১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনন্য দলিল

  • সঞ্জয় সরকার

আঞ্চলিক ইতিহাস বলতে আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের অতীত চর্চাকেই বুঝি। এটি ইতিহাস চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং জাতীয় ইতিহাসেরই অংশ। আঞ্চলিক ইতিহাসের যত বেশি চর্চা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ হয়Ñ একটি দেশ বা জাতির ইতিহাসও তত বেশি সমৃদ্ধ হয়। সাগরে ডুব দিয়ে ডুবুরি যেমন সম্পদ আহরণ করেনÑ ইতিহাস সংগ্রাহকরাও তেমনি অনাবিষ্কৃৃত অথচ সত্য গল্পের সন্ধান করে পাঠকের সামনে হাজির করেন। সামগ্রিক ইতিহাস চর্চায় একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অনেক তথ্য ও বিশ্লেষণ উপেক্ষিত থেকে যায়Ñ যা আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় নিখুঁতভাবে প্রকাশ পায়।

সীমিত পরিসরে হলেও আমাদের দেশে আঞ্চলিক ইতিহাসের চর্চা অব্যাহত আছে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব সত্ত্বেও বেশ কিছু গবেষক ও সংগ্রাহক নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সন্ধানে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। এদেরই একজন মু আ লতিফ। চার দশক ধরে সাংবাদিকতার পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংগ্রহের কাজ করে চলেছেন তিনি। রচনা করেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই। চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রকাশিত হয়েছে তার ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য’ বইটির তৃতীয় সংস্করণ। একটি বইয়ের একাধিক সংস্করণ তখনই হয়Ñ যখন বইটি পাঠকপ্রিয় হয়।

কাজেই কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য বইটিও যে পাঠকমহলে বেশ সমাদৃতÑ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এবারের সংস্করণটি আগের দুটি সংস্করণের চেয়েও অনেক বেশি পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত। বেশ কিছু নতুন বিষয়ও সংযুক্ত হয়েছে বইটিতে। ৩শ’ ৭৬ পৃষ্ঠার এ বইটি প্রকাশ করেছে উজান প্রকাশন। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।

কিশোরগঞ্জের সাধারণ ইতিহাস দিয়ে শুরু হয়েছে বইটির বিষয়সূচী। এরপর ধারাবাহিকভাবে স্থান পেয়েছে- জেলার জনসমাজ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, কিশোরগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নামকরণের উৎস, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির ও আখড়া প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ইতিহাস, নরসুন্দ নদীর গতি-প্রকৃতি ও বৈচিত্র্য, ইতিহাসের স্মারক রথখোলা ময়দান, পাবলিক লাইব্রেরি ও সদর হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, ঈসা খাঁর জন্ম ও বাল্যকালের বর্ণনা, ঈসা খাঁ-মান সিংহের যুদ্ধ, ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত জঙ্গলবাড়ি ও এগার সিন্দুর দুর্গ, বারভূঁইয়াদের বর্ণনা, শ্রী চৈতন্য দেবের কিশোরগঞ্জে আগমনের ইতিহাস, মসুয়ার রায় পরিবারের বর্ণনা, বাংলার প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীর ইতিহাস, দেওয়ান-জমিদারদের ইতিহাস, কিশোরগঞ্জের রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার নেপথ্য কথা, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা, লোকশিল্প, মেলা, অর্থনীতির ক্রমবিকাশ, শিল্প কারখানার ইতিহাস, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সঙ্গীত ও ক্রীড়াঙ্গন প্রভৃতি। এসব উপাদান-অনুষঙ্গের শুধু বর্ণনাই করেননি মু আ লতিফ, নতুন নতুন তথ্যের প্রমাণস্বরূপ তুলে ধরেছেন প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজও।

এ জন্য বেশ পরিশ্রম স্বীকার করেছেন তিনি। ঘিরে রচিত হলেও প্রসঙ্গক্রমে বইটিতে গোটা পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলই উঠে এসেছে। এর কারণ, ১৯৮৪ সালের আগে অঞ্চলটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলারই অন্তর্গত ছিল। তাই বইটি পাঠের পর শুধু কিশোরগঞ্জের পাঠকরাই নন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঠকমাত্রই সমৃদ্ধ হবেন। আর যারা জাতীয় ইতিহাসের চর্চা করেনÑ তাদেরও রসদ জোগাবে বইটি। অজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবেন নতুন প্রজন্মের পাঠকরাও।