১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্টেম সেল ॥ চিকিৎসার দিগন্ত অবারিত

  • এনামুল হক

হাওয়াইয়ের ৪০ বছরের এক মহিলা নিচেল ওবার দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হওার পর ১৮ সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ড করার সময় এক কঠিন সমস্যার কথা জানতে পারেন। তার গর্ভের বাচ্চার হার্ট স্বাভাবিকের চাইতে বড় এবং হার্টের চার পাশে পানি গলতে শুরু করেছে। তার মানে দ্রুত বর্ধনশীল শরীরে রক্ত পাম্প করে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ভ্রণকে অতিরিক্ত কঠিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে এবং হার্টও ফেল করতে শুরু করেছে। ডাক্তাররা জানতেন সমস্যাটা কোথায়। এটা হচ্ছে বক্তের এক জিনগত বৈকল্য, যার নাম আলফা থ্যালাসেমিয়া। ওবার ও তার গর্ভস্থ বাচ্চা উভয়েই এই সমস্যার বাহক। আলফা থ্যালাসেমিয়ার কারণে রক্তে লোহিত কণিকার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। লোহিত কণিকা হিমোগ্লোবিন বহন করে। এটি অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফুসফুস থেকে তা শরীরের অন্যান্য কোষে বয়ে নিয়ে যায়। তার মানে লোহিত কণিকা যত কম হবে সারা শরীরের কোষগুলোতে অক্সিজেনের মাত্রা ততই কম হবে।

ওবারের গর্ভের ১৮ মাসের বাচ্চার আলফা থ্যালাসেমিয়া নির্ণীত হওয়ার পর তাকে বাঁচানোর একটাই মাত্র পথ থাকে। তাহলো জরায়ু দিয়ে বাচ্চার শরীরে ব্লাড ট্রান্সফিউশনের ব্যবস্থা করা। এতে মাতৃগর্ভে থাকা অবধি বাচ্চাটি যদি বেঁচেও থাকে জন্মের পর থেকে বাকি জীবন পর্যন্ত তাঁর নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশনের প্রয়োজন হবে।

কিন্তু তাদের জেনেটিক কাউন্সিলর আলফা থ্যালাসেমিয়া চিকিৎসার আরেকটি সম্ভাবনাময় উপায়ের কথা বললেন। তাহলো ভ্রুণের জরায়ুতে স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টের চেষ্টা আগেও করা হয়েছে। তবে সাফল্য ছিল সীমিত। রক্তের স্টেম সেল ডোনারের বোনম্যারো থেকে আহরণ করা হয়। তারপর তা ল্যাবে প্রসেস করে মায়ের প্লাসেন্টারের সঙ্গে ভ্রুণের সংযোগ সাধনকারী নাড়ির রক্তবাহী শিরায় সরাসরি ইনজ্ক্টে করে দেয়া হয়। ডোনারের সুস্থ স্টেম সেলগুলো তখন বিভাজিত হতে শুরু করে এবং ভ্রুণের ত্রুটিপূর্ণ রক্ত কোষগুলোকে পরাস্ত করে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করে। তবে গর্ভবতী মহিলার বোনম্যারো বের করে নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। তাই অতীতের পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলোতে মায়ের পরিবর্তে বাবার স্টেম সেল নেয়া হয়েছিল এবং প্রায়শই ভ্ভ্রুণের শরীরে তা প্রত্যাখ্যাতও হয়েছিল এবং প্রায়শই ভ্রুণের শরীরে তা প্রত্যাখ্যাতও হয়েছিল। নতুন এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বাড়ন্ত ভ্রুণ বাবার স্টেম সেলের তুলনায় মায়ের স্টেম সেল অনেক বেশি মাত্রায় সইতে ও গ্রহণ করতে পারবে।

এই তথ্যটি জানার পর ওবারের সার্জন তাঁর গর্ভস্থ বাচ্চার ক্ষেত্রে চেষ্টা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। ওবারের স্বামীও সম্মতি দিল। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় তাদের কন্যাই হবে মায়ের স্টেম সেল গ্রহণকারী বিশ্বের প্রথম ভ্রুণ। বোনম্যারো থেকে নেয়া রক্তের স্টেম সেল লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমার মতো রক্তের ক্যান্সার চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু গর্ভবতী মহিলার কোষ নিয়ে বাড়ন্ত ভ্রুণের জরায়ুতে প্রবেশ করিয়ে চিকিৎসা করার এই ব্যাপারটি ওষুধের পরিবর্তে স্টেম সেল দিয়ে চিকিৎসা করা রোগ-ব্যাধির ক্রমবর্ধমান তালিকায় এক নতুন ও উদ্ভাবনীমূলক সংযোজন। স্টেম সেল চিকিৎসা দেয়ার পর সাত মাস আগে ওবার তার কন্যা সন্তানটি প্রসব করেন। তার নাম রাখা হয়েছে এলিমানা। সে ভাল আছে এবং ভালই খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলা করছে। নিরাপদ থাকার জন্য ডাক্তাররা তাঁকে মাসে একবার ব্লাড ট্রান্সফিউশন দিচ্ছেন। এক বছর পর্যন্ত তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না ওবারের রক্ত কোষগুলো তার কন্যার শরীরে ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। স্টেম সেল নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক প্রভাব এখনও পর্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও, অন্যান্য দৈহিক ত্রুটি নিরাময়ে এই চিকিৎসা অপার সম্ভাবনার সূচনা করেছে।

বোনম্যারোতে যে ধরনের স্টেম সেল পাওয়া যায় সেগুলো দিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিকভাবে শরীরে নতুন করে কোষ সৃষ্টি অর্থাৎ নিজেকে নতুন করে তৈরি করার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছেন। পূর্ণ বয়স্কের শরীরের ফ্যাট সেল ও রক্ত কোষসহ অনেক অঙ্গ এবং টিস্যুর নিজস্ব স্টেম সেল থাকে। সেগুলোর একমাত্র কাজ হলো পুরনো কোষ ও টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মরে গেলে নতুন করে কোষ ও টিস্যু জন্মানো। এগুলো গবেষণা ও শরীরের বৃদ্ধির জন্য শরীরের বাইরে কালচার করা যেতে পারে।

কিছু কিছু অঙ্গ আছে যেগুলোর অবশ্য এ ধরনের স্টেম সেলের ভা-ার বড় নয়। বিশেষ করে মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের পেশীর। দুই দশক আগে বিজ্ঞানীরা এসব স্টেম সেলের আরেকটি উৎস খুঁজে পান। সেটা হচ্ছে জরায়ু। তারা জরায়ুর স্টেম সেল থেকে ল্যাবে শরীরের যে কোন কোষ কিভাবে উৎপাদন করা যায় তাও আয়ত্ত করেছিলেন। এর ফলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি মানসিক বৈকল্য শেষ পর্যন্ত কোষ পরিবর্তনের মাধ্যমে সারিয়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে ওষুধ বা সার্জারির প্রয়োজন পড়বে না। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু বা কোষগুলোকে সুস্থ কোষ বা টিস্যু দিয়ে বদলে দিতে পারলেই হলো।

বেশ কয়েক বছরের গবেষণা ও অভিজ্ঞতার পর বিজ্ঞানীরা এখন পরীক্ষা করে দেখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন যে, যেসব স্টেম সেল হৃৎপেশীতে রূপান্তরিত হয় সেগুলো হার্ট এ্যাটাকের পর মৃত টিস্যুগুলোর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে কিনা। কিংবা টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াসের যেসব কোষ পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, সেগুলোর জায়গায় এই নতুন কোষ সৃষ্টি করে তা দিয়ে ইনসুলিন তৈরির কাজ করানো যায় কিনা। গবেষকরা এমনও একদিন আসবে বলে মনে করেন যখন স্টেম সেল থেকে তৈরি নতুন নিউরন দিয়ে পার্কিনসন রোগের মতো মস্তিষ্কের রোগের চিকিৎসা করা যাবে। নতুন কোষগুলো মস্তিষ্কের ক্ষতিগ্রস্ত মোটা নার্ভগুলোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে এ রোগ সারাবে। দীপক শ্রীবাস্তব নামে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, স্টেম সেল হাতে থাকায় আমরা এখন রোগের মূল কারণ নির্ণয়ে চলে যেতে পারি এবং খণ্ডিত চিকিৎসা করার পরিবর্তে রোগ সারিয়ে তুলতে পারি। স্টেম সেল শুধু যে রুগ্ন কোষের স্থলাভিষিক্ত হয়ে রোগের নতুন চিকিৎসা ও নিরাময় করতে পারবে তাই নয়, এগুলো রোগের অবস্থা নিয়ে গবেষণার নতুন গুরুত্বপূর্ণ পথেরও সন্ধান দিতে পারবে। আমেরিকার বিভিন্ন ল্যাবে এখন আইপিএস থেকে জন্মানো হাজার হাজার মস্তিষ্ক কোষের তৈরি মিনি-ব্রেন সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে সেগুলো অটিজম থেকে সিজোফ্রেনিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন মানসিক বৈকল্যের ওপর গবেষণার মডেল হিসেবেও কাজ করবে। এ ধরনের পুরনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে নতুন চিকিৎসার পথ করে দেবে, যেখানে এত দিন চিকিৎসা তেমন কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

আইপিএস সেল (ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল) থেকে তৈরি মিনি ব্রেনে সেই একই ২০ হাজার জিন আছে, যা যে কোন মানুষের কোষের ডিএনএতে থাকে এবং এই মিনি ব্রেন প্রয়োজনীয় সব প্রোটিন তৈরি করতে পারে, যা যে কোন মস্তিষ্ক কোষই তৈরি করেএ এই মিনি ব্রেন থেকে গবেষকরা কোন প্রক্রিয়ায় কিভাবে মস্তিষ্ক কোষ জন্মে ও বিকাশ লাভ করে তা জানার সুযোগ পাচ্ছেন এবং সেই সঙ্গে সুযোগ পাচ্ছেন মৃগী, বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা, অটিজম ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো সমস্যাগুলো দূর করার সম্ভাব্য উপায় কি হতে পারে তা জানবার।

বিজ্ঞানীরা রোগগ্রস্ত টিস্যু বা অঙ্গের অংশবিশেষ বদলে দেয়ার জন্য সেগুলো পুনরুৎপাদনের ব্যাপারেও অগ্রগতি অর্জন করেছেন। ক্যান্সার আক্রান্তদের মধ্যে যাদের উইন্ডপাইপ বা ইউরেথ্রা বিনষ্ট হয়ে গেছে তাদের এখন নিজস্ব কোষ দিয়ে নতুন উইন্ডপাইপ ও ইউরেথ্রা জন্মানো সম্ভব। এতে ট্রান্সপ্লান্টে অঙ্গ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।

মানবদেহের হৃৎপিন্ডের সমস্যা সমাধানে আইপিএস প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। পূর্ণ বয়স্ক মানুষের হার্টের পেশীর কোষের বিভাজন হয় না কিংবা হলেও এতই কালেভদ্রে ঘটে যে, হার্ট এ্যাটাকের সময় হার্টের টিস্যু নষ্ট বা মরে গেলে সেগুলোর আর পুনরুৎপাদন হয় না। কিন্তু শ্রীবাস্তব লক্ষ্য করেছেন যে, বিকাশমান ভ্রƒণের হার্টের পেশীর কোষ সক্রিয়ভাবে বিভাজিত হয়ে হার্ট গঠন করে। সেখান থেকে জিন নিয়ে সুস্থ শরীরের পূর্ণবয়স্ক মানুষের হার্টে পুনর্¯’াপিত করা হলে কোষ নতুন করে সৃষ্টি হয়। ফলে হৃদপেশীও পুনর্গঠিত হয়।

শ্রীবাস্তব বলেন, এই কৌশল শুধু নতুন হৃদপেশী তৈরিতেই কার্যকর নয়, অন্যান্য ধরনের কোষ গঠনেও কার্যকর, যেমন প্যানক্রিয়াসের কোষ গঠন। ডায়াবেটিস রোগীদের সমস্যা হলো তাদের প্যানক্রিয়াসের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে বা খর্ব হয়ে যায়। ফলে প্যানক্রিয়াস প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না বা একদমই পারে না। স্টেম সেল প্রয়োগ করে দেখা গেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত প্যানক্রিয়াসের কোষ পুনর্গঠিত হতে পারে এবং প্যানক্রিয়াস আবার স্বাভাবিক কাজ করতে পারে।

সূত্র : টাইম