১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লাখো ভক্তের চোখের জলে কবরে শায়িত হলেন আইয়ুব বাচ্চু

লাখো ভক্তের চোখের জলে কবরে শায়িত হলেন আইয়ুব বাচ্চু
  • চট্টগ্রামে তার নামে রাস্তা হবে- মেয়র

হাসান নাসির, চট্টগ্রাম অফিস ॥ জন্মশহর চট্টগ্রামের লাখো মানুষ অশ্রুভেজা চোখে চিরবিদায় জানাল তাদের কৃতী সন্তানকে। শনিবার সন্ধ্যায় মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন দেশের কিংবদন্তি রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু। সেই রুপালি গিটার আর বাজবে না। দরাজকণ্ঠে সঙ্গীত নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো এই মানুষটি আর চট্টগ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবেন না। শেষ ঠিকানা বন্দরনগরীর চৈতন্যগলি কবরস্থান।

আইয়ুব বাচ্চু। গিটার এবং ভরাটকণ্ঠের জন্য দুই বাংলার অতি পরিচিত একটি নাম। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই হয়েছে জনসমুদ্র। মৃত্যুতেও ব্যতিক্রম হয়নি। লাখো মানুষের সমাগম ঘটে বন্দরনগরীর সুবিশাল জমিয়তুল ফালাহ ময়দান ও পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায়। অন্য সময়ের সমাবেশগুলো যেখানে ছিল গিটারের শব্দে উদ্দাম, সেখানে শনিবার বিকেলের সমাগম ছিল নিস্তব্ধ, ভাবগম্ভীর। বাচ্চুর গান শুনে যারা মুখর হতেন তুমুল করতালিতে, এদিন তারা ছিলেন একেবারেই বাকরুদ্ধ। প্রিয় কণ্ঠশিল্পী আর নেই, আর শোনা যাবে না তার গান। তারা সকলেই সমবেত হন ভালবাসার মানুষটিকে এক নজর দেখতে এবং বিদায় জানাতে।

চট্টগ্রাম নগরীর একটি অংশ যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল আইয়ুব বাচ্চুকে চিরবিদায়ের সময়টিতে। জমিয়তুল ফালাহ মাঠ এবং পাশের সড়কে শুধু মানুষ আর মানুষ। সকালে যখন বিমানবন্দর থেকে মরদেহ আনা হয় নগরীর পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় তার নানার বাড়িতে, সেখানেও লোকে লোকারণ্য। চারপাশের কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে পরিলক্ষিত হয় জনস্রোত। সেখানেও আবেগাপ্লুত ভক্তদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে। এই মাদারবাড়িতে আইয়ুব বাচ্চু কাটিয়েছিলেন তার ছেলেবেলা। নিজের বাসা ছিল এনায়েত বাজার জুবিলী রোডে। সেখানে মাকে নিয়ে কেটেছে তার কৈশোর ও যৌবন। প্রিয় মানুষটির অকাল মৃত্যুর সংবাদ যেন স্তব্ধ করে দেয় চট্টগ্রামকে। একজন শিল্পীর শেষ বিদায় এবং জানাজায় এত লোক সমাগম হতে পারে তা অকল্পনীয়। কোন রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, যারা এসেছেন তারা সকলেই ভালবাসার মানুষ। এই মানুষগুলোকে গিটার ও গানের সুরে আনন্দ দিয়েছিলেন বাচ্চু। সে কারণে স্রোতটাও ছিল বাঁধভাঙ্গা।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ বহনকারী ইউএস বাংলার ফ্লাইট। এতে ছিলেন তার পুত্র আনাফ তাজোয়াব আইয়ুব, কন্যা ফাইরুজ সাফরা আইয়ুব ও স্বজনরা। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। সেখান থেকে কালো ব্যানারে ঢাকা লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সটি বেলা ১২টার দিকে এসে পৌঁছায় পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় নানার বাড়িতে। বেলা প্রায় ২টা পর্যন্ত সেখানে রাখা হয়। মরদেহটি কিছুক্ষণের জন্য ঘরে উঠিয়ে রাখেন মামা আবদুল আলিম। আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ আসছে, এটা আগে থেকেই প্রচারিত ছিল। সে কারণে অনেক মানুষ তার দেহ পৌঁছানোর পূর্বেই সেখানে জড়ো হতে থাকে। প্রায় ২ ঘণ্টা রাখা হয় সেখানে। এক নজর দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তদের ভিড় ক্রমেই বাড়তে থাকে। চারপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় এক পর্যায়ে এত ভিড় জমে যায় যে, শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে বেগ পেতে হয়। এরপর বেলা আড়াইটার দিকে মরদেহ নিয়ে আসা হয় জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে। সেখানে কালো কাপড়ে ঘেরা মঞ্চের সামনে রাখা হয় মরদেহ। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পড়ে যায় ভক্তদের দীর্ঘ লাইন। জমিয়তুল ফালাহ মাঠের মূল প্রবেশ পথে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে প্রচুরসংখ্যক পুলিশ। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাপও বৃদ্ধি পায়। এক পর্যায়ে মাঠ ভরে যায়। মানুষের চাপ সামলে নেয়ার জন্য কিছুক্ষণের জন্য উত্তর পাশের গেট বন্ধ করা হয়। এরপর পাশের সড়কেও জড়ো হয় মানুষ। অনেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

জমিয়তুল ফালাহ এবং পশ্চিম মাদারবাড়ি, দুটি স্থানেই আইয়ুব বাচ্চুর ভক্তদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন তার পুত্র আনাফ তাজোয়ার আইয়ুব। তিনি এত মানুষের সমাগম দেখে আবেগে আপ্লুত হন। কয়েক লাইনের বক্তব্যে তিনি তার পিতার স্মৃতিচারণ করেন। পাশাপাশি বলেন, আমার বাবা মানুষকে ভালবাসতেন। দেশকে ভালবাসতেন। যদি অনবধানবশত কোন দোষ করে থাকেন বা কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন তাহলে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। বাদ আছর নামাজে জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নগরীর স্টেশন রোড সংলগ্ন চৈতন্যগলি বাইশ মহল্লা কবরস্থানে। সেখানে মমতাময়ী মায়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এটাই ছিল তার শেষ ইচ্ছা।

আইয়ুব বাচ্চুর নামে সড়ক ও ভাস্কর্য ॥ দেশের অন্যতম সেরা রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু চট্টগ্রামের সন্তান। এখানেই বেড়ে ওঠেছেন তিনি। গান গেয়েছেন নগরীর পাড়া-মহল্লায়। স্মৃতিকে ধরে রাখতে আইয়ুব বাচ্চুর নামে নগরীতে একটি সড়কের নামকরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি এই ইচ্ছার কথা জানান। জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে বক্তব্যে তিনি নগরীর কোন স্থানে একটি আবক্ষমূর্তি গড়ার ইচ্ছের কথাও ব্যক্ত করেন। মেয়র বলেন, আইয়ুব বাচ্চু এই দেশকে এবং চট্টগ্রামকে ভালবাসতেন। এত মানুষের সমাগম এই শিল্পীর প্রতি ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। তার স্মৃতি ধরে রাখতেই হবে। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ আলম, চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মোঃ মাহাবুবুর রহমান, আইয়ুব বাচ্চুর বাবা মোঃ ইসহাকসহ দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ। শ্রদ্ধা জানান কণ্ঠশিল্পী পার্থ বড়ুয়া এবং বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। আইয়ুব বাচ্চুর চট্টগ্রামের সঙ্গীত অঙ্গনে যে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা সাংস্কৃতিক জগতের মানুষদের অভিব্যক্তিতেই পরিষ্কার।

সেই ৬০টি গিটার ॥ গিটার ছাড়া আইয়ুব বাচ্চুর অবয়ব কল্পনা করাও কঠিন। তিনি যেখানেই গেছেন সঙ্গে গিটার বহন করতে ভুল করেননি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গেলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে তার প্রথম পছন্দের জিনিস গিটার। এই গিটার নিয়েই যেন তার জীবন। গিটার সংগ্রহ করা তার একটি শখও ছিল। অনেকগুলো গিটার জমা হয়ে যায় তার। এক পর্যায়ে ৬০টি গিটার তিনি নিলামে তোলার চিন্তা ভাবনা করেছিলেন। বাচ্চুর মামা আবদুল আলিম জানান, পরে সেই নিলামের পরিকল্পনা বাতিল করে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বাচ্চুর মামা জানান, এ বিষয়ে চবি উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছিল। কিন্তু এখনও তা হয়ে ওঠেনি। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গিটারগুলো হস্তান্তর করা হবে বলে তিনি জানান।

গানেই তার অমরত্ব ॥ আইয়ুব বাচ্চুকে যারা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন অনেক তরুণ কণ্ঠশিল্পী। তেমনই একজন ‘মাইনর প্ল্যানেট’ ব্যান্ডের ভোকাল সাগর। তিনি বলেন, আইয়ুব বাচ্চু আমাদের অনুপ্রেরণা। এ ধরনের শিল্পীদের দেখেই আমরা সঙ্গীতে অনুরাগী হয়েছি। স্মৃতিরক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জানান, মহান এই শিল্পীর অনেকগুলো গান অমরত্ব পেয়েছে বলে মনে করি। এই গানগুলো অনেক বছর বাজতে থাকবে। যতদিন তার গান বাজবে ততদিন তিনিও বেঁচে থাকবেন। গানগুলোই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

চট্টগ্রাম থেকেই মূলত দেশে বিস্তার লাভ করেছে ব্যান্ড সঙ্গীত। সেই সত্তরের দশকে একঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ রকসঙ্গীতের দিকে ধাবিত হয়। তাদেরই একজন আইয়ুব বাচ্চু। বর্তমানে যারা সঙ্গীতাঙ্গনে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে রয়েছেন, সেই তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, জেমস, নকিব খান, পার্থ বড়ুয়াÑতাদের সকলেরই যাত্রা শুরু চট্টগ্রাম থেকে। নগর বাউলখ্যাত জেমসের বাড়ি চট্টগ্রামে না হলেও বাবার চাকরির সুবাদে তারই সঙ্গীত জগতে পদার্পণ এই চট্টগ্রামেই। তবে এই শিল্পীদের এই পর্যায়ে আসার পথ এখনকার মতো মসৃণ ছিল না। তন্মধ্যে আইয়ুব বাচ্চুর জীবন সংগ্রাম ছিল খুবই কঠিন। শুধু ইচ্ছা এবং একাগ্রতার কারণেই তিনি এ পর্যায়ে উঠেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বিয়ে ও হলুদের রাতে গান করেছেন। সেই কারণে এই মানুষটিকে নগরবাসী খুব কাছে থেকে দেখেছে। রাজধানীতেও তার তিন দফা জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। মৃত্যুর পর মানুষের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ যেভাবে হয়েছে, তা একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা। আর কোন কণ্ঠশিল্পীর মৃত্যু গণমাধ্যমে এতটা কভারেজ বা মানুষের সম্মান পেয়েছে, নিকট অতীতে এমন রেকর্ড আর নেই।

আইয়ুব বাচ্চু একই সঙ্গে ছিলেন সুরকার ও গীতিকার। তার লেখা কয়েকটি গান কালজয়ী হয়ে থাকবে। গীতিকারের গানে উঠে আসে নিজের জীবনের প্রতিফলনও। বাচ্চু লিখেছেন, ‘সুখেরই পৃথিবী, সুখেরই অভিনয়/যতই আড়ালে রাখো, আসলে কেউ সুখী নয়।’ সদা প্রাণবন্ত আইয়ুব বাচ্চু তার ভক্তদের কিছুই বুঝতে দেননি। এই সমাজ ব্যবস্থায় তিনি নিজে কতটা সুখী ছিলেন তা প্রশ্ন হয়ে রইল।