১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাংবাদিক খাশোগি নিখোঁজ হলেন?

সারাবিশ্বে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হলো বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের জন্য বড় হুমকি। সব দেশেই সাংবাদিকতাকে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ওপর যেসব সাংবাদিক ক্ষমতাসীন শাসক কিংবা শাসকনীতির সমালোচনা করে থাকেন, তাদের তো পদে পদে বিপদ। সৌদি আরবের সাহসী সাংবাদিক জামাল খাশোগি অনুমান করতে পেরেছিলেন তার বিপদের কথা। তাই মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর একের পর এক বিরুদ্ধ মত প্রকাশকারী, বুদ্ধিজীবী ও ইসলামী ধর্মপ্রচারকেরা গ্রেফতার হওয়ার পরিস্থিতিতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ছেড়ে পালিয়ে আমেরিকায় চলে যান তিনি। তিনি বলেছিলেন, জঙ্গী সংগঠন দাবি করে সৌদি আরব মুসলিম ব্রাদারহুডকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। সেই সংগঠনের পক্ষে মত প্রকাশ করায় পান-আরব (যারা আরব জনগণ ও দেশগুলোর জন্য একই রাজনৈতিক মতাদর্শের একক রাষ্ট্র চায়) মতাদর্শের দৈনিক পত্রিকা আল-হায়াতে তাঁর লেখা নিষিদ্ধ করা হয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টে এক কলামে তিনি লিখেছিলেন, সৌদি আরবে তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসার পর প্রতীজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি দেশটিতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করবেন। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সেখানে চলছে ধরপাকড়ের রাজনীতি।’

সৌদি আরব বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাংবাদিক হিসেবে বিবেচিত খাশোগি কলাম লিখতেন ওয়াশিংটন পোস্টে। যুবরাজ সালমান সঙ্গত কারণেই পছন্দ করতেন না সেসব কলামে প্রকাশিত সমালোচনা। তাই সম্প্রতি তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে প্রবেশ করার পর জামাল খাশোগিকে জনসমক্ষে আর দেখতে না পাওয়ায় আশঙ্কা করা হচ্ছে ভিন্নমত পোষণকারী এই সাংবাদিককে চিরতরে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

লক্ষণীয়, ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেট থেকে সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আর ওই দিন আকস্মিকভাবে কনস্যুলেটের তুর্কী কর্মীদের ছুটিও দিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিঃসন্দেহে সন্দেহজনক এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধেই যায় সেটি। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে খাশোগির নিখোঁজ হওয়া সংক্রান্ত সংবাদ এবং অভিমতগুলো পর্যালোচনা করলে যে কোন সাংবাদিকই শঙ্কিত বোধ করবেন। কলমের শক্তিকে মোকাবেলা করতে না পেরে কলমধারী মানুষটিকে গায়েব করে দিতে হবে! বিশ্বে আইন বলে কি কিছু নেই! অন্য একটি স্বাধীন দেশে বিশেষ ঘাতক টিম পাঠিয়ে একজন নাগরিককে সরিয়ে দেয়ার মতো স্বেচ্ছাচার ও বর্বর অপরাধ সংঘটিত করা তাহলে সম্ভবপর!

আন্তর্জাতিক একটি বার্তা সংস্থাকে একজন তুর্কী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গোয়েন্দাদের ‘প্রাথমিক ধারণা’ হলো, জামালকে কনস্যুলেটের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয় পাতার সম্পাদক এক বার্তায় বলেন, ‘যদি জামালের হত্যার খবরটি সত্য হয় তাহলে এটি হবে একটি দানবীয় ও অপ্রচলিত কাজ।’

খাশোগি নিখোঁজ হওয়ার রহস্যে জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দুটি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। আর এই জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রও। তুরস্ক সতর্ক ও সাবধানী কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবেলার পথে হাঁটছে। রিয়াদের সঙ্গে বড় কোন কূটনৈতিক ঝামেলায় জড়াতে চায় না আঙ্কারা। আর ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি যুবরাজের প্রতি আস্থাশীল হলেও তুরস্কে একটি কনস্যুলেটে মার্কিন ও দেশটির সমালোচক কলামিস্টকে এভাবে হত্যার ঘটনায় কংগ্রেস সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চাপ দেয়ারই কথা। ব্রিটেনও ইতোমধ্যে কড়া প্রশ্ন তুলেছে সৌদি আরবের কাছে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সৌদি আরবকে তাদের দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে বলেছে যে, খাশোগি কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এখন হত্যার আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করে খাশোগি যদি ফিরে না আসেন তাহলে সৌদি আরবের সঙ্গে বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেবে সেটাই দেখার বিষয়।