১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ হাসিনার উন্নয়নের খণ্ডচিত্র -স্বদেশ রায়

১১ সেপ্টেম্বর রাত তিনটায় রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বড় সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রামের রাস্তা ধরে রওনা দিয়েছিলাম একটি দায়িত্ব পালনের জন্য। ৫ ঘণ্টায় মাত্র ৩৫ কিলোমিটার এগুতে পারি। নিজের জীপের সামনে ও পিছনে যতদূর লাইট ফেলে দেখতে পাই মালবাহী কার্গো-লরি সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে। সবই বাম্পার টু বাম্পার। লরি ড্রাইভারদের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, প্রতি রাতেই তাদের এ অবস্থা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন হয়েছে, সিক্স লেনের কাজ চলছে- তারপরেও এ অবস্থা। তবে এই মালবাহী কার্গো-লরির জট বাংলাদেশের কোন নেগেটিভ চিত্র নয়। মূলত এই অবস্থা প্রকাশ করছে প্রতিদিন রফতানির জন্য বন্দরে কত মাল যাচ্ছে, আবার আমদানি পণ্য কী পরিমাণ দেশে ঢুকছে। মূলত এ ছবি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বুঝতে সাহায্য করে। আমার সঙ্গীদের একজন ছিলেন সোশ্যাল ইকোনমির শিক্ষক, আরেকজন ইকোনমিক্সের ছাত্র। তারা দু’জনেই বিস্মিত। বাস্তবে তাদেরও ধারণার বাইরে চলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার।

রাস্তার উপরের ইকোনমির এই কম্পোনেন্ট ছাড়াও দিনের আলো ফুটতেই রাস্তার দু’পাশে দেখতে পাই কৃষি অর্থনীতির মহাযজ্ঞ। মাইলের পর মাইল ভূমি তলিয়ে গেছে পানিতে। আর সেখানে চলছে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ। রাস্তার ধারে ধারে নিয়ে আসা হচ্ছে সে সব মাছ। সেগুলোও ট্রাকে ভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নানান দিকে। এর কয়েক কিলোমিটার এগুতেই অবাক করে দেয়, মাইলের পর মাইল ভূমিতে ড্রাগন ফ্রুটের চাষ হচ্ছে; যা দেখে নিজেরই মনে হলো থাইল্যান্ডের কোন গ্রাম এলাকায় ঢুকেছি নাকি ! মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী থাইল্যান্ডের হর্টিকালচার পরিদর্শন শেষে দেশে ফেরার পরে তাঁর বাসায় বসে কথা হচ্ছিল। তিনি তখন বলেন, থাইল্যান্ড আর আমাদের আবহওয়া তো প্রায় একই রকম। ওরা যদি এত ফল আবাদ করতে পারে, আমরা কেন পারব না? তিনি বলেন, দেখেন এখন গোটা পৃথিবীর মানুষ ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়েই থাইল্যান্ডের উপস্থিতি টের পায়। কারণ, তাদের ডেজার্টের অধিকাংশ ফ্রুটসই থাইল্যান্ডের। বাংলাদেশ কেন এটা পারবে না? বাস্তবে মতিয়া চৌধুরী এমন একজন মন্ত্রী যিনি যতক্ষণ জেগে থাকেন ততক্ষণই তাঁর মন্ত্রণালয় ও তাঁর ওপর অর্পিত দেশের দায়িত্ব নিয়ে ভাবেন। বাংলাদেশের কৃষিতে তিনি যে নতুন কত কিছুর যোগ ঘটিয়েছেন আর তার জন্য গত দশ বছর তিনি কী পরিশ্রম করেছেন সেটা তুলে ধরতে হলে একটা বড় মাপের বই লেখা প্রয়োজন। তবে ঢাকা-কুমিল্লার রাস্তার পাশে মাইলের পর মাইল জমিতে ড্রাগন ফলের আবাদ দেখে অবাক হইনি। মনে মনে আনন্দিত হই। বাস্তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মতিয়া চৌধুরী সত্যিই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশকে গড়ে তুলছেন।

মাত্র ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই দেশটিতে প্রায় সতেরো কোটি মানুষকে শুধু চাল নয়; ডিম, মাছ, সবজি, মাংস ও ফল-মূল খাওয়াচ্ছেন কিভাবে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মাত্র কিছুদিন আগে কোরবানির ঈদ ছিল। সারাদেশে এক কোটির ওপরে গরু বিক্রি হলো। বাংলাদেশের গরু উৎপাদনকারীরা মার্কেটে এনেছিল দেড় কোটির ওপর গরু। খুবই অল্প সংখ্যক গরু আমদানি হয়েছিল ভারত ও বর্মা থেকে। যারা আমদানি করেছিলেন ওই সব আমদানিকারকরা শেষ অবধি হতাশ হয়েছেন। কারণ, তারা তেমন লাভ করতে পারেননি। বাংলাদেশের গরুর মানের কাছে হেরে গেছে ভারত ও বর্মার গরু। বাংলাদেশের অনেক গরু উৎপাদনকারীও তাদের সব গরু বিক্রি করতে পারেননি। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেল তারা হতাশ নন। কারণ, তাদের গরুর মাংসের বাজার সারা বছর তো রয়েছে। এছাড়া তারা অনেকেই এখন রফতানির কথা ভাবছেন। তাই এবার মৎস্য ও পশু সম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দর মুখ দেখে মনে হয়েছে তিনি খুবই সুখী মানুষ। কারণ, কয়েক বছর আগেও যেখানে কোরবানি ঈদে গরুর ঘাটতি পড়ত বাজারে, শেষেরদিকে মার্কেটে গরু থাকত নাÑ এবার ছিল উদ্বৃত্ত। কোরবানির ঈদের আগে এ বিষয়ে একদিন কথা হয় মন্ত্রী চন্দর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছেন। বাস্তবে তাঁর পূর্বসূরি ছায়েদুল হকও ছিলেন একজন নিবেদিত রাজনীতিক। তিনি আজকের এই সফলতার গোড়াপত্তন করে যান। তখন তাঁর সঙ্গী হিসেবে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মি. চন্দ। বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে। গরুর মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে রফতানির কথা ভাবছে উৎপাদনকারীরা। সারাদেশের বাজারে এখন মাছ, মাংস অর্থাৎ প্রাণীজ প্রোটিন যেমন মেলে তেমনি সবজিতে ভরা থাকে বাজার। সবজি রফতানি ও আমদানি সবই হয়। এটা মূলত পরিবহন খরচের দিকে তাকিয়ে। যেমন, এ মুহূর্তে ভারতের মেঘালয় বর্ডারের কাছে অন্তত একটি বর্ডার হাট করা একান্ত প্রয়োজন। দুদেশের মধ্যে ইতোমধ্যে নাকুরগাঁও-এ বর্ডার হাট নিয়ে সিদ্ধান্তও হয়ে আছে। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য থেকে নানান ধরনের পণ্য সহজে মেঘালয়ের মানুষের পাবার জন্য এ হাটটি দরকার। আবার বাংলাদেশের কৃষকদেরও দরকার ওই হাটটি। বাস্তবে এটা সব দেশের অর্থনীতির অপরিহার্য বিষয় যে, দেশে উদ্বৃত্ত হলেও আমদানি করতে হয় স্থানগত কারণে।

দেশের উৎপাদিত সবজি, মাংস, মাছ ঢাকার যে মধ্যবিত্তের টেবিলে প্রতিদিন আসছে, তাদের জীবন যাত্রায়ও এসে গেছে অনেক পরিবর্তন। বাস্তবে প্রয়োজন তাদেরকে এই পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আগে প্রতি বাড়িতেই গৃহকর্মী থাকত। তারা সব কাজ করত। এখন গৃহকর্মী মেলে খুবই কম। তাও পার্টটাইম। এবং দিনে দু’ঘণ্টা কাজ করলে মাসে তাকে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। যে কারণে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজে এখন আসছে আরেকটি পরিবর্তন। অর্থাৎ স্কুল পাস ছেলেমেয়েরা এখন ক্যাটারিংয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে দলে দলে। আর ঢাকার মধ্যবিত্ত বাড়িতে দিনে চার ঘণ্টা কাজ করে কমপক্ষে দশ হাজার টাকা মাসে বেতন পায় তারা। তাতে প্রতিদিনই দুই বাড়িতে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতে পারে খুব সহজেই। অন্যদিকে আগে যারা গৃহকর্মী হতো তাদের একশ্রেণী হচ্ছে এখন গার্মেন্টস কর্মী, অন্য একশ্রেণী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে; যেহেতু গ্র্যাজুয়েশন অবধি বিনা বেতনে সরকারী কলেজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ আছে।

গত দশ বছরে বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা যেখানে নিয়ে এসেছেন, এটি তার খুবই ক্ষুদ্র একটি খ-চিত্র মাত্র। এর সঙ্গে তাঁর নিজ অর্থায়নের পদ্মা সেতু, বিদ্যুত হাব গড়ে তোলা, নতুন আরও দুটি সমুদ্র বন্দর, যার মধ্যে একটা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেÑ এ সবই যোগ হবে। আর উন্নয়নের এই বিশাল ঝুড়ি ভর্তি করে আগামী ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা যে সময়ে উন্নয়নের বিশাল ঝুড়ি ভর্তি করে নির্বাচনে যাচ্ছেন সে সময়ে তাঁর বিরোধীদের কথা তিনি সঠিক মাত্রায় গণতন্ত্রী নন। অন্যদিকে বাস্তবে বাংলাদেশের মিডিয়ার দিকে তাকালে মনে হয় শেখ হাসিনা কি একটু বেশি গণতন্ত্র দিয়ে ফেলছেন! তা না হলে মিডিয়ার একাংশ কৌশলে ইসলামিক জঙ্গীদের পক্ষেও কথা বলে কিভাবে!

swadeshroy@gmail.com