১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ মুক্তিযোদ্ধাদের আবদার

  • মোঃ দলিল উদ্দীন দুলাল

বাঙালী জাতির হাজার বছরের সেরা ঘটনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ভূমিকা রয়েছে। বাঙালী জাতি গর্বিত বিশ্ব সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কৃতজ্ঞতা হিসেবে এবারই মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধাদের বীর পদবী দেয়া হলো। ৩ এপ্রিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বন্ধ করা হলো। ৪ এপ্রিল ৭১টিভি চ্যানেলে সংবাদ পর্যালোচনায় দেখলাম, শুনলাম, মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে বীর বিক্রম, বীর প্রতীক, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক আছে তারা কোটার কথা বলেন না। কারণ হয়তো তাদের অনেকের ছেলে সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করে। তাদের জন্য কোটা দরকার আছে কি-না বা নেই। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তার জবাব দিতে পারেননি। তবে তারা কি কখনও চেয়েছেন কি-না তা কখনও কোন সময় দেখা যায়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের কোটার কথা বলে থাকেন। আমার প্রশ্ন, কয়জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সরকারী চাকরি পেয়েছেন? এর কেউ খতিয়ে দেখেন না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে যে, একজন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের সময় কয়জন মুক্তিযোদ্ধা চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। এরপর প্রেসিডেন্ট হলেন এরশাদ। এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করলেন। কিছুদিন পরে বললেন, মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সে মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পৃষ্ঠপোষক হলেন। এ সময় অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেন। তারপর এল বিএনপি খালেদা জিয়া। তারা আসার পর মুক্তিযোদ্ধারা অসহায় হয়ে পড়লেন। কারণ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রগ কাটা শুরু হলো। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। সে সময় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন করার প্রয়াস নিলেন। সে সময়কার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুল আহাদ চৌধুরী। তার সঙ্গে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা ’৭১-এর মতো ত্যাগ স্বীকার করে শেখ হাসিনার পক্ষ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় আনার ভূমিকা রেখেছিল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করলেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকরির ব্যবস্থা করেন। তারপর ২০০১ সালে আবার জামায়াত রাজাকার নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলো। রাজাকারদের দৌরাত্ম্য বাড়ল। অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেল। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা বানাল। এমনকি রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা হলো। অভিযোগ দিয়েও কোন ফল হয়নি, কারণ সরকারী ফরমান। ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় এলেন। তখন মুুুুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়স ওভার। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা চাকরি কোঠার বিধান করলেন। দেখা গেল মুক্তিযোদ্ধার যে দশা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরও একই দশা। মুক্তিযোদ্ধাদের আশা রয়ে গেল। প্রকৃত মুুক্তিযোদ্ধারা অসহায়, গরিব মুক্তিযোদ্ধাদের কোন সংস্থায় চাকরি আবেদন করে পরীক্ষায় পাস করার পরও তাদের চাকরি হয়নি। কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পাওয়া যায়নি এমনকি তাদের প্রাপ্ত নম্বর কম, কারণহীন অযুহাত দেখান। সব কথার শেষ কথা হলো, ঘুষ ছাড়া চাকরি হয় না। দিবালকের মতো সত্য। কেউ দেখেও দেখে না, দেখারও লোক নেই। যাদের টাকা আছে, এরশাদ, খালেদার বানানো মুক্তিযোদ্ধারা চাকরি পেয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার বিজয় বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সর্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বাঙালী জাতির ইতিহাস খুবই পুরনো ইতিহাস।

দুই-আড়াই হাজার বছর আগে এ ভূ-খ-ের অধিবাসীদের পরিচয় ছিল গঙ্গারীড জাতি হিসেবে। আলেকজান্ডারের সফরসঙ্গীরা এ জাতির বীরত্বের প্রশংসা করেছিল। রোমান কবি ভার্জিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা পাড়ের মানুষদের প্রশংসা করে কবিতা লিখেছেন। ইতিহাস না বলাই ভাল। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখা মুক্তিযোদ্ধার ইতিহাস বলা দরকার বলে মনে করি। বঙ্গবন্ধু যদি ডাক না দিত মুক্তিযুদ্ধ হতো, মুক্তিযোদ্ধারাও মুক্তিযোদ্ধা হতো না, ৩০ লাখ মানুষ মারাও যেত না। আজকের অট্টালিকা, গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি হতো না।

মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়েদের চাকরির কোটা পুর্নবহালের আন্দোলন হচ্ছে। আমি এটা সমর্থন করি। সবার কথাই এক কথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা অসীম সাহস, আত্মত্যাগে স্বাধীন বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে খুবই সোচ্চার। তার কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের আবদার বেশি। তাকে ছাড়া আর কোথাও মুক্তিযোদ্ধাদের যাবার জায়গা নেই। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাই পারেন মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের আবদার রক্ষা করতে।

লেখক : সাবেক কমান্ডার, সোনালী ব্যাংক, ৭নং সেক্টরের সম্মুখযোদ্ধা