১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অশুভ শক্তির নাশে সম্প্রীতির বাঁধনে

  • জাফর ওয়াজেদ

প্রকৃতিতে চলছে রূপান্তরের খেলা। আশ্বিনের শেষে এই মেঘ এই রোদের খেলায় দুলে উঠছে কাশবন। এ যেন শরতের প্রতীক। এই শরতেই বেজে উঠছে উৎসবের বাদ্য। শারদীয় উৎসব। ঢাকের বাদ্যিতে ছড়িয়ে পড়ছে উৎসবের আমেজ। মানুষে মানুষ, জীবনে জীবন যোগ করার আবাহন নিয়ে উৎসব এসে কড়া নাড়ছে। বেজে উঠছে সুরের সম্মিলিত ঐকতান। উৎসব মানে মহামিলনের দিগন্তকে প্রসারিত করে তোলা। পরস্পরের সঙ্গে প্রাণে প্রাণ মেলানোর এক মোক্ষম আয়োজন ঘটে উৎসবে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য এই প্রাণের উৎসবকে গুরুত্ব দিয়েছেন তার সময়কালে। বলেছেনও ‘সবচেয়ে দুর্গম- যে মানুষ আপন-অন্তরালে,/তার পূর্ণ পরিমাপ নাই বাহিরের দেশে কালে।/সে অন্তরময়/অন্তর মিশালে তবে তার অন্তর পরিচয়।/’ উৎসবের যেমন রয়েছে বহিরঙ্গ, তেমনি তার অন্তরঙ্গেও রয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, যন্ত্রণার সারাৎসারও। সম্ভবত এরা মানুষের ভেতরই সৃষ্ট এবং তাতেই পায় লয়। উৎসবের সঙ্গে চিত্তবিত্তের একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়ে যায়। সমাজের উচ্চ ও নীচ শ্রেণীর মধ্যে উৎসবের আনন্দ একরূপে প্রতিভাত হয় না। নিরন্ন অনাহারী অসহায় মানুষের জীবনে উৎসব হচ্ছে সেই দিন, যেদিন সে দু’বেলা দু’মুঠো খাদ্য পরিপূর্ণতার সঙ্গে ধারণ করতে পারে। সামাজিক বৈষম্যের করুণ রূপটি উৎসবের দিনে সাদা চোখে তাকালে স্পষ্ট হয়। একদল উৎসবকে সামনে রেখে দেদার ব্যয় করেন। আরেক দল অর্থাভাবে উৎসবে শামিল হওয়ার আয়োজনটুকুও সম্পন্ন করতে পারে না। প্রাণে প্রাণ যোগ হওয়ার ক্ষেত্রগুলো হতে থাকে কেবলই সঙ্কুচিত। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত স্তরে উৎসবের রং একরকম নয়। অর্থ, বৈভব, প্রতিপত্তির দাপটে উৎসব নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তাদেরই হাতে। অন্যরা দর্শক হয়ে উপভোগের আত্মরক্ষায় শামিল হলেও ভেতরের দারিদ্র্য তাকে পীড়িত করে তোলে। শ্রেণীতে শ্রেণীতে বৈষম্য কতদূর বিস্তৃত উৎসবে তা দৃষ্টিগোচর হয় এদেশে-ওদেশে।

এই বাংলাদেশেরই সমাজের শিখরে রয়েছেন এমন শ্রেণীর একটা বড় অংশই কোন না কোন প্রকার দুর্নীতিকে ভিত্তি করে ঐশ্বর্য, বৈভব এবং ক্ষমতার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। এটা অবশ্য বাংলাদেশের পৃথক বৈশিষ্ট্য নয়। বিশ্বের সব দেশের উচ্চ শ্রেণীর বৈভব ও ক্ষমতার মূলে রয়েছে দুর্নীতি। পৃথিবীর কোথাও কোনকালে অর্থ উপার্জনের সঙ্গে নীতিশাস্ত্র বা ইথিকসের কোন সম্পর্ক ছিল না। আমাদের সমাজেও নেই। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ যুগে অগ্রজদেরসহ আমাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা এই সাক্ষ্য দেয় যে, পশ্চাতে রাজনৈতিক খুঁটির জোর, এমনকি আমলাতান্ত্রিক খুঁটির জোর থাকলেও কিংবা সামরিক জান্তা শাসকের বশংবদ হলে এবং অবৈধ অর্থ উপার্জন করতে পারলে সমাজপতি, নরপতি, পীর-দরবেশ, এমনকি জনপ্রতিনিধিও হওয়া যায়। এমনও হয়, যে কোন উপায়ে সংগৃহীত ওই অর্থ আরও অধিক অর্থ অর্জনের প্রেরণা জোগায়। একবার ক্ষমতার পদ দখল করা গেলে সেই পদ আরও অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পদ সংগ্রহের প্রেরণা জোগায়। সে অভিলাষ ক্রমে সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। বিশ্বের অন্যত্র উচ্চশ্রেণী গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উঁচুমানের সংস্কৃতি ও বৈদগ্ধও গড়ে উঠেছে। সমাজ জীবনে ঘটেছে বিপ্লব। ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে উচ্চ শোষক শ্রেণী গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একটি অভিজাত সংস্কৃতিও জন্ম নেয়। যাকে বলা হতো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তার ঢেউ সেকালে ছড়িয়েছিল দেশে দেশে। কিন্তু এ দেশে ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত। দুর্নীতিকে ভিত্তি করে গঠিত উঁচু শ্রেণীটিতে রয়েছেন ব্যাপারী, ব্যবসায়ী, কতিপয় আমলা বা ভূতপূর্ব আমলা, কতিপয় রাজনীতিক, ফটকাবাজ এবং কালো টাকার মালিক। এদের একাংশের জীবনযাপন প্রণালী প্রায় ইউরোপীয়-মার্কিনী ধারার হলেও মন এবং মানসের দিক থেকে এরা দৃষ্টিকটু ‘শঙ্কর’ বৈকি! ঘরে বিদেশী উপকরণ ব্যবহার, সাজসজ্জায় বিদেশী ভাবধারা এবং লেটেস্ট মডেলের গাড়ি চালানো ও বিমানে চলাফেরা করলেই ইউরোপীয় হওয়া যায় না। সেজন্য আবশ্যক বিদ্যাবত্তা, বৈদগ্ধ, মুক্তবুদ্ধি, সাংস্কৃতিক চেতনা। বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের মধ্যে এসব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এদের ড্রইংরুমে ‘কুৎসিত’ সাজসজ্জা, শোকেস, টিভিসেট ইত্যাদি দেখা যায়; কিন্তু পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও বই-পুস্তকের সন্ধান পাওয়া যায় না। এরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মূল্যবোধ, ইতিহাস ধারণ করে এমনটা নয়। কোন ধরনের সাংস্কৃতিক বা সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হওয়া দূরে থাক, সামান্য আলোড়নও জাগে না তাদের মধ্যে। সন্তান-সন্ততিদের জ্ঞাতসারে এবং দৃষ্টির সামনেই এরা অসদুপায়ে অর্থকড়ি উপার্জন করেন। ওই অর্থে সন্তানদের দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠান। পাশ্চাত্য বোলচাল শেখান। সন্ধ্যায় অনেকে টিভির সামনে রিমোট হাতে বসেন। অনেকে কখনও সপরিবারে তৃতীয় শ্রেণীর বিদেশী ছবি বা সিরিয়াল দেখেন, যার মধ্যে মারামারি, খুনোখুনি, ঘুসোঘুসিই অধিক। কখনও পর্নোগ্রাফিতে নিমগ্ন থাকেন। বিত্তবানের সন্তানরা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বহির্রূপটাই দেখে, ভেতরের দিক নয়। ওরা ওই সংস্কৃতিতেই হচ্ছে দীক্ষিত। সুনীতি-কুনীতির পার্থক্য তাদের অভিভাবকরাও বিবেচনা করেন না। সন্তানরা তো নয়ই। দেশে বিরাট মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রভাব কম নয়। এরা মনমানসিকতা ও অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত হলেও উচ্চভিলাষের ব্যাপারে তারা সকলে একই সমান্তরালে, একই স্তরে। মুখে ধর্ম ও নীতির বুলি কিন্তু সুনীতি-কুনীতি নির্বিশেষে যে কোন উপায়ে টাকাকড়ি রোজগার করে উচ্চ শ্রেণীতে প্রমোশন লাভ করার ব্যাপারে তারা ঐক্যবদ্ধ। মন ও মানসের দিক থেকে, বিরল ব্যতিক্রম বাদে, ওরা প্রায় সবাই মধ্যযুগীয় চেতনাধারী যেন। বসবাসও সেই পর্যায়ের।

নিজেরা নিজেদের বাস্তব জীবনে কোনরূপ অসততাকেই অসৎ ও অন্যায় জ্ঞানে পরিহার না করলেও হিতোপদেশ প্রদানে সতত নিযুক্ত। কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় তাদের হিতোপদেশের প্রতি কেউই কর্ণপাত করে না। তারা বরং অভিভাবকদের যাপিত জীবন রীতিই অনুসরণে সচেষ্ট থাকে। মধ্যবিত্ত সমাজের কোন কোন স্তরে অল্পবিস্তর চর্চা হয়ে থাকে সংস্কৃতির। কেউ কেউ কখনও মনের তাগিদে, কখনওবা পেশাগত কারণে বাধ্য হয়ে কিছু লেখাপড়ার চর্চাও করে থাকেন। কিন্তু শ্রেণী হিসেবে বিচার করলে এ শ্রেণীর মধ্যে যে কোন উপায়ে অর্থবিত্ত লাভ ছাড়া অন্য কোনরূপ প্রবর্তনা আদৌ নেই বললেও অত্যুক্তি হয় না। কখনও বকধার্মিকের বেশে, কখনওবা প্রগতিশীল বেশে সমাজে বিচরণ করলেও দেশে নবজীবনের সঞ্চার, উন্নতির নয়া দিগন্ত উন্মোচনের, নেতৃত্ব দেয়ার কোন আগ্রহ এবং উদ্যোগ তাদের নেই। তাদের একটি অংশ বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতারও আগে হতে দেশে মূর্খতা সম্প্রসারণের আদর্শে উদ্বুদ্ধ এবং সেজন্য কাজ করে যাচ্ছে। এদেরই একটা অংশ বিত্তবান হয়ে উঠলেও তাদের বংশধরদের মধ্যে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ এবং মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে। তারা যে মূর্খতা বিস্তারের কাজে নিয়োজিত সে বিষয়েও তারা হয়ত সচেতন নন। কেননা, তাদের বিদ্যাবুদ্ধির মাত্রা এত নিচে যে, তারা মূর্খতা সম্প্রসারণের কাজটিকেই বৈপ্লবিক কাজ মনে করে থাকেন। এর গলদ রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়।

এটা অনস্বীকার্য যে, সমন্বিত ও সুসংহত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন না করায় নানামুখী শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজে অসঙ্গতি বাড়ায়। শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যমান প্রায় নৈরাজ্য এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রায় শূন্যতা জঙ্গীবাদে পরিণত হওয়ার সহায়ক হয়ে উঠেছে। যে কারণে সপরিবারে জঙ্গী হয়ে ওঠা শুধু নয়, আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতাও তীব্র হয়ে উঠেছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আলোকিত মানুষ তৈরির কাজ যদি করতে না পারে তবে অনালোকিত অন্ধকার হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী। মাঠে-ময়দানে অনুষ্ঠিত সমাবেশের মঞ্চে এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দেয়ালঘেরা সভাকক্ষের উন্নীত স্থানে দাঁড়িয়ে সরল বিশ্বাসী শ্রোতাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার মহিমা শোনানো হয়। বলা হয়, ‘ভাইসব, দেশ ও জাতির স্বার্থে আরও ত্যাগ করুন। ইহকাল দু’দিনের, পরকাল অশেষ। অতএব হে দরিদ্র ক্ষুধার্ত নগ্ন মানবকুল, তোমরা ইহকালের বঞ্চনার জন্য দুঃখ কর না, পরকালে তোমরা আবহমানকাল সুখ ভোগ করবে।’ যারা বলেন তারা নিজেরা কিন্তু ত্যাগ স্বীকারে আগ্রহী নন। বরং অনুপার্জিত বা অসৎ পথে সংগৃহীত অর্থবিত্তের সহায়তায় ইহকালে পরম আরাম-আয়েশও ‘রিজার্ভ’ করে রাখছেন। বিশাল মানবগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ রেখে কতিপয়ের আত্মস্বার্থ অর্জনে নানাবিধ পন্থা অবলম্বন সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করে আসছে। এই বৈষম্যই দুর্গতি আর অগতির বিস্তার ঘটাতে সহায়ক। অতীতে যা ছিল অনড় সত্য, পরবর্তী যুগে তাই হয়ে যাচ্ছে প্রকা- অসহ্য। যুগে যুগে সামাজিক জীবনে তার বাস্তব প্রমাণ মেলে। পিতামহ-প্রপিতামহ, এমনকি পিতার সামাজিক জীবনের সঙ্গে আমাদের সামাজিক জীবনের সাদৃশ্য ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। পিতামহের জগত আমাদের কাছে হয়ে যাচ্ছে এক অন্য অবাস্তব জগত। তাই স্পষ্ট দেখা যায় সুনীতি-দুর্নীতিবোধ পরিবর্তনশীল সমাজের পরিবর্তনশীল শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া অন্য কিছু নয়। তথাপি চোখ দুটো যেন এসব দেখেও দেখে না। এসব দৃষ্টিগ্রাহ্য নয় হয়ত।

কী দেখি সমাজজুড়ে? সমাজের ওপর কাঠামো বাস্তবে অর্থাৎ যে শ্রেণীটি কৃষিনির্ভর নয় সে স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকের তহবিল তসরুপ, জালিয়াতি, জুয়াচুরি, চোরাবাজারি, কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে মালামাল আমদানি-রফতানি, পণ্য আমদানিতে কমিশন নেয়া, অসামাজিক ব্যবসা, সরকারী অর্থ ও আনুকূল্যে বেসরকারী ব্যক্তির ‘ফ্রি’ ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানার মালিকানা লাভ প্রভৃতি যে কোন পন্থায় অর্থোপার্জন বৃদ্ধির কাজ নিরন্তর চলছে। এটাই এ যুগের বাংলাদেশের উচ্চস্তরের সামাজিক তথা বাস্তব জীবনের রীতিনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরাই আবার পোশাক-পরিচ্ছদে, বক্তৃতা-বিবৃতিতে এবং সুনীতির সন্দর্ভ রচনায় শুধু সমাজের শীর্ষস্থানে নয়, প্রয়োজনমতো ধর্মবরদারও। এদের মস্তিষ্ক কোষের গোলকধাঁধার পথে ওইসব সরীসৃপই বেরিয়ে আসে। সেগুলো বৃহত্তর সমাজের ওপর তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে। বাংলাদেশের উপর স্তরে দেনা-পাওনার বিষয়টা এখন আর নৈতিকতা বা নীতিশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। তা এখন কলাকৌশলের ব্যাপার। অপরের ‘সামান্য ধনসম্পদ’ কৌশলে কুক্ষিগতকরণ এ সমাজের একমাত্র নীতি বা এথিকস। এরা আরাম-আয়েশ এবং বিলাসিতার জীবন নিশ্চিত করার জন্য হেন কাজ নেই যা করতে পরান্মুখ। তাই তারা দারিদ্র্য পছন্দ করে না। বরং নিম্নবর্গের জনগণকে দেশ ও জাতির স্বার্থে বৃহত্তর ত্যাগ করার বয়ান দেন। এরা ঘরেরও খান এবং ঘাটেরও কুড়ান। তাই দেখা যায় দরিদ্র জনগণের প্রতি তাদের তাচ্ছিল্য ভাব। এরা উৎসবকে ব্যবহার করেন তাদের নিজেদের মতো করে। সমাজ জীবনে এরা অন্য কারও অবস্থান মেনে নিতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ শতবর্ষেরও আগে ১৯০৯ সালে লিখেছিলেন, ‘সকল দেশের সকল সমাজেই ত্রুটি ও অপূর্ণতা আছে। কিন্তু দেশের লোক স্বজাতির প্রতি ভালোবাসার টানে যতক্ষণ এক থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার বিষ কাটিয়ে চলতে পারে। পচবার কারণ হাওয়ার মধ্যেই আছে। কিন্তু বেঁচে থাকলেই সেটা কাটিয়ে চলি, মরে গেলেই পচে উঠি।’ এ অবস্থা একুশ শতকে এসেও বিদ্যমান।

সমাজে নানা দুর্গতি-অগতির বিস্তার ঘটছে নানাভাবে। ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, সম্প্রদায়ের নামে, উৎসবের নামে, ক্ষমতার নামে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। উগ্র ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ক্রমশ জঙ্গীবাদে রূপান্তরিত হয়ে গুপ্ত হত্যা চালাচ্ছে। বিশ্বজুড়েই জঙ্গীবাদ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়েছে তা থেকে বাংলাদেশও বিচ্ছিন্ন নয়। শিক্ষিত যুবকরা জঙ্গীবাদের মোহে আত্মহননে যেভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছে তা সাময়িক দমন করা সম্ভব হলেও এদের ডালপালা বাড়ছে। ধর্মীয় উৎসবেও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছে। পূজা উদযাপনও নির্বিঘেœ পালন সহজতর নয়। বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙ্গা হয়। হুমকি-ধমকি প্রদর্শনও চলে। মানুষে মানুষে যে সম্প্রীতি তাতে বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে অনেককাল ধরে। ২০০১ সালে যারা ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তারা যে পরিমাণ অধর্মের কাজ করেছে তা বিস্মৃত হবার নয়। পেট্রোল বোমা মেরে জীবন্ত মানুষ হত্যার নারকীয় দৃশ্যগুলো এখনও মানস চোখে ভাসে। গ্রেনেড হামলা চালিয়ে জনগণের নেতা-নেত্রীদের হত্যার ঘটনা ভয়ঙ্কর। সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরি করে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি সেই পাকিস্তান পর্ব থেকে চলে আসছে। এর বিরুদ্ধে সব সময় প্রগতিশীল শক্তি সজাগ হলেও ধর্মান্ধরা ঐক্যবদ্ধভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। হত দরিদ্রদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। মানুষের আয়, আয়ু ও ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে ধর্মান্ধতা। যে কারণে সমাজ প্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে না। বরং মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণায় আক্রান্ত হচ্ছে আধুনিক মানুষ। দুর্গতির এ ধারা প্রবহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিকৃত ভাষ্য আটচল্লিশ বছর পরও যখন ধ্বনিত হয়, তখন স্পষ্ট হয় পরাজিত শত্রুরা অশান্তি ও নাশকতাকে লালন করছে। দেশজুড়ে অগতি ও দুর্গতির বিস্তার ঘটাচ্ছে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দুর্গতি চিরস্থায়ী হতে পারে এ কথা আমি কোনক্রমেই বিশ্বাস করতে পারিনি।’ আমরাও তা করি না। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা অসুর নিধন করেছিলেন। কিন্তু মানুষের মধ্যে বসবাসরত অসুর তবু নিধন হয় না। সম্প্রীতির বাঁধনে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, মুসলমান যুগ যুগ ধরে এ দেশে বসবাস করে আসছে। ধর্ম কখনও তাদের মধ্যে বিভেদ ছড়ায়নি। কিন্তু পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি সে অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ায়নি। তাই ধর্ম পালনে আসে বাধা। ঈদের জামাতে বোমাবাজি করার প্রচেষ্টা দেখা যায়। আবার পূজা ম-পেও চলে হামলা। এসবই করা হয় সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে। তবু সম্প্রীতির বাঁধন হয় না আলগা।

শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। আজ ষষ্ঠী। শুরু হলো আমন্ত্রণ অধিবাস। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী হয়ে বিজয়া দশমীতে হবে বিসর্জন। বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবটি কাটুক নির্বিঘ্ন এবং আনন্দ উচ্ছ্বাসে- সেই কামনা দেশবাসীর। অশুভ শক্তি দমন করে বাসযোগ্য সম্প্রীতিতে পূর্ণ একটি সুন্দর সমাজ গড়ে উঠুক এই বাংলাদেশে, সেই প্রার্থনা ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র। দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে যেন ধর্মান্ধ ও একাত্তরের পরাজিত শক্তি উৎসব বিঘ্নিত করতে না পারে। মানবিকতার সকল দুয়ার খোলা থাক, সম্প্রীতির আলোকমালা ছড়িয়ে পড়ুক, মানুষে মানুষে বন্ধন হোক দৃঢ়। আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ করুক স্বপ্ন সুন্দর। কল্যাণের গান ধ্বনিত হোক উৎসবের আবরণে। অশুভ শক্তির হোক বিনাশ। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি থাক অমলিন।