১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তাম্বুল রস!

অধরসিক্ত হয় তাম্বুল রসে। লালে লাল হয়ে যায় ঠোঁট। পানাভ্যাসের ইতিহাস অতি প্রাচীন বলেই বাংলার গ্রামাঞ্চলে আজও তার অবস্থান অদ্বিতীয়। অতিথি আপ্যায়নে তার ব্যবহারও প্রাচীন কালেরই। মধ্যযুগের কাব্যেও তার উল্লেখ মেলে। আধুনিককালে কাব্যে না হোক গানে তার বিচরণ বেশ সুমধুর। ‘বহদ্দারহাটের পানখিলি বানাইয়া খাওয়াইতাম।’ কিংবা ‘পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম’Ñ গানের বিস্তার এখনও শহর-নগর-গঞ্জ গ্রামে ধ্বনিত হয়। পানের অপর নাম তাম্বুল। একটি পাতা মাত্র। কিন্তু তার চাহিদা ও গুণপনা অত্যধিক। সেই পানের হাল-হকিকত এখন বেশ সুবিধের নয় বলেই বিদেশে বাজার হারাতে হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ক’বছর ধরে এদেশের পান আমদানি করছে না। অনেক চেষ্টা-তদবির করেও বিষয়টির সমাধান করা যায়নি। এবার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সৌদি আরব। ইইউ ও সৌদির ভাষ্য, বাংলাদেশের পানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ‘স্যালমোনোসা’ পাওয়া গেছে। অথচ কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি সম্পর্কে যেমন উদাসীন, তেমনি অবহেলাও করে আসছে। কার্যকর কোন পদক্ষেপই নেয়নি। ২০১১ সাল হতে বাংলাদেশের পানের কয়েকটি চালানে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পায় যুক্তরাজ্য। ইইউভুক্ত অন্য কয়েকটি দেশেও পানের চালানে এই ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব মেলে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ থেকে পান আমদানির ওপর ইইউ জারি করে নিষেধাজ্ঞা। এরপর বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েক দফা পত্র পাঠিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শও দেয় ইইউ। সেই পরামর্শ মানা না হলে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো হবে, এমন সতর্কতা জারির পরও হুঁশ হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। উল্টো রফতানি নিষেধাজ্ঞার পরও ইউরোপের দেশগুলোতে অন্তত নয়টি পানের চালান যাওয়ার প্রমাণ পায় ইইউ। এসব কারণে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

পান বাংলাদেশের একটি অন্যতম রফতানি পণ্য। এর মধ্যে অর্ধেকই যায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। পানের জন্য আলাদা কোন কোড না থাকায় তা রফতানি হয় ফুল ও পাতা কোডের আওতায়। এই খাতে রফতানির নব্বই শতাংশই হচ্ছে পান। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তিন কোটি ৯৩ লাখ ডলার পান রফতানি হয়। এর আগে ২০১২-১৩ সালে চার কোটি ১৪ লাখ, ২০১১-১২ সালে পাঁচ কোটি চার লাখ ডলারের রফতানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দু’মাসে পানসহ এই খাতের পণ্য রফতানি হয়েছে মাত্র ৯৬ হাজার ১২৬ ডলারের। সৌদি আরবে পানের চাহিদা অত্যধিক। বাংলাদেশ পান রফতানি অব্যাহত রাখতে না পারলে তারা অন্যদেশ থেকে আমদানি বাড়াবে। বাংলাদেশ হারাবে পানের বৃহৎ বাজার। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা পানে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি রাসায়নিক পাওয়া গেছে। পরবর্তী কোন চালানের পানে এ ধরনের রাসায়নিক পাওয়া গেলে পান আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। এ অভিযোগ পাওয়ার পর গত দু’মাসে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেবলমাত্র অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একটি সভা। যেখানে সমাধানের লক্ষ্যে চারটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সেসব বাস্তবায়নে কোন কাজ এখনও শুরুই হয়নি। কৃষি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িতরা অবশ্য বলছেন, সৌদি আরব বাংলাদেশের পানের মান নিয়ে যেসব প্রশ্নে তুলেছে তা স্বল্প সময়ে নির্ণয় করা এবং উৎপাদন পর্যায়ে ত্বরিত সমাধান করার সক্ষমতা অত্যন্ত কম। নতুনভাবে পান চাষ করে পরবর্তী সময়ে পাঠানোর মতো সময় বা সুযোগ নেই। ফলে রফতানি বন্ধের আশঙ্কা বাড়ছে।

শুধু পান নয়, সবজি রফতানিও হ্রাস পাচ্ছে। ইইউ পানের পাশাপাশি শশা, বেগুনও ক্রয় করত, এখন তারা এসব অন্যদেশ থেকে কেনে। আবার যথাযথ মান নিশ্চিত না করায় সৌদি আরব গত এপ্রিল হতে বাংলাদেশ থেকে হালাল মাংস আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেল।

বিষয়গুলো বাংলাদেশের পান ও শাকসবজি এবং মাংস রফতানির জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। অর্থনীতিতে পড়ে ক্ষতিকর প্রভাব। বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।