১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্প্রীতির বাঁধনে মন্ডপগুলোয় দেবী দুর্গার আগমন

সমুদ্র হক ॥ স্নিগ্ধ শরতের কাশবন দুলে উঠেছে অনেক আগেই। এখন শেষের পালা। এরই মধ্যে ঢাকের কাঠির বাদ্যিতে শারদীয় দুর্গা উৎসবের পালা শুরু হয়েছে। সুর বাজছে ‘আয়রে ছুটে আয় পূজার ঘণ্টা বেজেছে...”। মহালয়ায় চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। তবে উৎসবের পালা শুরু হয়েছে এর আগেই। এই সময়টায় গতি পেয়েছে। শুক্রবার মন্ডপগুলোতে দেবী দুর্গা ও তার পরিবারকে আসন দিতে নিয়ে যাওয়া হয়। অশুভ সকল শক্তির বিনাসে সম্প্রীতির বাঁধনে ত্রিভুবন এখন শারদীয় দুর্গোৎসবে মেতে উঠেছে। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে পৃথিবীর মঙ্গল কামনায় দশভূজা শক্তিরূপী দেবী দুর্গার এবার কৈলাস থেকে পিতৃগৃহ মর্ত্যালোকে আগমন ঘোড়ায় চড়ে। স্বর্গালোকে ফিরবেন দোলায় (পালকি) চেপে।

সোমবার ষষ্ঠী বিহিত পূজার মাধ্যমে সায়ংকাল। শুরু আমন্ত্রণ অধিবাস। এভাবে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী হয়ে বিজয়া দশমীতে হবে বিসর্জন। পুরোহিতের ভক্তিকণ্ঠে মন্ত্র উচ্চারিত ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা...নমস্তৈস্য নমস্তৈস্য নমোঃ নমোঃ...।’ ম-পগুলোতে ধূপের ধোঁয়া, ঢাক, ঢোলকের বাদ্যি, কাঁসরবাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, পূজা অর্চনা প্রসাদ বিতরণসহ নানা অনুষঙ্গে ভরে ওঠে। লুচি, লাবরা (সবজি), নারিকেলের নাড়ু, চিড়া মুড়ির মোয়া, খিঁচুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন। ছেলেরা পরবে ধূতি, নক্সী পাঞ্জাবি, মেয়েরা বাহারি শাড়ি, ছোট্ট ছেলেমেয়েরা নতুন পোশাক। মেয়েরা পরস্পরের সিঁথিতে, হাতের নোয়ায় সিঁদূর দিয়ে মঙ্গল ও সৌভাগ্য কামনা করবে। পূজার দিনগুলো কাটবে আনন্দে।

দুর্গা শব্দের অর্থ দুর্জ্জেয়া। জীবের দুর্গতি হরণ করেন। সকল দেবের সমম্বিত শক্তি দুর্গা দেবী উমা, পার্বতী, গৌরী নামেও পরিচিতি। পুরাকালে একসময় অসুরদের রাজা মহিষাসুর দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে স্বর্গরাজ্যের অধিপতি হন। অসুরদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেলে দেবতারা ব্রহ্মাকে সামনে রেখে শিব ও বিষ্ণুর কাছে অসুরদের কার্যকলাপ বর্ণনা করেন। মহিষাসুর বিনাশের উপায় বের করার আবেদন জানান। এসব কথা শুনে ক্ষুব্ধ হলেন শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতা। তাদের মুখম-ল থেকে নির্গত হলো মহাতেজ। সকল তেজরাশি মিলে এক দেবমূর্তি ধারণ করল। তিনিই দেবী দুর্গা। দেবতারা এই মহাদেবীকে সাজিয়ে দিলেন অস্ত্র ও অলঙ্কারাদি দিয়ে। ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা ও কমু-ল। শিব দিলেন ত্রিশূল। বিষ্ণু দিলেন চক্র। বরুণ দিলেন শঙ্খ। ইন্দ্র দিলেন বজ্র। যম দিলেন দ-। হিমালয় দিলেন সিংহ। দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধ করলেন।

দুর্গা পরিবারের প্রত্যেকের আছে বাহন। দুর্গার বাহন সিংহ। কার্ত্তিকের ময়ূর। সরস্বতীর হাঁস। লক্ষ্মীর পেঁচা। গণেশের ইঁদুর। পুরাণে প্রতিটি বাহনের তাৎপর্য বর্ণনা করা আছে। দুর্গাপূজায় গণেশ মূর্তির ডান পাশে নয়টি গাছের উপকরণ সংবলিত পাতা রাখা হয়। যাকে বলা হয় নব পত্রিকা। কলা, কচু, ধান, হলুদ, ডালিম, বেল, অশোক, জয়ন্তী ও মানকচু। লাল পাড়ের নতুন শাড়ি দিয়ে নয় পাতাকে সজ্জিত করা হয়। বলা হয় বসুন্ধরার প্রতীক। যা কলা বউ নামেও পরিচিত। পৌরণিক বর্ণনায় ব্রহ্মার দাবি, পৃথিবীতে পদ্মই শ্রেষ্ঠ ফুল। যে কারণে পূজার অঞ্জলিতে ১শ’ ৮টি পদ্ম থাকে।

ইতিহাস থেকে জানা যায় : এই দেশে প্রতিমায় দুর্গা পূজার প্রবর্তন করেন রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। এর আগে পন্ডিত রঘুনাথ ‘দুর্গা পূজাতত্ত্ব¡’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তী সময়ে নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পূজাকে জনপ্রিয় করেন। ১৯০১ সালে বেলুর মঠে জাতি ধর্ম শ্রেণী বিভেদ ভেঙ্গে এই পূজাকে সর্বজনীন রূপ দেন স্বামী বিবেকানন্দ। তারপর দুর্গা পূজা সাগর মহাসাগর পেরিয়ে বিশ্বেও দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়টায় বিশ্বের নেতৃবৃন্দ একটি শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। অশুভ শক্তি দমন করে বাসযোগ্য একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠুক এমনটি কামনা করেন পূজার আয়োজকগণ।