১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আজ সারাদেশে ভারি বর্ষণ হতে পারে

  • তিতলি গভীর নিম্নচাপে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ দুর্বল হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর জেরে আজ শনিবার সারাদেশে ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আজ চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হবে। আজও সারাদেশে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। রবিবার দুপুরের পর ‘তিতলি’র প্রভাব সম্পূর্ণ কেটে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। তাপমাত্রা বেড়ে আবার স্বাভাবিক আবহাওয়া বিরাজ করবে।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এলাকায় বায়ু চাপের তারতম্যের আধিক্য বিরাজ করছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং দেশের উপকূলীয় এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার সৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে শুক্রবার সারাদিন দেশের আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। সারাদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। এর প্রভাবে গত সোমবার থেকে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। আজ আরও ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণ হতে পারে। বন্দরসমূহের ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়ার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের উড়িষ্যা এবং তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘তিতলি’ সামান্য উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর এবং দুর্বল হয়ে একই এলাকায় গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। এটি শুক্রবার সকালে ভারতের উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমশঃ দুর্বল হতে পারে।

তবে ভারতের আবহাওয়া দফতর উল্লেখ করেছে ঘূর্ণিঝড় তিতলি ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে। বাংলায় প্রবেশ করছে নিম্নচাপ আকারে। এই নিম্নচাপের রেশ বজায় থাকবে ৪৮ ঘণ্টা। এই ৪৮ ঘণ্টায় দুদিন মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, আমাদের এই ভূখন্ডে যখন প্রবেশ করবে একেবারে শক্তিহীন অবস্থায় লঘুচাপ আকারে। তবে এর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে যেমন বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী দুদিন প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে।

আন্দামান উপকূলে গত সোমবার জন্ম নেয়া নিম্নচাপটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় তিতলিতে রূপ নিয়ে ভারতের উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র উপকূলে আঘাত হানে। এর প্রভাবে ওই দুই রাজ্যে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। অন্ধ্র উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়ায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ।

আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, তিতলি বর্তমানে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হলেও আজ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এটি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলে বৃষ্টিপাত আরও বাড়বে। তিনি বলেন, এর প্রভাবে আজ শনিবার চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। দেশের অন্যত্র মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ হবে। তিনি উল্লেখ করেন আজ শনিবার আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতির কোন সম্ভাবনা নেই। আকাশ থাকবে মেঘাচ্ছন্ন। রোদের দেখা পাওয়া যাবে না। আগামীকাল রবিবার দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতির আস্তে আস্তে উন্নতি হবে। তখন মেঘ কেটে গিয়ে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। পরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে পড়বে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, উড়িষ্যা ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বরিশাল, খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। অতি ভারি বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের কোথাও ভূমি ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে গত সোমবার থেকে সারাদেশের বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। গত তিনদিন রাজধানীতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। শুক্রবার রাজধানীতে সূর্যের মুখ দেখা যায় যায়নি। তবে সকালের দিকে থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এর প্রভাবে শুক্রবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত টেকনাফে দেশের সর্বোচ্চ ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তিতলির প্রভাবে সারাদেশে বৃষ্টির পাশাপাশি স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু জোয়ারে কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপ ও কুতুবদিয়ার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে ২৪ ঘণ্টা পর আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শুক্রবার রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রী কমে আসতে পারে।

চট্টগ্রাম অফিস ॥ ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে শুক্রবার দিনভর বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আগের দিনও দিনব্যাপী গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাস কাজ চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। তবে শুক্রবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটায় পণ্য খালাসের চেষ্টা চলছে বলে বন্দর সূত্রে জানানো হয়েছে। তবে বন্দরের মূল জেটিগুলোতে কন্টেনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে কোন ব্যাঘাত হচ্ছে না।

শুক্রবার সরকারী ছুটির দিন থাকায় অধিকাংশ মানুষ ঘর থেকে বের হয়নি। একান্ত প্রয়োজনে যাদের বের হতে হয়েছে তাদের ভারি বর্ষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে হয়েছে। কখনও থেমে থেমে, আবার কখনও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর নিচু এলাকাসমূহ পানির নিচে তলিয়ে যায়। তবে তা খুব বেশি উচ্চতার ছিল না। কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও কিছুটা বেশি জলজটের ঘটনা ঘটলেও খুব দ্রুত এগুলো অপসারিত হয়ে যায়। এ সময় জনচলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। আর ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দিনভর ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত।

এদিকে, নগরীর ফিশারিঘাটে ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোর অবস্থান পরিলক্ষিত হয়েছে। বিভিন্ন ট্রলারকেও কর্ণফুলী নদীতে নোঙ্গর করে থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া কর্ণফুলীর মোহনায় সারি সারি লাইটার জাহাজের লাইন। যেহেতু বহির্নোঙ্গরে পণ্য খালাস কাজ বন্ধ রয়েছে এবং আবহাওয়া দফতর সকল ধরনের নৌযানকে নিরাপদ স্থানে সরে থাকতে বলেছে সে কারণে এসব নৌযানের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান।

এদিকে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নগরীর লালখান বাজার ও মতিঝর্ণা এলাকায় গত তিন দিন ধরে মাইকিং করে আরও ৩ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন। কিন্তু স্থায়ী কোন মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় এসব লোকজন আবারও অভিযানের পর ফিরে এসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দুর্যোপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশ এবং চূড়ায় থাকা পরিবারগুলো। ফলে মাইকিং করে গত তিনদিন ধরে এদের সরানোর চেষ্টা করেছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু তিনদিনে প্রায় ৮ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে পারলেও পরক্ষণে তারা আবার ফিরে এসেছে। শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সাড়ে ৬ ঘন্টার অভিযানে ৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

রাঙ্গামাটি ॥ ঘূর্ণিঝড় তিতলির প্রভাবে অবিরাম ভারি বর্ষণ শুরু হয়েছে। বর্ষণের ফলে রাঙ্গামাটির জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা তিনদিনের বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের পাদদেশ ও কাপ্তাই লেকের তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী প্রায় ৪০ হাজার লোকের মধ্যে ভূমিধস আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

ভারিবর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়ায় শুক্রবার জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে রাঙ্গামাটি শহরের লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য শহরে বারবার মাইকিং করা হয়েছে। একই সঙ্গে শহরের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোকে চিঠি দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।