১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কত পালিয়ে এসেছে কত জন্ম নিয়েছে কেউ জানে না ॥ রোহিঙ্গা শিশু ১

কত পালিয়ে এসেছে কত জন্ম নিয়েছে কেউ জানে না ॥ রোহিঙ্গা শিশু ১

রহিম শেখ, কক্সবাজার থেকে ফিরে ॥ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গর্ভবতী নারী এবং গত এক বছরেরও বেশি সময়ে কত শিশু জন্ম নিয়েছে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মেডিক্যাল সেন্টারগুলোতে যেসব সন্তান প্রসব হচ্ছে সেগুলোর হিসাব সেই সেন্টারগুলোতে রয়েছে। তবে বেশিরভাগ প্রসবই হচ্ছে ঘরে। বেসরকারী একটি গবেষণা সংস্থার তথ্য বলছে, এখনও চার হাজার ৬৬২ জন গর্ভবতী নারী রয়েছেন। যারা আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যেই সন্তান প্রসব করবেন। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য মতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গড়ে প্রতিদিন ৬০ শিশু জন্ম নিচ্ছে। অন্য একটি বেসরকারী সংস্থা অবশ্য বলছে, প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে শতাধিক শিশু। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আসা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এতিম শিশুর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৪১। এদের মধ্যে ৮ হাজার ৩৯১টি শিশুর মা-বাবা কেউ নেই। সমাজ সেবা অধিদফতরের তথ্য বলছে, বর্তমানে অতি ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৯১৮। ফলে ক্যাম্পের পরিবেশে এই শিশুরা পাচার, বাল্যবিয়ে ও অন্যান্য ধরনের নির্যাতনের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিদেশী সংস্থার প্রতিনিধিরা।

জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের প্রতি দুজনের একজন মা অথবা বাবাকে হারিয়েছে। অর্থাৎ যত শিশু এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছে, তার ৫০ শতাংশেরই বাবা অথবা মা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ছয় হাজারের বেশি পিতৃ-মাতৃহীন রোহিঙ্গা শিশু বসবাস করছে।

এতে বলা হয়, ৭০ শতাংশ শিশু পুরোপুরি অভিভাবকহীন এবং তারা তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকা-ে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ শিশুই তাদের অভিভাবকসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষদর্শী। বাকিদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ শিশু তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে রাখাইনের গ্রামগুলোতে আক্রমণের সময়। ৯ শতাংশ তাদের অভিভাবকদের হারিয়েছে বাংলাদেশে আসার পথে। সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ারস বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই শিশুরা এ মুহূর্তে পৃথিবীতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। তাদের এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মা-বাবা কিংবা কোন পরিবারের সদস্য ছাড়া এক নতুন অস্তিত্ব তৈরি করতে হয়েছে। ক্যাম্পের পরিবেশে এই শিশুরা পাচার, বাল্যবিয়ে ও অন্যান্য ধরনের নির্যাতনের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের সহায়তায় সমাজসেবা অধিদফতর রোহিঙ্গা শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এতিম শিশুর তালিকা করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। ইউনিসেফ ও অধিদফতরের মধ্যে ১৭ কোটি ২২ লাখ ৫ হাজার টাকার চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। সমাজসেবা অধিদফতরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, গত আগস্ট মাস পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৬০৫টি ফস্টার কেয়ারগিভার (আত্মীয় বা অন্য যে পরিবারের সঙ্গে শিশুকে রাখা হচ্ছে) পরিবারকে এতিম শিশুর জন্য গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ৫৮৪টি শিশুর কেয়ার বিভাগকে ৯১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক এবং রোহিঙ্গা শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের ফোকাল পয়েন্ট মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, তালিকায় থাকা ৩৯ হাজার ৮৪১টি রোহিঙ্গা এতিম শিশুর মধ্যে ২০ হাজার ৮৫০টি শিশুর তথ্য যাচাই করা সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে নতুন করে ২ হাজার ২১৫টি শিশুকে ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই শিশুদের মধ্যে ২১ হাজার ৫৭২টি শিশুর ঝুঁকির মাত্রা চিহ্নিত করা হয়েছে।

অতি ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা ৫ হাজার ৯১৮। সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এই শিশুদের তথ্য যাচাইয়ের কাজটি সময়সাপেক্ষ। যেসব শিশুর নামে টাকা দেয়া হচ্ছে, সেই টাকা কীভাবে খরচ করা হচ্ছে, তাও নজরদারি করা হচ্ছে। তাই কার্যক্রমের আওতায় এখন পর্যন্ত সব শিশুকে আনা সম্ভব হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার প্রথমে এই শিশুদের জন্য শিশুপল্লী করতে চাইলেও পরে তারা যাতে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় এবং মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার সময় আশ্রয় দেয়া পরিবার যাতে এই শিশুদেরও সঙ্গে নিয়ে ফেরে, সে জন্য শিশুপল্লী করার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে।

জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্যানুযায়ী, রাখাইন রাজ্য থেকে যেসব রোহিঙ্গা নারী বাংলাদেশে এসেছিলেন তাদের মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি ছিল প্রজননসক্ষম; যাদের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ এর মধ্যে। এর মধ্যে ২৫ হাজার নারী ছিল সন্তানসম্ভবা বা প্রসূতি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে শিশু। গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করার পর থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই সময় তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপকরণও দেয়া হয়, কিন্তু সেসব তারা গ্রহণ করেননি। জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে এ জনগোষ্ঠীর কোন সচেতনতা নেই, নেই কোন আগ্রহও। আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কাজ করছে এমন একটি সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ক্যাম্পগুলোতে কত গর্ভবতী নারী রয়েছেন এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। যেটা শুরু থেকে ধারণা করা হয়েছিল সেই সংখ্যা ধরেই সংস্থাগুলো কাজ করছে, যদিও এ সংখ্যা বাড়তে বা কমতে পারে।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালাম বলেন, গত এক বছরেরও বেশি সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কত শিশুর জন্ম হয়েছে এর সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার শিশু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মগ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য মতে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গড়ে প্রতিদিন ৬০ শিশু জন্ম নিচ্ছে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম নিয়েছে ৪৮ হাজারেরও বেশি শিশু। বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের কাছেও এ বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য নেই। তবে সংস্থার কমিউনিকেশন ফর ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৪০ হাজার হাউস হোল্ডের ওপর একটি জরিপ করে। সেখানে দেখা গেছে, এখনও চার হাজার ৬৬২ জন গর্ভবতী নারী রয়েছেন। যারা আগামী দুই তিন মাসের মধ্যেই সন্তান প্রসব করবেন। প্রকল্পপ্রধান শামীম ইফতেখার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গর্ভবতী নারীর এবং গত এক বছরে কত শিশু জন্ম নিয়েছে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মেডিক্যাল সেন্টারগুলোতে যেসব সন্তান প্রসব হচ্ছে সেগুলোর হিসাব রয়েছে। তবে বেশিরভাগ প্রসবই হচ্ছে ঘরে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর জনকণ্ঠকে বলেন, ক্যাম্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী কন্ট্রাসেপটিভ দেয়ার জন্য বলা হচ্ছে। পাঁচ বছর মেয়াদী ইমপ্ল্যান্ট তাদের জন্য সাজেস্ট করা হচ্ছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের এসব পদ্ধতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য কতটুকু কার্যকর হতে পারে জানতে চাইলে এ এস এম আলমগীর বলেন, তাদের বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু কাজটা খুব কঠিন। রাখাইনে ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং’ বলে কিছু ছিল না মন্তব্য করে তিনি বলেন, শুরু থেকেই বাংলাদেশের সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা এ লক্ষ্যে কাজ করছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু এতে আদৌ কোন কাজ হচ্ছে কিনা, সেটা বলা মুশকিল।