১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে অগ্রগতি

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ২০১৮ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে যথেষ্ট এগিয়ে বাংলাদেশ। এই সূচকে বিশ্বের ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬তম, যা গতবারের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ১০৩তম আর পাকিস্তানের ১০৬তম। খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ও জার্মানিভিত্তিক সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড যৌথভাবে প্রতিবছর তৈরি করে থাকে প্রতিবেদনটি। এতে আরও বলা হয়েছে, ভারতের ক্ষুধা পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। ২০১৬ সালে ৯৭তম অবস্থান থেকে দেশটি নেমে এসেছে ১০৩ নম্বরে। অন্যদিকে পাকিস্তান গত ৩ বছর ধরে আছে একই অবস্থানে-১০৬ নম্বর। এক্ষেত্রে গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিস্ময়কর। তবে কিছু এলাকায় ক্ষুধা ও অপুষ্টি এখনও রয়ে গেছে, বিশেষ করে কক্সবাজার ও বরিশাল অঞ্চলে। এসব এলাকায় প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ অদ্যাবধি দারিদ্র্যসীমার নিচে। প্রাকৃতিক দুর্যোগও বেশি। কর্মসংস্থান কম। মিয়ানমারের ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং ২০১৭-এর অতিবৃষ্টি ও বন্যা কিছুটা হলেও চাপ সৃষ্টি করেছে খাদ্য নিরাপত্তায়। দেশে কোন খাদ্য সমস্যা নেই স্বীকার করে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, অপুষ্টিজনিত কিছু সমস্যা আছে। ২০ উপজেলায় পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল বিতরণ শুরু হয়েছে, যা শীঘ্রই দেয়া হবে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে। মঙ্গাকে অতিক্রম করে দেশ এখন খাদ্য বিশেষ করে ধান-চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

বর্তমান সরকারের নানা উদ্যোগের মধ্যে অন্যতম ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প।’ ২০০৯ সালে গৃহীত এই প্রকল্পের মধ্যে এ পর্যন্ত ৬০ লাখ পরিবারকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কাজ চলছে। এবার এই প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়েছে ভিক্ষুকদের। চলমান প্রকল্পে চতুর্থ একটি সংশোধনী আনার মাধ্যমে লক্ষাধিক ভিক্ষুককে প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ভিক্ষুক ও অতি দরিদ্রদের যুক্ত করা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি কেনাসহ আরও অনেক কাজে ঋণ দেবে সরকার। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো, তৃণমূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে আরও নানা কাজে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।

দেশে হাঁস-মুরগি-গবাদিপশুর সঙ্কট রয়েছে। মাথাপিছু দুধ-ডিম- মাংস-মাছ তথা প্রোটিনের ঘাটতি সর্বজনবিদিত। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বিশেষ করে গবাদিপশু, ডিম ও মুরগির বাচ্চা আমদানি করে মেটাতে হয় স্থানীয় চাহিদা। দুধের চাহিদা মেটাতে বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে গুঁড়া দুধ আমদানি করতে হয়। জাতীয়ভাবে তরল দুধের প্রাপ্যতাও সীমিত, দামও বেশি। দৈনন্দিন মাংসের চাহিদা মেটাতে প্রধানত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানি ততোধিক চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসে গবাদিপশু। পশুখাদ্যের দামও অত্যধিক। তবে বর্তমানে দেশটিতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ায় গরু আমদানি প্রায় বন্ধ তথা সীমিত হয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে দুধ-ডিম-মাংসের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সুষ্ঠু ও সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদী পরকল্পনা নিয়ে আমাদের আরও বহুদূর অগ্রসর হতে হবে। ভিক্ষুক শ্রেণীকে গবাদিপশুর খামার প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

দেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যে ভরপুর। সাড়ে ১২ লাখ টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে জনসাধারণের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে। বাংলাদেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনে এই সাফল্যের প্রশংসা করা হয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও। এ সবই ডিজিটাল কৃষির অবদান। বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ফল উৎপাদনে সপ্তম। আরও উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। এখন নজর দেয়া উচিত বিভিন্ন ও বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। ডাল, তেলবীজ, ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, মসলা উৎপাদনেও ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, শুধু ভাতে পেট ভরে বটে, তবে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না।