১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জনগণের কাছেই আত্মসমর্পণ করুন

  • এ এইচ খান রতন

গত ২২ সেপ্টেম্বর, মহানগর নাট্যমঞ্চে মঞ্চস্থ রাজনৈতিক নাটকটিকে অতি উৎসাহী কেউ কেউ খুব বেশি কৌতূহলোদ্দীপক মনে করছেন। বাস্তবে ওই উৎসাহ, কেবল আয়োজকম-লী পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। ওই দিনের সমাবেশকে জাতীয় ঐক্যের রঙে রাঙানোর চেষ্টা করা হলেও একটা জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে জনগণের সংশ্লিষ্টতা অর্জনে যে সব উপাদানের প্রয়োজন হয়, তার কোন উপস্থিতি সেখানে ছিল না। যে সব কারণে জাতীয় ঐক্য হয় তার কারণ সেখানে লক্ষ্য করা যায়নি। তাই ওই ঐক্যকে জাতীয় ঐক্য বলা যেতে পারে না। ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্য মঞ্চের ওই ঐক্যকে যদি জাতীয় ঐক্য বলা হয়, তাহলে জাতীয় ঐক্য নামক শব্দটির আভিধানিক অর্থ, মর্যাদার দিক হতে এর গৌরবান্বি^ত মর্যাদা খানিকটা ম্লান হয়ে যায় বৈকি। বরং, এটাকে ব্যক্তিগত আক্রোশে সুযোগ সন্ধানীদের বড় ঐক্য বলা যেতে পারে। ওই দিনের নাট্যমঞ্চে রোল প্লে করতে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন জাতির কাছে তাদের রোল প্লে অনেক আগেই ফ্লপ। যিনি এর প্রধান চরিত্রে মহাসমারোহে এদেশের মানুষকে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন, তাকে এদেশের জনগণ কয়েকযুগ আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি দল বহু চেষ্টা করেও এ দেশের জনগণকে বিশ্বাস করাতে পারিনি যে, রাষ্ট্রপতি পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে ড. কামাল হোসেনকে বসানো যেতে পারে। এমন কি বার বার চেষ্টার পরেও জাতীয় সংসদের সদস্য পদেও জনগণ তাকে নির্বাচিত করেনি। কারণ, এ দেশের সাধারণ জনগণ তার উপর আস্থা রাখতে পারেনি। তাহলে যে ব্যক্তিটি এ দেশের জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তার নেতৃত্বে, অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দেয়া একটি গণবান্ধব সরকারের বিরুদ্ধে, জাতীয় ঐক্য নামক ‘হাস্যকর নাটক, ছাড়া এটা আর কি? অন্য যারা রয়েছেন জনগণের কাছে তাদের ভোটের বাজার কতখানি বড় তা গোটা জাতি জানে। বিকল্প ধারার তৃণমূলে কোন সংগঠন নেই, আমজনতা দলটির নামও জানে না। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) বঙ্গবন্ধু হত্যার প্লাটফরম তৈরির মতো জঘন্যতম অভিযোগে এক অভিশপ্ত দল। তাদের ললাটের কলঙ্ক চিহ্নটি ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন যতই অতিবাহিত হবে জনগণের আদালতে ইতিহাসের আঁস্তাকুড় হতে তাদের প্রতি এক ধরনের প্রকট দুর্গন্ধ বাতাসে প্রবাহিত হতে থাকবে। মাহমুদুর রহমান মান্না এমন কোন ইমেজদার ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে পারিনি যার নেতৃত্বে দেশের মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ব্যারিস্টার মইনুল ভোটের রাজনীতিতে কতটুকু শক্তিশালী তা বলাইবাহুল্য।

বিএনপির জন্মোতিহাস যদিও রাজাকার আলবদর আর জাতির জনক হত্যাকারীদের সংঘবন্ধ করে সম্পূর্ণ অগতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত একটি দল, তারপরও দলটির নিঃসন্দেহে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত সংগঠন রয়েছে। ব্যাপক ভোটব্যাংক থাকার পরও মরা ঘোড়ার পিঠে কেন চড়ে বসতে চাইছে তারা, এর কোন জবাব খুঁজে পাইনি। রাজনৈতিকভাবে যদিও দলটি ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় অতিবাহিত করছে, তারপরও এতটা নজিরবিহীন অসহায়ত্ব বরণ করার মতো নিজেদের প্রকাশ করার কোন কারণ আছে বলে মন হয় না। অথচ ড. কামাল ও বি চৌধুরীর কাছে যেভাবে দলটির মহাসচিবসহ অন্য নেতারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তা রীতিমতো হাস্যকর। হয়ত বা এ আত্মসমর্পণকে রাজনৈতিক কৌশল বলে যুক্তি দাঁড় করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু, যে বটবৃক্ষের পদমূলে দুধ-কলা ভোগ দিয়ে পক্ষান্তরে বিএনপি নিজেদের দুর্বলতারই জানান দিয়েছে, অচিরেই তার বাস্তব প্রমাণ মিলবে যে, ওই বটবৃক্ষে কোন দেবতা ছিল না। ড. কামাল চিরকাল জাতির কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন, বিনিময়ে দিয়েছেন সামান্যই। মুক্তিযুদ্ধে যোগদান না করে যুদ্ধকালীন সময় শ্বশুরালয় পাকিস্তানে কাটিয়েছেন। তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর এক ধরনের ভালবাসা ছিল, যাকে কেন্দ্র করে তিনি আজ বিশাল ব্যক্তিত্ব। না হলে এদেশের মানুষ কোনদিন তাকে চিনতে ভুল করেনি। তিনি আজ নেমেছেন জাতির জনকের কন্যার বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়তে। বিএনপির উচিত ইতিহাস চর্চা করা। খুব বেশি দূরে নয় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কংগ্রেস চিরদিন ক্ষমতায় ছিল না। বর্তমানেও নেই। ভোটের রাজনীতিতে উপমহাদেশের এ বিখ্যাত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলটি এখন বিরোধীদলে থেকে দেশের সেবা করছে। ইন্দিরা গান্ধী ভোটে হেরে বিরোধী দলের আসনে বসে রাজনীতি করেছেন। নিজের ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দৃষ্টান্তও তিনি রেখে গেছেন। বর্তমানেও কংগ্রেসবিরোধী দলেই দেশের সেবা করছে। বিএনপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, যদিও তা মিথ্যাচার নয়, তারপরও বলতে গেলে বিএনপির জন্য আগামী দিনের পথচলা খানিকটা সহজতর হবে বলে মনে হয়। যদি না রাজনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের কোন ভুল ফাঁদে পা না দেয় বিএনপি। কেননা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বিএনপির আগামী দিনের আবর্জনাময় পথ আওয়ামী লীগই পরিষ্কার করে দিচ্ছে। যে ভুলগুলো বিএনপি বার বার করছে এদেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষও তা বুঝতে পারছে, কিন্তু বিএনপি ভুলের চক্কর হতে কোন মতেই বের হতে পারছে না। জনগণকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। মানুষের জানমালের ক্ষতি করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন মূলত ক্ষমতা থেকে নিজেদেরই দূরে সরিয়ে দেয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকলে আগামী দিনগুলোতে হয়ত বা গণতন্ত্রের পথে নিজেদের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা করতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক দুরবস্থার জন্য বিএনপি নিজেরাই দায়ী। নিজের হাঁটুতে বেল ভাঙ্গার চেষ্টা দলটির জন্য শুভকর হবে। কোন দেবতা নয়, জনগণই বিএনপির আগামী দিনের শক্তি আর সাহস যোগাতে পারে। পরিশেষে বলব, জামায়াতের বিষয়ে ইতস্তত নয়; সাহসী সিদ্ধান্ত এখনি নিতে হবে। বিএনপির জন্য নয় জনগণের প্রয়োজনেই বিএনপির ভুল তাদের নিজেদের শোধরাতে হবে। স্বাধীনতার পর যেখানে এদেশে গুটিকয়েক শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে পারত; বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তার কবর রচনা করা হয়। যাদের জনগণের নেতা হওয়ার কথা ছিল মন্ত্রিত্বের লোভে তারা জিয়ার স্বৈর সরকারে যোগ দেয়। ধ্বংস হয়ে যায় দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদও একই পথে হাঁটে। রাজনীতিবিদরা রাজনীতি ছেড়ে মন্ত্রিত্বের লোভে দল এবং বোল পাল্টে নিজেদের যে পথে নিয়ে গেছে সেখান থেকে তৈরি হয় আজকের অস্থিতিশীল বাংলাদেশের। যার পুরো দায় স্বৈরশাসক জিয়া পরবর্তীতে এরশাদ সেই সঙ্গে এদেশের চরিত্রহীন লোভী রাজনীতিকদের। আজ দ্রুত পরিবর্তশীল পৃথিবীতে অতীতে যা হারাবার তা হারিয়েছে আগামী দিনের পথচলায় সংসদে সরকারী দলের সঙ্গে একটা শক্তিশালী বিরোধীদলের প্রত্যাশায় জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। জনগণের সে আশা পূরণের স্বপ্ন সফল হোক?

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী