১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট আইএমএফ ॥ মুহিত

  • ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বব্যাংক আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলন শুরু

এম শাহজাহান, ইন্দোনেশিয়ার বালি থেকে ॥ বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে। আইএমএফ সম্প্রতি ঢাকা সফর শেষে একই তাগিদ দিয়েছিল। শুক্রবার আইএমএফ উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মিতসুহিরোর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর আগে সকালে বালির নুসা দুয়া সি বীচ হোটেলের আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সাধারণ সভার তিনদিনব্যাপী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন অর্থমন্ত্রী।

সাংবাদিকদের অপর প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি দাতা সংস্থাগুলোর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এ সরকার ক্ষমতায় আবার এলে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। তবে খালেদা জিয়া এলে প্রবৃদ্ধি নিচ থেকে আরও নিচে চলে যাবে। বেগম জিয়া দেশের উন্নয়ন চান না, সমৃদ্ধি বোঝেন না। তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচনে জিডিপির প্রবৃদ্ধির কোন ক্ষতি হবে না। অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত থেকে বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশ হচ্ছে। সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল বিশ্বের রোল মডেল। অর্থনৈতিক সব সূচকে ভাল করছে দেশ। উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের এই অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট। সাংবাদিকদের মুহিত বলেন, আওয়ামী লীগই আবার সরকার গঠন করবে। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন এসেছে। কোন উত্তাপ নেই। সাধারণ মানুষ উত্তাপ আর জ্বালাওপোড়াওয়ের রাজনীতি পছন্দ করছে না। উন্নয়নের রাজনীতির সঙ্গে মানুষ আছে এবং থাকবে। বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এক ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানে আলোচনা হয়নি। কারণ নির্বাচন নিয়ে দেশে কোন উত্তাপ নেই। একমাত্র ফখরুল ইসলামের উত্তাপ আছে। ফখরুল ইসলাম প্রতিদিন নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। অবশ্য গত দশ বছর ধরে তিনি বলেই যাচ্ছেন। তিনি থামছেন না। এতে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, নির্বাচনের কারণে আগামী বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমবে না। নির্বাচনের পর কে সরকারের দায়িত্ব নেবে তার ওপর নির্ভর করবে কোন্দিকে যাবে এ প্রবৃদ্ধি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের ডিএমডি বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে তাদের কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। আমি তাদের বলেছি, বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের এই সরকারের সময়েই এ বিষয়ে একটা ব্যবস্থা নিয়ে রাখা হবে, যা পরবর্তী সরকার সেটা বাস্তবায়ন করবে।

সম্মেলনের জাঁকজমক উদ্বোধন ॥ শুক্রবার সকালে নুসা দুয়া কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। এ সময় তিনি বিশ্ব নেতাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না জড়িয়ে সমৃদ্ধ অর্থনীতির স্বার্থে সব দেশকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।

বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেন, দারিদ্র্য, বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, সহিংসতা ও সামাজিক ভঙ্গুরতা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রত্যেক দেশের মধ্যে গ্লোবাল প্রতিক্রিয়া এবং উন্নত সহযোগিতার প্রয়োজন। তিনি বলেন, সম্প্রতি অর্থনৈতিক অশান্তির পদচারণা বিরাজ করছে। এ থেকে রক্ষা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যৌথ পদক্ষেপের জন্য একটি ফোরাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উইদোদো বলেন, একটি দেশের নীতির অন্যতম প্রভাব বিস্তারের কারণে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। মনে রাখতে হবে, একতরফা অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বের সম্পদ বৃদ্ধি করে না, এটি শুধু দেশ ও জনগণকে দরিদ্র করে তুলে। প্রেসিডেন্ট উইদোদো বলেন, দারিদ্র্য ও বৈষম্য সুরক্ষার দিকে প্রবণতা বেশি। এতে বৈশ্বিক দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যে লড়াই চলছে তার ক্ষতি করবে। এ সময় তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাপী একটি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধনী বা গরিব যে কোন দেশের মানব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব বিস্তার করতে পারে। গত দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাত লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং এক শ’ কোটি মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, গত ২৫ বছরে বিশ্বে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১০০ কোটির বেশি কমেছে। এই সফলতা উল্লেখযোগ্য হলেও বিশ্বে এখনও প্রায় ৭৪ কোটি মানুষ (৭৩৬ মিলিয়ন) অতিদরিদ্র রয়েছে। এই সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং তথ্য প্রযুক্তিতে জোর দিতে বিশ্ব নেতাদের আহ্বান জানান বিশ্বব্যাংক প্রধান। আইএমএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিসিটনা লাজার্ড বলেন, গত ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধি হয়েছে তা অভূতপূর্ব। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক কিছু নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং বাণিজ্য নিয়ে যে উত্তেজনা চলছে (যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ) তা বন্ধ না হলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগামী দুই বছরে ১ শতাংশ কমে যেতে পারে। এই উত্তেজনার অবশ্যই অবসান দরকার। ইন্দোনেশিয়ার সোলায়সী দ্বীপে সম্প্রতি সুনামিতে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর এবং সরকারী-বেসরকারী খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এ সম্মেলন শেষ হবে ১৪ অক্টোবর।

এবারের সম্মেলনে মোট পনেরো হাজার প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। এরমধ্যে গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এক হাজারের বেশি। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের নেতৃত্বে ২৭ সদস্যের প্রতিনিদিল এখন বালিতে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির, ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম এই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সবচেয়ে বড় এই সম্মেলনে এ দুই উন্নয়ন সংস্থার সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ছাড়াও বেসরকারী খাতের নির্বাহী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথমভাগে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এই সভা হয়।