১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগ বিধিতে পরিবর্তন আসছে

  • এখন থেকে পুরুষের মতো নারীদেরও ন্যূনতম যোগ্যতা হবে স্নাতক ডিগ্রী

বিভাষ বাড়ৈ ॥ এইচএসসি পাস করেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার দিন আর থাকছে না। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার সঙ্গে সঙ্গে এ স্তরে দক্ষ নারী শিক্ষক নিয়োগের জন্যও আসছে নতুন নিয়োগ বিধি। সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে পুরুষ প্রার্থীর মতো নারীদেরও আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা করা হচ্ছে স্নাতক ডিগ্রী। সহকারী শিক্ষক নিয়োগে বাধ্যতামূলক হচ্ছে ২০ শতাংশ বিজ্ঞান শিক্ষক। এছাড়া দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় মানসম্মত, দৃষ্টিনন্দন করে তুলতেও নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। প্রথমে ঢাকা মহানগরের প্রতিষ্ঠানকে সাজানো হলেও পর্যায়ক্রমে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে দেশের ৬৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই নীতিমালার আলোকে নারী-পুরুষ সবারই শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হচ্ছে স্নাতক বা সমমান। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আগের বিধিমালাটি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত সপ্তাহে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় প্রস্তাবটি উপস্থাপন করলে তাতে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আকরাম-আল-হোসেন বলেছেন, প্রস্তাবিত বিধিমালাটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আগের বিধিমালা অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পুরুষ প্রার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল স্নাতক বা সমমান। আর নারীর ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল এইচএসসি বা সমমান। নতুন বিধিমালায় নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ শতাংশ বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে নতুন বিধিমালায়। এছাড়া আগামী বছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঁচ হাজার ১০৬ জন সঙ্গীত ও শরীরচর্চা বা ক্রীড়া বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ দেবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেই বলছেন, এমনিতেই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে এখন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রীধারীরাই বেশি আসছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে মানসম্মত শিক্ষকের কোন বিকল্প নেই। এখন আর শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আগেই এর পরিবর্তন দরকার ছিল জানিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন, চলতি বা আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শিক্ষক পরীক্ষায় অবশ্য বর্তমান বিধিই কার্যকর থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার ফলে এ স্তরে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ছাড়াও বিদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলোও তাগাদা দিয়ে আসছিল।

কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত দুটি কারণে নারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত করার প্রভাবের বিষয়টি। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষকের যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক হওয়া উচিত-একথা দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন বহুদিন ধরে। এটা না হলে তার পক্ষে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কষ্টকর হয়ে পড়বে।

আরেকটি কারণ হচ্ছে, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে সহকারী শিক্ষক থেকে ৬৫ শতাংশ পদোন্নতি হওয়ার ঘটনা। প্রধান শিক্ষক পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীর। এ পদের জন্য কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রীধারী আবশ্যক বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু নারী শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকায় তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতির হার কম হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিকে নিয়োগের যোগ্যতা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ রমজান আলী জনকণ্ঠকে বলেন, বড় পরিবর্তন হচ্ছে শিক্ষাগত যোগ্যতায়। এখন আর আসলে এইচএসসি পাস এ নিয়োগে চলে না। তিনি আরও বলেন, এমনিতেই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে এখন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরাই বেশি আসছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে মানসম্মত শিক্ষকের কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। ফলে এখন আর শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি চলে না।

নতুন বিধিমালায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগেও জোর দেয়া হয়েছে। বর্তমানে যে কোন বিষয়ে পাস করা প্রার্থীর সমান সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এতে মানবিক বিভাগ থেকে আসা শিক্ষকরা গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো সহজে আত্মস্থ করতে পারেন না। এ কারণে নতুন বিধিমালায় সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মোট পদের শতকরা ২০ ভাগ বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্য থেকে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্লাস্টার বা উপজেলাভিত্তিক আর্ট ও সঙ্গীত শিক্ষক রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে শিক্ষক নিয়োগ আগের মতোই উপজেলা বা থানাভিত্তিক হবে। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত সহকারী শিক্ষক নির্বাচন কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোন ব্যক্তিকে সহকারী শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগ দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা না হলে কাউকে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া যাবে না। এমন ব্যক্তিকে বিয়ে করেছেন অথবা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন, এমন ব্যক্তিকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া যাবে না।

এদিকে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয় মানসম্মত, দৃষ্টিনন্দন করে তুলতেও নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। স্কুলগুলোকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমে ঢাকা মহানগরের বিদ্যালয়গুলোকে নতুনভাবে সাজানো হবে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নতুন উদ্যোগের কারণ ব্যাখ্যা করে বলছেন, সরকারী জরিপে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সন্তান ভর্তি করতে আগ্রহ নেই অধিকাংশ অভিভাবকের। প্রতিষ্ঠান আকর্ষণীয় হওয়ায় সরকারী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিভিন্ন কেজি স্কুল এবং নামী-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে চান তারা। কেবল নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছে না।

সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের আনতেই সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন নির্মাণ, ভবন সংস্কার, প্রাচীর তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিদ্যালয়ের ভেতর-বাহিরে চাকচিক্য করে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি জরিপ করা হয়েছে জানিয়ে কর্মকর্তারা বলেছেন, সেখানে ৩৭ শতাংশের বেশি স্কুলের ভবন ব্যবহারের অনুপযুক্ত বলে তথ্য মিলেছে।

দেশে সরকারী প্রাথমিক স্কুল রয়েছে ৬৪ হাজার ১১২টি। ২০১৩ সালে নতুন জাতীয়করণ করা স্কুল রয়েছে ২৬ হাজার ১৯৩টি। ঢাকা মহানগর জুড়ে রয়েছে ৩৪২টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। সারাদেশে মোট প্রাথমিক সরকারী স্কুলগুলোর ৩৭ শতাংশের বেশি স্কুলের ভবন ব্যবহারের অনুপযুক্ত।

রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এ ছাড়াও পুরান ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ১২টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ৩০ জন করে। একটি রুমের মধ্যে চলছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। অথচ সেসব বিদ্যালয়ে পাঁচজন করে শিক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন।

এমন অবস্থার কথা মাথায় রেখেই সারাদেশের সকল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে রাজধানী ঢাকার ৩৪২টি বিদ্যালয়কে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হবে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকার সব বিদ্যালয় সংস্কার করা হবে।