট ঢালাই/মূল নির্মাণ কাজ এবং ১৪ জুলাই ২০১৮ ২য় ইউনিটের কংক্রিট ঢালাই/মূল নির্মাণ কাজের উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৩২তম পারমাণবিক বিদ্যুত শক্তি উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী এফসিপি উদ্বোধনের দিন হতে ৬৩ মাসের মধ্যে এই প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হওয়ার কথা।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ২ হাজার ৪ শত মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরিকল্পিত পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রÑ যা বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র হিসেবে ২০২৩ সালে বিদ্যুত উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে। দ্রুত এগিয়ে চলছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিদ্যুত কেন্দ্র ঈশ্বরদীর পদ্মার পাড়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্পের কাজ। এটি শেখ হাসিনার ১০ অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্পের একটি। সবকিছু ঠিকমতো চললে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আর প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই বিদ্যুত কেন্দ্রের দুই ইউনিট থেকে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করা সম্ভব হবে। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশী কর্মী মিলে প্রায় এক হাজারের বেশি কর্মী দিন-রাত কাজ করছেন। এ প্রকল্পের জন্য থ্রি প্লাস রিএ্যাক্টর বসানো হচ্ছে। যেটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তি। যা শুধু রাশিয়ার একটি বিদ্যুত কেন্দ্রের বাইরে বাংলাদেশের রূপপুরেই বসানো হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে রূপপুর বিদ্যুত কেন্দ্রের দুটি ইউনিটে মূল স্থাপনার কাজ চলছে পুরোদমে। এটি নির্মাণে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গাইডলাইন এবং আন্তর্জাতিক মান অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হচ্ছে। রাশিয়ার সর্বশেষ জেনারেশন থ্রি প্লাস প্রযুক্তির রিএ্যাক্টর দিয়ে তৈরি হচ্ছে এ কেন্দ্র। পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণের সর্বাধুনিক ব্যবস্থা আছে এ রিএ্যাক্টরে। রাশিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, আর্থিক সহায়তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংস্থা আণবিক শক্তি কর্পোরেশনের (রোসাটম) অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এএসই গ্রুপ অব কোম্পানিজ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পে রাশিয়ার উদ্ভাবিত সর্বাধুনিক থ্রি প্লাস প্রজন্মের ‘ভিভিইআর ১২০০ প্রযুক্তির পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি ১হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে। দুই ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২৪০০ মেগাওয়াট। আগামী ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিট এবং ২০২৪ সালে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিদ্যুত কেন্দ্রে টানা ৬০ বছর বিদ্যুত উৎপাদন করা যাবে। এরপর অতিরিক্ত আরও ২০ বছর উৎপাদন কাজ চলবে। এছাড়া এই প্রকল্পে ভবিষ্যতে আরও দুটি ইউনিট করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জায়গা প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। এ বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে বর্তমানে ২২০০ কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ৪৫০জন। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মূল কাজে যুক্ত হবেন ১২,৫০০ জন। এর মধ্যে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫০০ জন যুক্ত থাকবেন। এ ছাড়াও বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ কাজের ভারি মালামাল প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর জন্য ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। ভারতের জিপিটি এবং বাংলাদেশের এসইএল ও সিসিসিএল অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ২৯৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ঈশ্বরদী বাইপাস টেক অফ পয়েন্ট থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করবে। এর মধ্যে ২২ দশমিক ০২ কিলোমিটার হবে মূল লাইন, আর ৪ দশমিক ৫কিলোমিটার হবে লুপ লাইন। এছাড়া, ১৩টি লেভেল ক্রসিং গেট, একটি ‘বি’ শ্রেণীর স্টেশন ভবন, একটি প্লাটফর্ম এবং সাতটি বক্সকালভার্ট নির্মাণ করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১৮ মাসের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করবে। এই রেল লাইনের নির্মাণ কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম ও খুলনা বন্দর থেকে খুব সহজেই রাশিয়া থেকে বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য আনা মালামাল পরিবহন করা সম্ভব হবে। প্রায় ১২শ’ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র্রটি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে বৃহৎ ও ব্যয়বহুল প্রকল্প। মূল প্রকল্প এলাকার বাইরে তৈরি হচ্ছে গ্রিনসিটি আবাসন পল্লী। পাবনা গণপূর্ত অধিতদফতর এ কাজ বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যেই কয়েকটি সুউচ্চ ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে এই বিদ্যুত কেন্দ্র কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২০ তলা ১১টি বিল্ডিং এবং ১৬তলা ৪টি বিল্ডিংয়ের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। ২২টি সুউচ্চ ভবন তৈরি হবে এ চত্বরে। এছাড়া থাকবে মাল্টিপারপাস হল, মসজিদ ও স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? আর কতটুকুই বা নিরাপদ? জাপানের ফুকুশিমা আর চেরনোবিল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। জনগণের জন্য কোন ঝুঁকি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে গ্রহণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। বিদ্যুত কেন্দ্রের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীসহ সব বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে প্রশিক্ষিত আলাদা একটি ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তাদেরকে রাশিয়া এবং ভারতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখেই বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া তাদের সর্বশেষ সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ভিভিইআর ১২০০ মডেলটি বাংলাদেশে দিচ্ছে। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে সর্বশেষ আধুনিক এই মডেলটির। এছাড়া রোসাটোমের তথ্য অনুযায়ী এই মডেলটি যে কোন ধরনের বিমান হামলা থেকেও রক্ষা পেতে সক্ষম। জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনা করে বিদ্যুত কেন্দ্র ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের বর্জ্য রাশিয়া তাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ফেরত নিয়ে যাবে। আর নিরাপদ ও নির্ভরশীলতার ব্যাপারে রাশিয়ার বিদ্যুত কেন্দ্র কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক মান নির্ণয়কারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির মান অনুযায়ীই তৈরি করা হয়েছে। তাই রাশিয়াকে উন্নত পরমাণু শক্তির পথিকৃৎ বলা হয়ে থাকে, বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রসমূহে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো মাথায় রেখেই রাশিয়া তার সর্বশেষ মডেলের আধুনিকায়ন করে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বাস্তবায়িত হচ্ছে রূপপুর প্রকল্প। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প দেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। দেশের এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক, এটা আমরা চাই। বিদ্যুত উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অচিরেই বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com