১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ শিক্ষা, বেকার এবং কর্ম

  • রহিম আবদুর রহিম

‘প্রাথমিক সংস্কৃতি উন্নয়ন কেন্দ্র’ নামক একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, তাদের এক প্রচারপত্রে উল্লেখ করেছেন, ‘সংকীর্ণ চিন্তার লোকেরা পরনিন্দা-পরচর্চায় সময় ব্যয় করে, সাধারণ চিন্তার লোকেরা প্রতিদিনকার ঘটনার বিশ্লেষণ করেন। মহৎ চিন্তার লোকেরা সমস্যার সমাধানের উপায় খোঁজেন, শ্রেষ্ঠ চিন্তার লোকেরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।’ প্রশ্ন, আমাদের শিক্ষা কোন্ চিন্তার অন্তর্ভুক্ত এবং কোনটি হওয়া উচিত? শিক্ষা মানুষের সকল দৈন্যদশা, অভাব-অনটন থেকে মুক্ত করারই কথা, অথচ আমাদের দিন দিন দৈন্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সমস্যা সম্ভাবনা বিচার বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণালব্ধ মানবসম্পদ উন্নয়নের শিক্ষা পদ্ধতি বা শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বাংলাদেশে চালু হয়নি, ফলে যা হওয়ার তাই। সম্প্রতি জাকির হোসেন বাচ্চু নামক জাপান প্রবাসী , তাঁর জাপানের শিক্ষা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘জাপানে শিক্ষাব্যবস্থায়, আগে ‘নীতি’ পরে ‘শিক্ষা।’ এই আদর্শ মেনে কমপক্ষে শিশুর দশ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত কোন পরীক্ষা সেখানে নেই। আদর্শটি এমন যে, স্কুল জীবনে প্রথম তিন বছর মেধা যাচাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রতা, নম্রতা, ও শিষ্টাচার দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়নতা শেখানো হয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভদ্র জাতি হিসেবে জাপানীরা যে খ্যাতি অর্জন করেছে, তা তাদের শিক্ষাব্যবস্থারই প্রতিফলন। এই জাপানে কোন স্কুলেই ঝাড়ুদার থাকে না। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা মিলে প্রতিষ্ঠান আঙিনা, স্ব-স্ব বাড়ি পরিষ্কার করেন। বছরে একদিন ক্লিনিং ডে হিসেবে উদযাপন করা হয়। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় বলেছেন, (জবধফরহম ভড়ৎ ঢ়ষবধংঁৎব) ‘আনন্দের জন্য পড়াশোনা’ কি জিনিস সেটা জাপানেই রয়েছে। আমার ছেলেটি স্কুলে যাওয়ার যে ব্যাকুলতা তা দেখেছি জাপানেই।’ তার এই বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের শিশুশিক্ষা সংশ্লিষ্টদের কতটুকু মিল রয়েছে? আমরা কি সেই ধরনের গবেষণালব্ধ শিক্ষা পরিবেশ তৈয়ার করতে পেরেছি? জাপানে একজন অভিভাবক তাঁর সন্তানের স্কুলের শ্রেণী পাঠদান ভিজিট করতে পারে না। শ্রেণীকক্ষের শেষ সারিতে অভিভাবক ভিজিটরদের বসার নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে। আমাদের দেশে ভিজিট তো দূরের কথা অভিভাবক ক্লাস চলাকালে শ্রেণীকক্ষের ধারেকাছে পৌঁছতেই পারে না। এ যেন ১৪৪ ধারা জারি করা একটি নিষিদ্ধ অঞ্চল। মজার বিষয়, প্রতিটি পিরিয়ডে শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা অনুযায়ী ক্লাস থেকে বের হতে পারে, রাস্তায় গিয়ে ট্রাফিক সিগনাল, আইন সম্পর্কে জানতে পারে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে ‘ফরমাল’ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হয়। কোয়ালিটি এডুকেশনকে গ্রহণ করার জন্য একজন শিক্ষার্থী পারিপার্শ্বিক এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটও অনেকাংশে দায়ী। জাপানে মূল্যায়নের তিনটি মানদ- ঊীপবষষবহঃ (চমৎকার), এড়ড়ফ (ভাল), ঘববফ সড়ৎব রসঢ়ৎড়াবসবহঃ (আরও অধিক উন্নতির প্রয়োজন)। বাংলাদেশের এক সময়কার ফার্স্ট ডিভিশন, সেকেন্ড ডিভিশন পরিবর্তন হয়ে মানদ- প্রসব হয়েছে জিপিএ। এর ভেতর কি আছে তা জিপিএ প্রাপ্ত প্রার্থী নিজেই জানে না। অথচ এবিসি বা জিপিএ গোল্ডেন নামক আজব হরিণ পাবার প্রতিযোগিতায় নেমে সুস্থ শিশু-কিশোর তরুণ-তরুণীরা মানসিক, শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডাঃ মোহিত কামাল ‘শিশুদের বিকাশে নজর চাই’ শিরোনামে এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘দুরন্ত ও বেপরোয়া শিশুদের আমরা অনেক সময় শাস্তি দিই। মনে রাখা জরুরী শারীরিক শাস্তি শিশুকে আরও বেশি মারমুখী ও বেপরোয়া করে তুলতে পারে। যিনি শাস্তি দিচ্ছেন তার প্রতিও নেগেটিভ এ্যাটিচ্যুড বীজ রোপিত হয়ে যেতে পারে। আরও মনে রাখা জরুরী যারা শৈশবে নির্যাতনের শিকার হয় ভায়োলেন্সের কারণে দৈনিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ভোগ করে, তারাই আবার নির্যাতনকারী হয়ে উঠতে পারে। এসব কারণে সমস্যা প্রতিরোধে সামাজিক স্তর থেকে শিশুদের হতাশা দূর করতে হবে। অথচ আমাদের শিশুরা বাবা-মা’র ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারই হওয়ার ইচ্ছাটি পূরণ করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পড়ে চরম হতাশায় ভুগছে। এই হতাশা ওই শিশুটিকে ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাপানে ইলিমেন্টারি স্কুলে প্রত্যেক ক্লাসেই একজন শিক্ষকই সকল বিষয়ে পাঠদান করান, তবে মিউজিক ও শরীরচর্চা শিক্ষক আলাদা থাকেন। তাদের এই পদ্ধতি চালু রাখার কারণ একটি, শিক্ষক যাতে শিক্ষার্থীর নাড়ি-নক্ষত্র জানতে পারে। বাংলাদেশে এমন একজন শিক্ষক আছেন যিনি তাঁর শিক্ষার্থীর নাম-ধামসহ পুরোপুরি ব্যক্তিগত তথ্য দিতে পারবেন? পারবেন না, কারণ আমাদের পদ্ধতিতেই গলদ। তবে ব্যতিক্রম যে নেই তা হলফ করে বলছি না। জাপানে একটি ক্লাসে ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থী থাকে। শিক্ষক সঙ্কট নিরসনে ওই দেশের ভলান্টিয়ার শিক্ষক রয়েছেন। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের সম্মানীর বিনিময়ে ব্যবহার করতে পারেন। অথচ আমাদের দেশে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকই নেই। কর্মক্ষম জাতি গঠন এবং হতাশাগ্রস্ত প্রজন্মকে উদ্ধার করতে হলে চাই গবেষণালব্ধ শিক্ষা পদ্ধতি বা ব্যবস্থা। শিক্ষা ও শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক মোঃ মনিরুল ইসলাম তাঁর এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘শিক্ষকদের সাধনা অন্য দশটি চাকরির মতো নয় নিঃসন্দেহে, শিক্ষকতা মানেই হলো সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকার। বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া সামাজিক সংস্কৃতির দেশে শিক্ষাসেবায় দীনতা, অক্ষমতা, অমর্যাদা প্রকট সমস্যায় রয়েছে।’ সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সম্প্রতি তাঁর এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষকরা ছিলেন দরিদ্র, যারা আমাদের ধনী করে গেছেন। এখন শিক্ষকরা ধনী শিক্ষার্থীরা গরিব হচ্ছে।’ অর্থাৎ শিক্ষা সেবকরা সকল নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে শিক্ষা বাণিজ্যের বলয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। যে দেশে শিক্ষা পদ্ধতি বা ব্যবস্থায় ‘অমেরুদ-’ নীতি, সেই দেশে শিক্ষাই জাতির মেরুদ-; এই বাণী শুধু কথার কথাই। বিশ্বের বাণিজ্যিক মোড়ল হিসেবে পরিচিত চীনের শিক্ষাব্যবস্থার কথা সবাই জানেন, যে দেশের মানুষরা একসময় তাঁদের মাতৃভাষা গুছিয়ে বলতে পারতেন না তাঁদের আজ কী অবস্থা। দীর্ঘ ৬৫ বছর চীন মানবসম্পদ উন্নয়নে এক তরফাভাবে কারিগরি এবং পৈত্রিক পেশাগত কর্মমুখী শিক্ষার উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করেছেন। ওই দেশটি পৃথিবীতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার জন্য দীর্ঘ পাঁচ বছর তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রেখেছিল। তৎকালীন চীন সরকারের ধারণা এত ছেলেমেয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে কি করবে? কোথায় চাকরি পাবে? কে তাঁদের চাকরি দেবে? ওই সময় থেকেই চীনের ছাত্র-ছাত্রীদের নানা ধরনের ট্রেড কোর্সে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। চীনের প্রতিটি বাড়ি একটি ফ্যাক্টরি, প্রত্যেক পরিবারের প্রতিজন সদস্য এক একজন ইঞ্জিনিয়ার। অথচ উজ্জ্বল সম্ভাবনার বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে বাহারি নামের বিশ্ববিদ্যালয়। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেট যেখানে নেই ক্যাম্পাস, চার দেয়ালের ঝুপড়িতেই দেয়া হচ্ছে গতানুগতিক শিক্ষামন্ত্র। চীন যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নের কারখানা হিসেবে শিক্ষাকে গ্রহণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনায় একটি দেশে বেকার তৈরির কারখানা প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে। বিবিএসের শ্রমশক্তির জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকার ৪ কোটি ৮২ লাখ। এর মধ্যে ২৬ লাখই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। বাকিরা অলস, অদক্ষ এবং মৌসুমী বেকার। জাপান এবং চীনের শিক্ষাব্যবস্থার আদলে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় জাতি গঠনে গতানুগতিক শিক্ষা পরিহার করে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুদক্ষ জাতি গঠনে শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা যায় তবেই বাংলাদেশ অতি দ্রুত অর্থনৈতিকভাবে বিশ্ববাজারে একতরফাভাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে। এক্ষেত্রে আর কালক্ষেপণ নয়, শিক্ষা, বেকার, কর্ম এবং কর্মী সৃষ্টির গবেষণালব্ধ ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ চালু এখন সময়ের দাবি।

লেখক : শিশু সংগঠক

নির্বাচিত সংবাদ