১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জ্ঞান সমাজের জন্য উন্নয়ন

  • রেজা সেলিম

মেধা ও বুদ্ধি বিকাশের খাতে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ কত এই নিয়ে নানারকম আলোচনা আছে। বিশ্ব বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রতিবেদন ২০১৮ যা প্রতি বছর প্রকাশ করে আঙ্কটাড (জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা) সেখানে ২০১৭ সালের হিসাবে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হার ২১৫.২ মিলিয়ন ডলার যেখানে ভারতের ৩৯৯১.৬ মিলিয়ন ডলার। এ সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারে বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩৪.১ মিলিয়ন ডলার। ২০১৪ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই চার বছরের বৈদেশিক বিনিয়োগের গড় বার্ষিক হার ২০৬.৭ মিলিয়ন ডলার। এ সময়ে ভারতে বৈদেশিক বিনিয়োগের হার ৪০৭৬ মিলিয়ন ডলার।

আমরা জানি, ভারতের চেয়ে সামাজিক উন্নয়নের কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী অনুসঙ্ঘ পুঁজি বিকাশে বিদেশের বিনিয়োগ আমরা আশানুরূপ আকৃষ্ট করতে পারিনি। ভারত আমাদের চেয়ে বড় দেশ, বেশি মানুষ কিন্তু উন্নয়নের সূচকে আমাদের অগ্রগতি বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচনে ভারতের ‘গরিবী হটাও’ কর্মসূচীর চেয়ে আমাদের সাফল্য অনেক বেশি। গত এক দশকে ভারতের তুলনায় বৈদেশিক বিনিয়োগে ৯৫ ভাগ পিছিয়ে থেকেও বাংলাদেশ তার সামাজিক খাতের উন্নয়নে অধিকতর উন্নয়ন কেমন করে সম্ভব করে তুলেছে সে চিন্তা প-িতেরা করতেই পারেন। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে মুম্বাই টাটা ক্যান্সার সেন্টারের এক সভায় দেখা হলে অমর্ত্য সেন আমাকে এই প্রশ্নটাই করেছিলেন ‘তোমাদের শেখ হাসিনা কোন একটা ম্যাজিক জানেন, তাই না?’ আসলে তিনি লিডারশিপের কথা বলেছিলেন, কোন দেশের উন্নয়নে নেতৃত্ব একটি জরুরী বিষয়, বাংলাদেশ সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিদেশের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ কোন দেশের উন্নয়নে যে প্রভাব রাখে তার সুযোগ থেকে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে কি-না।

সামনের ২২-২৬ অক্টোবর জেনেভায় জাতিসংঘের স্থায়ী দফতরে বসছে এ বছরের বিশ্ব বিনিয়োগ সম্মেলনÑ যা ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিসহ বিশ্বের ১৫ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এতে অংশ নেয়ার কথা। তাছাড়া বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রীসহ নানা দেশের অন্তত জনা ত্রিশেক মন্ত্রী ও হাজারখানেক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিবিদ ও পুঁজি সংরক্ষক সমাজের প্রতিনিধি এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এসব ফোরাম থেকে বৈদেশিক বিনিয়োগে বাংলাদেশ কী কী সুবিধা আদায় করে নিতে পারে সেটাও আমাদের ভাবা দরকার।

২০১৭ সালের আঙ্কটাড প্রতিবেদনদৃষ্টে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ৫২০৪.৭ মিলিয়ন যার সিংহভাগ গেছে ভারতে (৭৮ ভাগ) আর বাংলাদেশে এসেছে মোট প্রবাহের ৪ ভাগ। ভারত ২০১৪ সালে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের অংশ হিসেবে মোট ২৫টি বিশেষ খাতে শতভাগ বৈদেশিক বিনিয়োগের নীতিমালা গ্রহণ করে খুব সহজেই ২৩০ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। কেবল ২০১৬-১৭ সালেই ভারত ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৬ সালের প্রতিবেদনদৃষ্টে লক্ষণীয় যে, ২০১৪-১৫ সালের তুলনায় ২০১৫-১৬ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে শতকরা ৯.২৫ ভাগ। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ক্রমশ উর্ধমান। এই উর্ধগতি বাংলাদেশের বর্তমান শাসক নেতৃত্বের ইতিবাচক পরিকল্পনার জন্যে সম্ভব হচ্ছে এ আলোচনা চলমান। কিন্তু চিন্তা করতে হবে সামাজিক উন্নয়নের উন্নয়ন গতি ধরে রাখতে এই বিনিয়োগ বিকাশ কেমন করে বাংলাদেশকে ‘ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত’ রাখতে সাহায্য করবে।

ভারতের সঙ্গে তুলনা চিত্রের প্রধান কারণ বিশাল বিনিয়োগের ক্ষেত্র নিয়েও ভারত তার সামাজিক খাতের কোন কোন সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে পেছনে পড়ে গেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা কী কী কারণে সমৃদ্ধ, তার দর্শন বিবেচনা সামনে নিয়ে আসা। শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শনে এর মূল্যস্থান কি তা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম হলেও (অন্তত জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক অনুপাতে ভারত বড় দেশ এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে) বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে বড় বাধা কি সেটাও চিন্তা করা দরকার। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি ও জমির পরিমাণ ক্রমশ হ্রাসমান সেখানে ভারতের মতো বিশাল কল-কারখানা স্থাপনের সুযোগ আমাদের কম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছেন তা এসব বিবেচনা থেকেই। পুরো দেশটা মাথায় রেখে যে উন্নয়ন চিন্তা তাতে ক্ষুদ্র ও সীমিত পরিসরের শিল্প বিনিয়োগ কার্যকরী সমাধান হয়ে উঠতে পারেÑ তা অনেকের কাছে স্পষ্ট নয়। শেখ হাসিনা ‘অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশের’ যে স্বপ্ন স্থাপন করেছেন তা সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ জনশক্তি ও মেধাবুদ্ধির ওপর নির্ভর করে।

তাই আমাদের চিন্তা করা দরকার আমরা যদি বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে ভাবি ও সে অনুযায়ী আমাদের উন্নয়ন কাজ সাজাতে চাই তা কেমন করে মেধাবুদ্ধি ও জ্ঞানভিত্তিক হবে। বর্তমান বিশ্বে দেশগুলো পরিচালিত হচ্ছে জ্ঞান সমাজ বিকাশের লক্ষ্য নিয়ে।

বাংলাদেশের উল্লেখিত প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৬ সালে আমাদের প্রধান বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পে, দ্বিতীয় প্রধান খাত টেলিকমিউনিকেশন ও তৃতীয় প্রধান বিনিয়োগের খাত হয়েছে ব্যাংকিং সেক্টরে। এ তথ্যে আমাদের প্রধান উপজীব্য কি? আজ থেকে গত তিন দশকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যে বিকাশ তার প্রধান শক্তি নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্মক্ষম বালিকা যারা অভাবের তাড়নায় গ্রাম থেকে শহরে এসে এই শিল্পে নিজেদের অপরিসীম দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। অর্থাৎ দরিদ্র শ্রমশক্তিই এই উন্নয়ন শিল্পের প্রধান নিয়ামক যা বিশ্বব্যাপী আজ সমাদৃত। বুদ্ধির ক্ষমতা শুধু উচ্চবিত্তের নয়, দরিদ্রেরও। এর প্রমাণ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত প্রায় ৪০ লাখ নিম্নবিত্ত শ্রমশক্তির যাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী নেই বা প্রয়োজন হয়নি। অপরদিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় যে ক্ষেত্র (টেলিকমিউনিকেশন ও ব্যাংকিং) সেখানে প্রধান ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা যারা উৎপাদনশক্তির সহায়ক হিসেবে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।

এই তিন প্রধান ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশের যে উন্নয়ন তা নির্ভর করে আছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত তরুণ শক্তির ওপর। এর ফলাফল ভোগ করে উচ্চবিত্ত যাদের বুদ্ধিশক্তি দুর্ভাগ্যবশত ভোগ ও অনুৎপাদন খাতে ব্যয় হয়। পরিসংখ্যানে এদের সংখ্যা কম হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষতিকর ‘নিষ্কাশন’ হবার কারণে দেশের মূল উন্নয়ন স্রোতে এদের গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে কম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন দর্শন তাই সমাজের নিচের তলার মানুষের প্রতি নিবেদিত। বিদেশ থেকে আমরা যদি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি এনে দেশের উন্নয়নের জন্যে খরচ করি তাঁর সে দর্শন আনুযায়ী আমাদের তা করতে হবে বুদ্ধি ও মেধা দিয়েই। আমাদের শ্রমশক্তির অব্যবহৃত ২৭ ভাগ তাদের বুদ্ধি খরচ করতে প্রস্তুত, শুধু সবাই মিলে একটি ‘উন্নয়ন সহায়ক পরিকল্পনা’ সাজিয়ে নেয়া দরকার। শেখ হাসিনার মানবিক বাংলাদেশ গঠনে তাই আমাদের চিন্তা করতে হবে মেধা ও উদ্ভাবন কাজে লাগানোর বিনিয়োগ কেমন করে নিয়ে আসা যায়।

লেখক : পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প

rezasalimag@gmail.com