১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রুপালি গিটার ফেলে না ফেরার দেশে আইয়ুব বাচ্চু

রুপালি গিটার ফেলে না ফেরার দেশে আইয়ুব বাচ্চু
  • আজ শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধাঞ্জলি;###;বাদ জুমা জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রথম জানাজা;###;চট্টগ্রামে মায়ের কবরের পাশে কাল দাফন

মনোয়ার হোসেন ॥ থেমে গেল বাংলাদেশের ব্যান্ডসঙ্গীতের প্রতিনিধিত্বশীল কণ্ঠস্বরটি। বাজবে না আর শ্রোতাকে আলোড়িত করা তার রুপালি গিটারটি। আর কখনও গাইবেন না ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো/অনেক কথায় মুখর আমায় দেখো/দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা ...। বিষাদের রেখাটানা সেই নীরবতায় শেষ হলো কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনের অধ্যায়। তাই তো সুররসিকরা তার কণ্ঠে শুনবেন না সেইÑ এই রুপালি গিটার ফেলে/একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে/ সেদিন অশ্রু তুমি রেখো/গোপন করে ...। প্রিয় পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চিরতরে চলে গেলেন রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অগণন শ্রোতা-ভক্ত, সহযাত্রী ও শুভাকাক্সক্ষীকে বেদনার অশ্রুজলে ভাসিয়ে শেষ হয় শিল্পীর জীবনের পরিভ্রমণ। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ৫৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রেখে গেছেন রাজকন্যা নামের এক মেয়ে ও ছেলে আহনাব তাজওয়ারকে। বর্তমানে ছেলে অস্ট্রেলিয়া ও মেয়ে কানাডায় অবস্থান করছেন। পিতার মৃত্যুর খবরে তারা দেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আইয়ুব বাচ্চুর আকস্মিক মৃত্যুর খবরে সঙ্গীতাঙ্গনসহ দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সঙ্গীতশিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, রাজনৈতিক দলের সদস্যসহ হাজারও মানুষ ছুটে যান হাসপাতালে। তাদের বেদনার্ত মুখ আর চোখের জলে ছিল প্রিয় মানুষকে হারানোর দুঃখমাখা তীব্র অনুভব। এদিন সেই শোকের অনুভবটি ছুঁয়ে গেছে রাজধানী থেকে সারাদেশে। শোকের কষ্ট ছিল সাধারণের আলোচনা থেকে নানাজনের ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে।

শিল্পীর শবদেহ রাখা হয়েছে স্কয়ার হাসপাতালের হিমাগারে। সেখানেই বৃহস্পতিবার দুপুরে শবদেহের গোসল সম্পন্ন হয়। আজ শুক্রবার সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শিল্পীর মরদেহ নিয়ে আসা হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে অনুরাগী-শুভাকাক্সক্ষীসহ সর্বস্তরের মানুষ জানাবেন ভালবাসার প্রতীকী শ্রদ্ধাঞ্জলি। এ প্রসঙ্গে বরেণ্য নাট্য নির্দেশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১২ পর্যন্ত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রাখা হবে তার কফিন। সেখানেই শ্রদ্ধা জানাবেন সর্বসাধারণ। এরপর জুমার নামাজের সময় শবদেহ নিয়ে যাওয়া হবে জাতীয় ঈদগাহ মাঠে। এখানে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তেজগাঁওয়ের চ্যানেল আই ভবনে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে শবদেহ সরাসরি নিয়ে যাওয়া হবে চট্টগ্রামে। পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মেয়ে ও ছেলে দেশে ফেরার পর শনিবার শিল্পীকে সমাহিত করা হবে তার জন্মস্থান চট্টগ্রামের এনায়েত বাজার এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে। মায়ের কবরের পাশে দাফনের আগে সেখানে তৃতীয় দফা জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিদ্যুত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা।

স্কয়ার হাসপাতালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর ডাঃ মির্জা নাজিম জানান, সকাল সাড়ে ৮টায় আইয়ুব বাচ্চু অসুস্থ হয়ে পড়লে ধানম-ির বাসা থেকে তার ড্রাইভার আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এ সময় জরুরী বিভাগের কার্ডিয়াক কনসালট্যান্ট মুনসুর মাহবুবের উপস্থিতিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে শিল্পীর হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ৯টা ৫৫ মিনিটে আমরা তাকে মৃত ঘোষণা করি। তিনি আরও জানান, বহুদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার হার্টে কার্ডিয়োমাইপ্যাথি ছিল। ২০০৯ সালে তার হার্টে একটি স্টেন্ট পরানো হয়। তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ছিল ৩০ শতাংশ, যেখানে একজন সুস্থ মানুষরে থাকে ৭০ শতাংশ। এ জন্যই বারবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। হার্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তার মুখ থেকে পানির মতো ফেনা বের হয়েছে।

শিল্পীর প্রতি সহযাত্রীদের ভালবাসা ॥ আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকে-লোকারণ্যে হয় হাসপাতাল। কিংবদন্তি শিল্পীর আকস্মিক প্রস্থানে হতবিহ্বলতার ছাপ দেখা যায় হাসপাতালে আসা প্রতিটি মানুষের মুখে। প্রিয় বিদায়ী মানুষটিকে দেখতে আসেন নবীন-প্রবীণ থেকে প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন নানা পেশার মানুষ।

প্রাণপ্রিয় সহযাত্রীকে হারানোর বেদনায় আরেকজনের কাঁধে হাত রেখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন তুমুল শ্রোতানন্দিত কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর। সঙ্গীতাঙ্গনে আইয়ুুব বাচ্চুর অবদান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনকণ্ঠকে বলেন, গায়কীর বিবেচনায় এখন পর্যন্ত এদেশের সে এক ও অদ্বিতীয় শিল্পী। স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বরের সঙ্গে নিজস্ব ধারার মিশেলে অনন্য এক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। বছরে বছরে এমন শিল্পীর জন্ম হয় না। নতুন প্রজন্ম যদি তার গায়কীর ধরন থেকে কিছুটাও শিখতে পারে, সেটাই হবে তার প্রতি ভালবাসা জানানোর সুন্দরতম কৌশল।

জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফাহমিদা নবী বলেন, কাউকে না বলে হঠাৎ করেই যেন চলে গেলেন আইয়ুব বাচ্চু। এত বড় মাপের শিল্পী সহজে পাওয়া যায় না। তিনি যেভাবে গান গাইতেন শত বছর পূর্বে কিংবা শত বছর পরেও এমন শিল্পী আসেনি এবং আসবে না। শিল্পী হিসেবে দেশের প্রতি ছিল তার দারুণ ভালবাসা। প্রতিটি অনুষ্ঠান শেষ করতেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গেয়ে। আর তিনি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতেন না। আপদে-বিপদে ছোট কিংবা বড় যে কোন শিল্পীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। অন্যের জন্য নিজের সর্বোচ্চটুকু দেয়ার চেষ্টা করতেন।

রেনেসাঁ ব্যান্ডের নকীব খান বলেন, আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীর কারণে এদেশের ব্যান্ডসঙ্গীত জয় করেছে শ্রোতার অন্তর। শরীরী মৃত্যু হলেও মননের তাড়নায় রেখে গেছেন অনেক কালজয়ী গান। তার গাওয়া সেই গানগুলো সংরক্ষণের জন্য আমরা সকল শিল্পী মিলে উদ্যোগ গ্রহণ করব, যাতে শত বছর পরের শ্রোতারাও শুনতে পায় সেসব গান।

শ্রোতা সমাদৃত কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন, সময়ের আগেই চলেন আইয়ুব বাচ্চু। তাই এমন অসময়ে মৃতুকে মেনে নেয়া যায় না। এই দেশ ও এদেশের শ্রোতাদের আরও অনেক কিছু দেয়ার ছিল তার। এই শিল্পীর গায়কীর ধরন কিংবা গিটারের বাদন বড্ড বেশি মিস করবে নতুন প্রজন্ম। তার মতো এত সুন্দর সুর তুলে গিটার বাজাতে দেখিনি আর কাউকে। একেবারেই ইউনিক ছিল তার সেই গিটারের বাজনাটি।

ব্যান্ডশিল্পী লাবু রহমান বলেন, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে ব্যান্ডসঙ্গীতে এ রকম শিক্ষক নেই বললেই চলে। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো সেটি অসীম। চাইলেও সহজেই পূরণ হবে না সেই শূন্যতা।

এছাড়া আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণের খবরে হাসপাতালে ছুটে যান দলছুট ব্যান্ডের বাপ্পা মজুমদার, জনপ্রিয় উপস্থাপক ও নির্মাতা হানিফ সংকেত, অভিনেতা আফজাল হোসেন, সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী, অভিনেতা শংকর সাঁওজাল, গণসঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর, অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা, কণ্ঠশিল্পী রফিকুল আলম, তপন চৌধুরী, তপন মাহমুদ, ফোয়াদ নাসের বাবু, পার্থ বড়ুয়া, অবসকিউরের সাইদ হাসান টিপু, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, তপু, রুমি, কোনাল, মাহাদী, প্র্রিন্স মাহমুদ, ওয়ারফইজেরে টিপু, কনা, এলিটা, অভনেত্রী বন্যা মির্জাসহ শিল্প-সংস্কৃতি ভুবনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এছাড়া শিল্পীদের পাশাপাশি হাসপাতালে হাজির হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিলসহ রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বরাও।

শিল্পীর জীবনকথন ॥ ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। শিল্পীর সঙ্গীত জীবনের সূচনা হয় ১৯৭৭ সালে। ১৯৭৮ সালে তিনি যোগ দেন ব্যান্ডদল ফিলিংসে। তার প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর যোগ দেন সোলসে। ১৯৮০ সাল থেকে পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত সম্পৃক্ত ছিলেন এই ব্যান্ডে। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করেন নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। পরে এই নামে অস্ট্রেলিয়াতে আরেকটি ব্যান্ড থাকায় বদলে করা হয় লাভ রানস বাইন্ড।

তার প্রথম একক এ্যালবাম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ সালে ‘রক্তগোলাপ নামে’। আর ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় এলআরবির প্রথম এ্যালবাম এলআরবি। এরপর একে একে আসা এই ব্যান্ডের অন্য এ্যালবামগুলো সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারী মন (১৯৯৬), স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮), যুদ্ধ (২০১২) প্রকাশ পায়। একক এ্যালবামের মধ্যে রক্তগোলাপের পর রয়েছে ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল, ২০০৭), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯), জীবনের গল্প (২০১৫)। এ ছাড়াও প্রচুর মিশ্র এ্যালবামে কাজ করেছেন। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে গেয়েছেন চলচ্চিত্রের গান। লুটতরাজ ছবিতে তার গাওয়া ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ পেয়েছে দারুণ শ্রোতাপ্রিয়তা। এছাড়া তার গাওয়া ‘আম্মাজান’ গানটিও বাংলা সিনেমার গানের ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় গান।

আইয়ুব বাচ্চু তার গিটারে আধ্যাত্মিকগুরু মনে করতেন বিশ্ব খ্যাত গিটার লিজেন্ড জো স্যাট্রিয়ানিকে। সেই সুবাদে তার বাজ জো স্যাট্রিয়ানির প্রভাব প্রচ-। এই প্রতিবেদকে বিভিন্ন সময় তার নিজস্ব স্টুডিও ‘এবি কিচেনে’ তার গিটার বিষয়ক ভাবনার কথা বলেন। আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমার যখন কিছুই ভালো লাগে না তখন জো স্যট্রিয়ানি’র লাইভ ভিডিও দেখতে বসে যাই। দেখে মনে হয় জীবনে সঙ্গীতে আরও অনেক কিছু করবার আছে।’ এছাড়াও তিনি স্টিভ ভাই, বিবি কিং, মাইকেল রোমিওর গিটার দ্বারাই দারুণভাবে প্রভাবিত হন। দেশে তার প্রিয় গিটারিস্টদের মধ্যে প্রয়াত নয়ন মুন্সি, নিলয় দাস ও ওয়ারফেজের কমল অন্যতম।

বিভিন্ন ধারার সঙ্গীত নিয়ে কাজ করলেও আইয়ুব বাচ্চু মূলত রক ঘরানা পছন্দ করতেন। এলআরবির তবুও এ্যালবামটি বাংলাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম একটি ‘হার্ডরক’ এ্যালবাম হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে আইয়ুব বাচ্চুর একক এ্যালবাম ‘কষ্ট’ দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রি হওয়া এ্যালবামের একটি। দাফন হবে চট্টগ্রামের চৈতন্যগলি গোরস্তানে ॥ চট্টগ্রাম অফিস জানায়, সঙ্গীত শিল্পী ও গিটারিস্ট আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণে চট্টগ্রামের সঙ্গীত অঙ্গনসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই চট্টগ্রামেই তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ৮০-এর দশকে পাড়া মহল্লায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন থেকে ধীরে ধীরে তিনি নিজকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই চট্টগ্রামে আসবে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ। নগরীর চৈতন্যগলি কবরস্থানে মায়ের পাশে সমাহিত হবেন দরাজকণ্ঠের এই শিল্পী।

চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোক বিবৃতিতে মেয়র বলেন, আইয়ুব বাচ্চু একাধারে গায়ক, লিডগিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী ছিলেন। এলআরবি ব্যান্ড দলের ভোকাল বাচ্চু হিসেবে ব্যান্ড জগতে অত্যধিক পরিচিত। জনপ্রিয় এই সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব চট্টগ্রামের সন্তান। এই বন্দর নগরীতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। চট্টগ্রামের গর্বিত এই সন্তানের মৃত্যুতে জাতি একজন জনপ্রিয় মেধাবী সঙ্গীত ব্যক্তিত্বকে হারাল। তাই তার এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। মেয়র বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

চট্টগ্রাম নগরীর এনায়েত বাজার জুবিলী রোড এলাকায় জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। তার ডাক নাম রবিন। কৈশোর থেকেই সঙ্গীতপাগল ছিলেন তিনি। পাড়ায় প্রায় সকল অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতি ছিল। তবে প্রথমে ছিলেন শ্রোতা। বেশি আগ্রহ ছিল গিটারসহ বাদ্যযন্ত্রগুলোর প্রতি। শুরুটা হয়েছিল গিটারিস্ট হিসেবে। একটানা প্রায় এক দশক কেটে যায় গিটার হাতে। সে কারণে সঙ্গীত শিল্পীর চেয়েও তার পরিচিতি বেশি হয় গিটারবাদক রূপে। পাড়া মহল্লায় বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেছেন দল নিয়ে। প্রথমে ‘ফিলিংস’ এবং একপর্যায়ে ‘সোলস’।

আইয়ুব বাচ্চুর নানার বাড়ি নগরীর পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায়। এখানে কেটেছে তার শৈশবের অনেক দিন। চট্টগ্রামের এলে তিনি সেখানেই থাকতেন। শনিবার মাদারবাড়ি এলাকায় এ শিল্পীর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাকে চৈতন্যগলি গোরস্তানে দাফন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।

বাচ্চুর স্মৃতি এখন একটি সেমিপাকা ঘর ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা, পটিয়া থেকে জানান, জনপ্রিয় ব্যান্ড সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার খরনা ইউনিয়নের গাঙ্গারকুল এলাকায় রয়েছে সেমিপাকা একটি ঘর। ওই ঘরে আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের কেউ বসবাস না করলেও বর্তমানে তার চাচাত ভাই বিএনপি নেতা আবদুল আজিজের পরিবার বসবাস করছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা গেলে শোকের মাতম গ্রামের বাড়ি পটিয়াতেও দেখা দিয়েছে। সকাল থেকে বিভিন্ন মিডিয়ার লোকজন ও ভক্তরা তার গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান। ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মোঃ ইছহাক ও মাতার নাম নূর জাহান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার খরনা ইউনিয়নের গাঙ্গারকুল এলাকায় পৈতৃক বসতভিটে হলেও দীর্ঘদিন তার পিতা ব্যবসায়িক সুবাদে চট্টগ্রাম শহরে থাকতেন। আইয়ুব বাচ্চুর পিতা মোঃ ইছহাক ব্যবসার সুবিধাতে ১৯৭৮ সালে পটিয়া থেকে চট্টগ্রাম শহরে চলে যান। আইয়ুব বাচ্চুর পিতা দুই বিয়ে করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে আইয়ুব বাচ্চু প্রথম ঘরের প্রথম সন্তান এবং দ্বিতীয় ঘরে ৩ মেয়ে ও ১ পুত্র সন্তান রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর মুসলিম হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন আইয়ুব বাচ্চু। তারা দীর্ঘদিন ধরে এনায়েত বাজার এলাকায় থাকতেন। পরবর্তীতে গিটার ও ব্যান্ড শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বশেষ পটিয়ায় এসেছিল ২০০৭ সালে ৯ ডিসেম্বর। পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে টিআইবির উদ্যোগে আয়োজিত দুর্নীতিবিরোধী কর্মসমাবেশ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশ করেন। ওই সময় নিজেকে পটিয়ার সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করে বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তার পরিচয় দিয়েছেন। তবে গ্রামের বাড়ি খরনা ইউনিয়নে তিনি যাননি। আইয়ুব বাচ্চুর দাদা ছিলেন হাজী নুরুজ্জামান সওদাগর। তিনি পটিয়ার খুব পরিচিত ব্যবসায়ীও ছিলেন। তাদের পৈতৃক ভিটে বাড়ি ছাড়াও এলাকায় বেশ জায়গা জমিও রয়েছে। দাদা নুরুজ্জামানের নামে উপজেলার মুজাফরাবাদ এলাকায় এনজে উচ্চ বিদ্যালয় নামে একটি বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। গ্রামবাসী দীর্ঘদিন ওই স্কুলটি সরকারীকরণের দাবি জানিয়ে আসছিল। মূলত উপজেলার খরনা গ্রামটি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আরকান মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে হলেও পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু তাদের গ্রামের বাড়িতে যেতেন না। আইয়ুব বাচ্চুর বাবা এখনও বেঁচে আছেন।