১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিয়ানমারের মিথ্যাচার

১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি, সেই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিম-লের অব্যাহত চাপ সত্ত্বেও নতুন করে মিথ্যাচার শুরু করেছে মিয়ানমার। সম্ভবত এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে মিয়ানমার সরকার দেখিয়েছে তাদের মানচিত্রে। উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত বিভক্তির সময় সেন্ট মার্টিন অন্তর্ভুক্ত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এটি বাংলাদেশের অন্তর্গত। এমনকি ১৯৭৪ সালে সেন্ট মার্টিনের ওপর বাংলাদেশের অধিকার স্বীকার করে নিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা চুক্তি করে মিয়ানমার। ২০১২ সালে সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে সেন্ট মার্টিনকে দেখিয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রে। এত কিছুর পরও সম্প্রতি মিয়ানারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয়সহ অন্তত তিনটি ওয়েবসাইটে সেন্ট মার্টিনকে দেখানো হয়েছে মিয়ানমারের অংশ হিসেবে। অথচ এক সময় অর্থাৎ মধ্যযুগে তৎকালীন বর্মা মুলুক বর্তমানে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রামের সঙ্গে। ঐতিহাসিক নথিপত্রে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ইতিহাস যাই বলুক বাংলাদেশ সেই দাবি কখনোই উত্থাপন করেনি। উল্টো মিয়ানমার এখন সেন্ট মার্টিনকে দেখাতে চাইছে তাদের মানচিত্রে। বাংলাদেশ সরকার অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ব্যাখ্যা দাবি করেছে। আসলে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে নতুন ইস্যু তুলে অযথা সময়ক্ষেপণ করতে চাইছে, যা কাম্য নয় কোন অবস্থাতেই। অবশ্য চাপের মুখে মিয়ানমার ইতোমধ্যে উক্ত মানচিত্র প্রত্যাহার করেছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ জাতিসংঘের সদর দফতরে মহাসচিব এ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাব শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে যোগদান করেন। সেখানে তিনি বছরাধিককাল ধরে চলা রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা-সঙ্কট সমাধানে তিন দফা প্রস্তাব বা সুপারিশ উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে বাংলাদেশ পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। প্রথমত, মিয়ানমারকে অবশ্যই বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি বিলোপ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করে সে দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত করার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব দেয়ার সঠিক উপায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের প্রতি নৈরাজ্য রোধে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের জবাবদিহি, বিচার বিশেষ করে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশনের সুপারিশের আলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আর তাহলেই কেবল সব রোহিঙ্গার নিরাপদে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে মিয়ানমারে।

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক গণহত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের বিষয়টি উঠে এসেছে বিস্তারিতভাবে। জাতিসংঘের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেদেশে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ ও বিতাড়নে সেনাবাহিনীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ও দায়-দায়িত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গণহত্যায় সেনাপ্রধানসহ অন্তত ছয়জন জেনারেলকে বিচারের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অথবা সমমানের কোন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। এর পাশাপাশি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়ায় মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর তথা সরকারপ্রধান আউং সান সুচিকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। কানাডা ইতোমধ্যে সুচির সম্মানসূচক নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সেনাপ্রধানসহ ২০ জন ব্যক্তি ও প্রতিনিধিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ফেসবুকে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান অবশ্য সপ্তাহখানেক পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই।

ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং তাতে সমর্থন দেয়ার সুনির্দিষ্ট কারণে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান এবং রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত আউং সান সুচির বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়েছে জাতিসংঘে। অতঃপর যত দ্রুত এটি বাস্তবায়িত হয় এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সেদেশে পুনর্বাসিত হয় ততই মঙ্গল। আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়েরের জন্য ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। অতঃপর যত দ্রুত তা বাস্তবায়িত এবং রোহিঙ্গারা সেদেশে পুনর্বাসিত হয় ততই মঙ্গল। অযথা সেন্ট মার্টিনকে সেদেশের মানচিত্রে দেখিয়ে পানি ঘোলা করে মাছ শিকারের অপচেষ্টা মিয়ানমারের জন্য আদৌ সুফলদায়ক হবে না।