১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিকিৎসা বীমা

বাংলাদেশে দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তাদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প চালু করেছে সরকার দুই বছর আগে। এবার সরকারী চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য চালু করা হচ্ছে চিকিৎসা বীমা। অত্যন্ত সুসংবাদ বৈকি সশ্লিষ্টদের জন্য। বলা যায়, যুগান্তকারী উদ্যোগ। চিকিৎসা বীমার আওতায় কোন সরকারী চাকরিজীবী কিংবা পরিবারের সদস্য অসুস্থ হলে তার পুরো চিকিৎসার ব্যয় বহন করা হবে। অবশ্য এ জন্য প্রত্যেক চাকরিজীবীর বেতন থেকে অল্প পরিমাণ অর্থ কেটে নেয়া হবে। কর্তনযোগ্য এই অর্থের পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। সরকারকে এজন্য সাধুবাদ জানাতেই হয়।

অসুখ-বিসুখ মানবজীবনে একটি স্বাভাবিক বিষয় হলেও আক্রান্তদের জন্য তা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। দেশে নানাবিধ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। যথাযথ চিকিৎসা পেলে অনেক অসুস্থজন সুস্থ হতে পারেন। এমনকি মরণব্যাধিতে আক্রান্তজনও সুস্থ হওয়ার পথ পেয়ে যেতে পারেন চিকিৎসার কল্যাণে। কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে না পারলে বেঁচে থাকা দুঃসাধ্য প্রায়। চাকরিজীবীদের সীমিত আয়ে কিংবা দরিদ্রজনের জীবনে বাস্তবসম্মত চিকিৎসা প্রাপ্তি ক্ষীণপ্রায়। এমনিতে দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের প্রাদুর্ভাব, নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিÑ বিবিধ কারণে চিকিৎসাসেবার খরচ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এসব কারণে হতদরিদ্র থেকে নি¤œ আয়ের কিংবা মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা বহু ক্ষেত্রেই ন্যূনতম অর্থের অভাবে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারে না। এমনকি অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে সর্বস্বান্তও হয়ে পড়ে। এ দেশে মানুষের মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় ২৭ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার পেছনে সবচেয়ে বেশি নিজের তহবিলের টাকা ব্যয় করতে হয়। নানাবিধ জটিলতার কারণে দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতিতে দরিদ্র মানুষ যেমন, তেমনি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। ব্যক্তি পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে প্রতিবছর বাংলাদেশে চার শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় পা রাখছেন। অপরদিকে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আকস্মিক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার ব্যয় বহনের মতো পৃথক কোন হাসপাতাল নেই। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে নিজ খরচে চিকিৎসা নিতে হয়। এর ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে পরিবারগুলো আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসার জন্য মাসিক দেড় হাজার টাকা ভাতা অত্যন্ত অপ্রতুল অবশ্যই। আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে তাদের এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা বীমার আওতায় আনা হচ্ছে। অবশ্য এ জন্য সকলকে নির্ধারিত হারে ‘প্রিমিয়াম’ প্রদান করতে হবে। এর ফলে যখন যার চিকিৎসার প্রয়োজন হবে তখন তিনি প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা পাবেন। এছাড়া যার চিকিৎসার প্রয়োজন পড়বে না তিনি ওই বীমার কোন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না। কিন্তু প্রিমিয়াম যথারীতি প্রদান করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় একজনের অর্থে অন্যরাও চিকিৎসা পাবেন। বিশেষত নি¤œবিত্তের চিকিৎসায় উচ্চবিত্তের আর্থিক ও অংশগ্রহণমূলক সহায়তায় বাধ্যবাধকতা থাকবে। চিকিৎসা বীমা চালু হলে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেকের চিকিৎসার খরচ জোগানো হবে। পাশাপাশি ইতোপূর্বে চালু হওয়া দরিদ্রদের জন্য ‘স্বাস্থ্য বীমা’ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বৈকি। তথাপি এই কমিউনিটি স্বাস্থ্য বীমা গতানুগতিক বাণিজ্য বীমা হতে আলাদা। তা আলাভজনক বীমা ব্যবস্থা, যা সমাজের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর জন্য আর্থিক সুরক্ষা ও দরিদ্রদের গুণগত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। ছয় বছর আগে উপকূলীয় অঞ্চল চকরিয়াতে চালু হওয়া প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে দুই বছর আগে টাঙ্গাইলে পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়। ক্রমান্বয়ে দেশের বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে এই সুবিধা পৌঁছানো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়। এটা বাস্তব যে, একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে একমাত্র সুস্থ, সবল ও কার্যক্ষম জাতি। সুতরাং সরকার গৃহীত দুটি বীমারই অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। উদ্যোগ যেন ফলপ্রসূ হয় দৃষ্টি সেদিকে রাখাই সঙ্গত।