১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সবাই বাস করবে ॥ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে অধিকার নিয়ে এদেশে

সবাই বাস করবে ॥ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে অধিকার নিয়ে এদেশে
  • পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী ॥ ধর্ম যার যার উৎসব সবার

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ সকলেই যার যার অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। ধর্ম যার যার, উৎসব সকলের। আমরা সব সময় সেটাই মানি। বাংলাদেশ গোটা বিশে^ একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই সকলে মিলে আমরা এই দেশকেও একসঙ্গে গড়ে তুলতে চাই। কারা সংখ্যায় বেশি, কারা সংখ্যায় কম; সেটা বড় কথা নয়, যে যার ধর্ম পালন করবে উৎসবের সঙ্গে, স্বাধীনভাবে। সে অধিকার নিশ্চিত করেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি স্থাপনে বাংলাদেশ বিশ্বে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর টিকাটুলী রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ এবং লালবাগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে পূজা ম-প পরিদর্শন শেষে পৃথক শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রথমে রামকৃষ্ণ মিশন ও পরে ঢাকেশ্বরীতে যান প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকেশ্বরীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আপনেরা নিরাপদে যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবেন। কারা বেশি সংখ্যা, কারা কম সংখ্যা; সেটা বড় কথা নয়। যে যার ধর্ম উৎসবের সঙ্গে, স্বাধীনভাবে পালন করবে। সেটা নিশ্চিত করা নিয়েই বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। প্রতিটি উৎসবে সকলে এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা উৎসব পালন করি। মহান মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। আমাদের লক্ষ্য সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করে সকলে মিলে একসঙ্গে প্রিয় মাতৃভূমিকে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত হিসেবে গড়ে তুলব। সেই লক্ষ্য নিয়েই সরকার পরিচালনা করে যাচ্ছি। আমরা চাই কোন মানুষ গৃহহারা থাকবে না, ভূমিহীন থাকবে না, ক্ষুধার্ত থাকবে না। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা নববর্ষকে নতুন চেতনায় নিয়ে এসেছি। এই দিনটাকে সকলে মিলে একসঙ্গে পালন করি। আমরা চেষ্টা করেছি, সকল ধর্মের মানুষের সমস্যা সমাধান করার। তিনি বলেন, মুসলমান ধর্মের একটা নিয়ম আছে, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দিতে গেলে হেবা করে দিতে পারে। এখানে কোন ট্যাক্স দিতে হয় না, মাত্র এক শ’ টাকা খরচে লিখে দিতে পারে। এটা হিন্দু ধর্মসহ অন্যান্য ধর্মে ছিল না। আমরা সেটা আইন করে দিয়েছি; হিন্দু সম্প্রদায় তাদের উত্তরাধিকারকে সম্পত্তি দিতে পারবে ঠিক হেবা আইনে যেমন আছে, এক শ’ টাকা খরচে লিখে দিতে পারবে। আমরা মসজিদভিত্তিক যেমন গণশিক্ষা চালু করেছি, ঠিক মন্দিরভিত্তিকও ধর্মীয় শিক্ষা চালু করেছি। সেবায়েত- পুরোহিতদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। প্রত্যেক ধর্মের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট করে দিয়েছি।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীন দেশ হিসেবে মর্যাদা অর্জন করেছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ গড়ে তোলা শুরু করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে হত্যা করা হলো। আমি হারালাম আমার মা, বাবা, ভাইসহ পরিবারের ১৮ সদস্য। ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে বিদেশে ছিলাম বলেই বেঁচে গিয়েছিলাম। স্বজন হারানো বেদনা নিয়ে বিদেশে রিফিউজি হিসেবে বাস করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগ আমাকে সভানেত্রী করে, তখন শত বাধা নিয়েই দেশে এসে শত বাধার মুখে পড়লাম। তখন দেশে সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ছিল। যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন করেছিল। মানুষের ভাগ্যের কোন উন্নয়ন হয়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, বিভিন্ন সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত হানতে দেখেছি, ধর্মীয় নেতা, আমাদের দলের নেতাকর্মী কেউ রেহাই পেত না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সকলে মিলে স্বাধীন করেছি। সকলে মিলেই গড়ে তুলব। কিন্তু সে চেতনা ধ্বংস করে দেয়া হয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের মানুষের ওপর সংখ্যাত, হানাহানি, জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা সবাই রুখে দাঁড়িয়েছি। জঙ্গীবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বলেই আমরা সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ নির্মূল করতে পেরেছি। সব ধর্মের মানুষ নিরাপদে ধর্ম পালন করছে। পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে বলেই মানুষ নিরাপদে পূজা পালন করতে পারছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের জায়গা নিয়ে একটা সমস্যা ছিল, আমরা তারও সমাধান করেছি।

এর আগে বিকেল সাড়ে তিনটায় রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে পূজা পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ-প্রবাসের হিন্দু সম্প্রদায়কে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আজকের দিনে এখানে আসতে পেরে সত্যিই আমি খুশি। আগামীকাল (মঙ্গলবার) দেশের বাইরে যাচ্ছি। কাজেই চিন্তা করলাম, যাওয়ার আগে অন্তত আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে যাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। এই দেশে যে যার অধিকার নিয়েই বসবাস করবে। ধর্ম যার যার উৎসব সকলের। আমরা সেটাই মানি। বাংলাদেশ বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সবাই ভাইবোনের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসব পালন করে যাই। আমরা দেশকেও গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশ উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠুক সেটা আমি চাই। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হবে এটাই ছিল জাতির পিতার স্বপ্ন। আমরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি। বাবা-মা হারিয়েছি। দুটো বোন বেঁচে আছিÑ আমরা চাই একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলব। দেশের মানুষের প্রত্যেকের উন্নত জীবন দেব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা পালনের জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, পুলিশের আইজি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। অনুষ্ঠানে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠের স্বামীজী ধ্রুবাবেশানন্দ প্রধানমন্ত্রীর হাতে শারদীয় শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, আওয়ামী লীগের ত্রাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, আওয়ামী লীগ নেতাসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বক্তব্য রাখেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন সিকদার, মেয়র সাঈদ খোকন, মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট কিশোর রঞ্জন ম-ল।

যুবলীগ দক্ষিণের ব্যাপক শোডাউন ॥ এদিকে ঢাকেশ্বরী ও রামকৃষ্ণ মিশনে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ব্যাপক শোডাউন করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ। দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাটের নির্দেশে ১৩টি ওয়ার্ড যুবলীগের নেতাকর্মীরা পলাশী মোড় থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত এবং ১৫টি ওয়ার্ডের কয়েক হাজার নেতাকর্মী ইত্তেফাক মোড় থেকে রামকৃষ্ণ মিশন পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে এবং জননেত্রীর আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম, বার বার দরকার শেখ হাসিনার সরকার স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন। এদিকে যুবলীগ দক্ষিণের পাশাপাশি ছাত্রলীগ ও লালবাগের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিমের সমর্থকরাও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান।