১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাদকে মৃত্যুদণ্ড

সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। দেশে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন, বিশেষ করে ইয়াবার প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এ রকম একটি কঠোর আইনের আবশ্যকতা ছিল বৈকি। উল্লেখ্য, আগের আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ২-১৫ বছরের দণ্ড মাদকের পরিমাণ ও তারতম্য ভেদে। পুরনো আইনে বিশেষ করে ইয়াবার প্রবল আগ্রাসন ঠেকানো যাচ্ছে না কিছুতেই। বর্তমানে মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের ভয়াবহ অপতৎপরতা এমনকি ক্রসফায়ারেও একেবারে নির্মূল করা যাচ্ছে না। সে অবস্থায় মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। তবে আইন শুধু করলেই হবে না, এর যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত, সৎ, নিরপেক্ষ ও কঠোর হতে হবে।

দেশব্যাপী ইয়াবার বিষাক্ত ছোবলের রেশ শেষ না হতেই ভয়াবহ নতুন মাদক খাতের কথা শোনা যাচ্ছে। খাতের ইংরেজী পরিভাষা এনপিএস বা নিউ সাইকোট্রফিক সাবসটেনসেস। দেখতে অনেকটা চা পাতার মতো। পুরনো মাদক আফিম, ভাং ও গাঁজার সঙ্গে মিল রয়েছে অনেকাংশে। যুব সমাজের সমধিক প্রিয়। দীর্ঘদিন সেবনে ভয়াবহ একাকিত্ব ও সমাজবিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়। মানসিক বৈকল্যে ভোগে সেবনকারী। কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলে। দেখা দেয় আত্মহননের প্রবণতা। গণমাধ্যমের চাপে সম্প্রতি এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

সরকার ইয়াবাসহ যে কোন ধরনের মাদকদ্রব্য আমদানি-রফতানি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। মাদক নির্মূলে সারাদেশে চলছে ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান। এক্ষেত্রে শুধু জেল-জরিমানাই নয়, ক্রসফায়ারে তিন শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর খবরও আছে। দুঃখজনক হলো, এরপরও মাদক আমদানি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা কমছে না। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশকে টার্গেট করেই কোন আন্তর্জাতিক শক্তিশালী চক্র কাজটি করে যাচ্ছে, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে মরিয়া। এর পেছনে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হাত থাকাও বিচিত্র নয়। যে কোন মূল্যে এই ‘বিষচক্র’ ভাঙতে হবে।

দেশের অভ্যন্তরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট এবং এর কাঁচামাল প্রবেশ করে থাকে কক্সবাজার জেলার মাধ্যমে। আরও সঠিক অর্থে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত পথে। পার্বত্য অঞ্চল দিয়েও ইয়াবার অনুপ্রবেশ বিচিত্র নয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের অভিযানে প্রায় প্রতিদিন তা ধরা পড়ে বিপুল পরিমাণে। বাস্তবতা হলো, সীমান্তে কঠোর তৎপরতা এবং গোয়েন্দা নজরদারির পরও এর প্রায় অবাধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে সঙ্গত কারণেই ধারণা করা যায় যে, এর পেছনে শক্তিশালী স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটসহ বিত্তশালী ব্যক্তিদের হাত রয়েছে। ইয়াবা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের সম্পৃক্ততার অভিযোগে জেল-জরিমানার খবরও আছে। দুঃখজনক হলো এরপরও ইয়াবার ছোবল ঠেকানো যাচ্ছে না। সে অবস্থায় এলাকার জনগণ যদি সততা ও সদিচ্ছার মনোভাব নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে প্রতিরোধে তাহলে সীমান্ত পথে অবৈধভাবে ইয়াবার চোরাচালান ঠেকানো অবশ্যই সম্ভব। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা চোরাচালানের সঙ্গে সেখান থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটা যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা থাকা বিচিত্র নয়। বাংলাদেশ নিতান্ত মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও দেখা যাচ্ছে যে, তারা স্থানীয়ভাবে নানা অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকা- এমনকি ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক পাচারের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। এটা তাদের রোজগারের অন্যতম একটি মাধ্যমও হতে পারে।

একদা তরুণ সমাজ বিপুলভাবে জড়িয়ে পড়েছিল ফেনসিডিল আসক্তিতে। পরে দেশে এই পণ্যটি নিষিদ্ধ করেও সুফল মেলেনি তেমন। বরং বাংলাদেশ পরিবেষ্টিত ভারতের সীমান্তসংলগ্ন অনেক স্থানে রাতারাতি গজিয়ে উঠেছিল ফেনসিডিল কারখানা। দু’দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার পর ফেনসিডিলের বিস্তার ও আসক্তি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলো-এর পরিবর্তে বিপুল বিক্রমে থাবা বসিয়েছে ভয়াবহ মাদক ইয়াবা।

গণমাধ্যমের বিপুল প্রচার-প্রচারণা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পরও এর বিরুদ্ধে তেমন প্রতিরোধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সুতরাং এনপিএস, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদকের সর্বাত্মক প্রতিরোধে সরকারকে আরও তৎপর এবং কঠোর হতে হবে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মতো নিয়মিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোন সুযোগ নেই।