১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুল তোলা হলুদ জামাটি

  • জ্যোৎস্নালিপি

পূজার সময় মানেই মামাবাড়ি বহরপুরে যাওয়া। পূজা ছাড়াও বছরের নানা পার্বণে আমরা মামাবাড়িতে যাই। মামাবাড়িতে যৌথপরিবার। প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশজনের কাছাকাছি মানুষ প্রত্যেক বেলাতে খাওয়া-দাওয়া করে। আত্মীয় কুটুম থেকে শুরু বাড়ির কাজের লোক, কৃষক, ভিক্ষুক সকলেই। আমার তখন শৈশব। মামাবাড়ি যাওয়ার প্রতি প্রবল আকর্ষণ। এই আকর্ষণের নানাবিধ কারণ আছে। প্রথম কারণ চানুমাসি। চানু মাসির বয়স আমার একেবারে কাছাকাছি নয়। তবুও তার সঙ্গেই আমার বন্ধুত্ব। তাকে সব গল্প বলা যায়। সে সুন্দর করে ছবি এঁকে দেয়। ভোরবেলা যখন সে পূজার ফুল তোলে তখন সঙ্গে নেয়, নদীতে স্নান করতে নিয়ে যায়। এমনকি বাগানে যাওয়া, পাড়া বেড়ানো সবকিছুতেই আমায় সঙ্গে রাখে। মামাবাড়ির পাশেই চন্দনা নদী। মাসি দিদাদের সঙ্গে প্রতিদিন তেল মেখে স্নান করতে যাওয়া। তারপর সন্ধ্যে হলেই প্রতিদিনই হাট থেকে কোনদিন জিলাপি-মিষ্টি, কোনদিন সিঙ্গারা-পেঁয়াজু বা লাড্ডু আনা। এবং সেগুলো মজা করে খাওয়া। সকালবেলায় চায়ের সঙ্গে বিস্কুট অথবা মুড়ি-চিড়া ভাজা, যা আমাদের পরিবারে হতো না। বলা চলে রেওয়াজ ছিল না। সকাল হলেই আমার সবাই ভাত খেতাম। মা-বাবা ভাত খেয়েই কাজে চলে যেত। আমার ঠাকুমা, দাদু কাকা-কাকিরা সবাই সকালে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত খেতে বসত পিঁড়ি পেড়ে। আমাকেও ঠাকুরমা সকালে নিজ হাতে ভাতই খাইয়ে দিত। যা হোক বলছিলাম মামাবাড়ির কথা- তারপর আরও অনেক মজা আছে মামাবাড়িতে। মামাদের বাগানবাড়িতে একা একা, কখনও দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো, আমগাছে কিংবা মামাদের উঠনোর বাঁ-দিকটার মস্ত কাঁঠাল গাছের কাঠের পিঁড়ির দুপাশে রশি দিয়ে দোলনা বেঁধে দোল খাওয়া। বাগানের মধ্যে সুপারিগাছের পাতা দিয়ে ঘর বানিয়ে তার মধ্যে চড়–ইভাতি খেলা। আর পুকুরের ধারে মাচালে বিকেল হলেই মা-মাসিদের সঙ্গে বসে গল্প করা। আমার জন্য আরও একটা মজা আছে, সেটা হলো মেজ মামার ছিল কাপড়ের দোকান। সেখানে কাপড় সেলাই করা হতো। মামা আমার পুতুলের জন্য টুকরো কাপড় দিয়ে ছোট ছোট জামা, প্যান্ট তৈরি করে দিত। যা বাড়িতে নিয়ে এসে আমার খেলার সঙ্গীদের দেখিয়ে মজা পেতাম। আমার মতো এত সুন্দর করে তৈরি করা পুতুলের জামাকাপড় সে সময় আমাদের পাড়ায় খেলার সঙ্গীদের কারোই ছিল না। আর সে কারণেই সকলেই আমার পুতুলের সঙ্গে ছেলেমেয়ে বিয়ে দেয়া ও খেলার জন্য আগ্রহী থাকত। একবার হয়েছে কী! পূজা ঠিক কদিন আমরা মামাদের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। তখন সবে আমার ছোট ভাইটি হয়েছে। ভাইকে নিয়ে আমাদের সবার সেই প্রথম মামাবাড়িতে যাওয়া। সবার আগ্রহ তখন ভাইয়ের প্রতি। আমি খুব চিন্তিত। আমায় সবাই আগের মতো আদর করবে তো! মামা পুতুলের নতুন জামা বানিয়ে দেবে তো! এমন অনেক রকম চিন্তা আমার ছোট্ট মনে ভিড় করতে লাগল। কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আদর একটুও কমল না। সেই আগেই মতোই আমি বনেবাদারে ঘুরতে লাগলাম। তবে আগের চেয়ে যেন আমার একটু সুবিধেই হলো। মা ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আমাকে খুব বেশি খেয়াল করতে পারল না। আমি আরও বেশি করে বনেবাদারে ঘুরতে লাগলাম। মনের সুখে মাটিতে গড়াগড়ি খেতাম। মামার সঙ্গে তার টেইলার্সে গিয়ে জামাকাপড় বানানো দেখতাম। এবার মামা আমাকে একটা ফুল তোলা সুন্দর একটা হলুদ ফ্রগ বানিয়ে দিল। কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে হলো, এমন একটা জামা যদি আমার পুতুলের হতো। ইচ্ছার কথাটা মামাকে বলেই ফেললাম। মামার তখন অনেক ব্যস্ততা। পূজার কারণে টেইলার্সে ভিড়। সরারাত জেগে কর্মচারীরা কাজ করে। সাইকেলে সঙ্গে বড় একটা টিফিন ক্যারিয়ার রশি দিয়ে বেঁধে সেটা চালিয়ে দুপুর বেলাতে দলবেঁধে পালাক্রমে খেতে আসে। মামাদের বিশাল বারান্দায় পিঁড়ি পেতে বসে তারা খাবার খায়। আমি তাদের আশপাশেই থাকার চেষ্টা করি, তাদের খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। তারপর খোঁজ নিই আমার পুতুলের সেই হলুদ জামাটি তৈরি হয়েছে কিনা। প্রতিবারই মন খারাপ করে দেয় ওদের কথা। পূজা শুরু হয়ে যায়। পুতুলের জামা আর বানানো হয় না। মাসি-মামিদের সঙ্গে আমরা দলবেঁধে পূজা দেখতে যাই বিভিন্ন মন্দিরে। মা একটু কম বেড়ায়, ভাই ছোট হওয়ার কারণে। আমার মন ভাল হয় না। সেদিন দশমী। প্রতিমা ডোবানোর দিন। মামাদের বাড়ির পাশের চন্দনা নদীর পাড়ে মেলা বসে এদিন। অনেক ভিড়। আমরা দুপুরের ঠিক পরপরই মেলায় যাই। ধুপতি নাচ দেখি। ধোঁয়ায় আমার চোখ জ্বালা করলে চানু মাসির হাত ধরে মেলায় ঘুরে ঘুরে পাঁপড়, খাজাবাতাসা, ঢ্যাঁপের খই কিনে খাই। আরো কিনি নানা রকমের মাটির পুতুল, পশুপাখি। সেদিন আমার পরনে মামার দেয়া হলুদ ফুল তোলা জামা। দেখতে দেখতে এক পশলা বৃষ্টি এসে আমাদের ভিজিয়ে দেয়। আমি দৌড়াতে গিয়ে গড়তে গড়তে নদীর পাড়ে কাদার মধ্যে গিয়ে পড়ি।

আমার ফুল পতালা হলুদ জামাটি তখন কাদাবালিতে মাখামাখি। এমনকি আমার মুখও। আমায় দেখে অন্যরা হেসে গড়াগড়ি করে। আমার খুব অভিমান হয়। দিদু বলে, সে ধুয়ে দেবে জামাটি। আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। থামতেই চায় না আমার কান্না। অভিমানে। দুঃখে। সবচেয়ে বেশি অভিমান হয় মেঝ মামার ওপর। সে ব্যস্ততা দেখিয়ে আমাকে পুতুলের জামাটি বানিয়ে দেয়নি। তার ওপর জামাটিও নষ্ট হয়ে গেল। প্রতিমা ডোবানো হলে আমার ঘরে ফিরি কয়েক কেজি জিলাপি আর পাঁপড়ভাজা নিয়ে। আর দুদিন পরই আমাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা। যথারীতি দিন চলে আসে। আমি আমার জামাকাপড় আর খেলনা সামগ্রী গোছানো শুরু করি। তারপর ট্রেনে চেপে নিজ বাড়িতে চলে আসি। আমার খেলার সাথীরা একে একে কী কী খেলনাপাতি এনেছি সেগুলো দেখার জন্য অস্থির হয়ে থাকে প্রতিবারের মতো। এবার আর তেমন আগ্রহ পাই না আমি। বলি, পরে দেখাব। ওরা মন খারাপ করে চলে গেলেও পুনরায় ফিরে আসে আর আমার নতুন আনা খেলনা দেখবে বলে বায়না করে। মা আলাদা করে যে কাপড়ের ব্যাগটাতে আমার খেলানাপাতি গুছিয়ে রেখেছিল, সেটা নিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বারান্দায় বসি। সবার চোখ ব্যাগটার দিকে, কিন্তু আমার মনে কোন উচ্ছ্বাস নেই! আগ্রহ নেই! একরকম মন খারাপ করেই ব্যাগের মধ্যে হাত দেই আমি। আর বের করে আনি মাটির হাতিঘোড়া, পুতুলমাছ। আাী কত রকমের খেলনা। লাল রঙের পুতুলটি রেখেছিলাম ব্যাগের ছোট্ট চেম্বারে। তার মধ্যে হাত দিই। লাল রঙের পুতুলের সঙ্গে আমার হাতের মধ্যে উঠে আসে ছোট্ট একটি জামা। যার রংটি হলুদ। আর ফুল পতালা। আমার চোখে তখন খুশির ঝিলিক। শুধু জামা নয়, ছোট্ট এক টুকরো পুতলের শাড়ি, ব্লাউজ আর পেটিকোটও আছে তাতে। আমি তখন ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলি। মা ছুটে আসে আমার কান্নার শব্দে। আমার সঙ্গীদের চোখে বিস্ময়। তারা মাকে বলে, তারা কিছু নেয়নি এবং আমাকে কিছু বলেনি। আমি এমনি এমনি কাঁদছি। মা আমার হাতের ফুল তোলা হলুদ জামাটি দেখে হো হো করে হেসে ওঠে। তখন আমার চোখে কান্না আর মুখে হাসি। আর আমার খেলার সঙ্গীদের চোখে তখন একরাশ বিস্ময়!

অলঙ্করণ : প্রসূন হালদার

নির্বাচিত সংবাদ