১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ও ঐক্যফ্রন্টের বাগাড়ম্বর

  • জাফর ওয়াজেদ

জাতীয় সংসদকে অস্থিতিশীল শুধু নয়, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে জটিলতা বাড়াতে দাবি তোলা হয়েছে। সাতদফা দাবির বাইরে যে এগারো দফা লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার দ্বিতীয় ধারাতেই এমন বিভ্রান্তিকর দাবিটি উল্লেখ করা হয়েছে বেশ চতুরতার সঙ্গেই, বলা যায়। বলা হয়েছে, ৭০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের যুগোপযোগী সংশোধন করা। সংবিধান সংশোধন করা নতুন কিছু নয়। সংবিধানের মূল ভিত্তি ঠিক রেখে পরিমার্জন, পরিবর্ধন, পরিবর্তন করা স্বাভাবিক পন্থা হিসেবেই বিবেচিত। সময়ের চাহিদানুযায়ী সংশোধন আনাও হয়ে আসছে। অবশ্য এদেশে অতীতে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা শাসকরা সামরিক আদেশ জারি করে সংবিধানকে ইচ্ছেমতো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য কাটাছেঁড়া কম করেনি। তারা সংবিধানের মূল ভিত্তিকে পর্যন্ত বদলে ফেলেছিল।

সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রীমকোর্ট তো সামরিক শাসকদের আনা পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায়ও দিয়েছিল। বাহাত্তর সালে প্রণীত সংবিধানটি আর অক্ষত নেই। কিন্তু ওই সংবিধানে বিদ্যমান ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল যৌক্তিক না অযৌক্তিক, সে নিয়ে নানান বাহাস হয়ে আসছে। সংবিধানে এই অনুচ্ছেদ সংযোজনের কাজে যিনি জড়িত ছিলেন তিনিই আজ তা বাতিলের জন্য সোচ্চার কণ্ঠ। সেদিন অনুচ্ছেদটি সংযোজনের জন্য যে যুক্তি দেখানো হয়েছিল এবং যা ছিল বাস্তবসম্মত, আজ তা বাতিলের জন্য কেন উঠে পড়ে লেগেছেন, তার মাজেজা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান প্রণীত হয় সংসদ সদস্য তথা গণপরিষদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমেও তখন তিনি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী। দায়িত্বটা তার ওপরই বর্তেছিল সংসদে সংবিধান পেশের। তখন তার একবারও কি মনে হয়নি যে, এই অনুচ্ছেদটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরোধী! তখন হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু এতকাল পরে এসে সেই তিনিই যখন হাঁক পাড়েন অনুচ্ছেদ বদলে দাও, তখন নানা প্রশ্ন সামনে আসবেই। যে খোঁড়া যুক্তি তিনি আজ প্রদর্শন করছেন, তা বাস্তবতাবিবর্জিত এবং সংসদীয় গণতন্ত্র ও সরকার ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার মোক্ষম বাণ বৈকি! তা না বোঝার কোন কারণ নেই। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আদালত গোড়ার দিকে ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতার প্রশ্নে বিভক্ত আদেশ জারি করলেও পরে তা খারিজ করে দেয়। কি রয়েছে ৭০ অনুচ্ছেদে, যাকে নিয়ে কথিত সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে সুবিধাভোগী ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতিকরা মাঝে মধ্যে সোচ্চার হন। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি-

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’ দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবেন না এমন বিধান নেই। তবে তাতে তার আসন শূন্য হবে। আর দলীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারবেন না, এমন নয়। কেবল ভোটদান করা যাবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়Ñ জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রথমসারির সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরাও অর্থমন্ত্রীর প্রতি জোরালো বাক্যবাণ ছুড়েছিলেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকেও রেহাই পাননি মন্ত্রী। এমনকি সংসদ সদস্যরা তার পদত্যাগও দাবি করে বসেছিলেন। এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে একই দলের সংসদ সদস্যরাও তাদের নিজস্ব ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন অবলীলায়। জনগণের স্বার্থ যেখানে জড়িত সেখানে স্পীকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অনেক সংসদ সদস্য ভ্যাট আইন বাতিলের বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। বাজেট পাসের আগে অর্থমন্ত্রীকে তা বাতিল করতে হয়েছিল। এই অধিবেশন স্পষ্ট করেছিল, সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন অধিবেশনে। নিজস্ব মতামত তুলে ধরার ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের, তবে ক্ষেত্রবিশেষে চিত্র অন্যরকম হতে পারে। বিশেষ কোন বিষয়ে ভোটদানের ক্ষেত্রে সংসদীয় দলের আলোচনায় ওঠে আসা সিদ্ধান্তকেই প্রাধান্য দিতে হয়। এক্ষেত্রে সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই সংসদীয় দলে তাদের মতামত প্রকাশ করে থাকেন। সেই মতামতের ভিত্তিতে সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। যা অধিবেশনে প্রতিফলিত হয়। আবার বিল পাসের ক্ষেত্রেও সংশোধনী উত্থাপন করে থাকেন দলীয় সদস্যরা। যে জন্য তাদের সদস্য পদ বাতিল হয় না।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানে যেভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে, অদ্যাবধি সেভাবেই রয়েছে। এ অনুচ্ছেদের যৌক্তিকতা নিয়ে অতীতে কোন সরকার বা সংসদে প্রশ্ন ওঠেনি। জনগণও প্রশ্ন তোলেননি। ৭০ অনুচ্ছেদের অপব্যবহার হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও নেই। অথচ সুশীলরা বিভ্রান্তিকর ভাষ্য দিয়ে আসছেন, যা নব্যগঠিত ঐক্যফ্রন্টও বলছে। তাদের মতে, সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না। এখানে তারা স্বাধীন নন। তারা নিজ দলের কাছে পরাধীন। তারা স্বাধীনভাবে কোন মতামত দিতে পারেন না। সংসদে কোন গণবিরোধী আইন পাস হলেও সেখানে তারা নিজ দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য। কিন্তু সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি। দল যা বলবে তারা তাই করবেÑ এমন কোন কারণে জনগণ তাদের ম্যান্ডেট দেয়নি। জনগণ ম্যান্ডেট দিয়েছেনÑ যাতে স্বাধীনভাবে তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন, জনস্বার্থে কাজ করেন। এখানে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সব ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছে রাজনৈতিক দল, জনগণ নয়। এসব কারণে এটা সংবিধানের সাত অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেমন সাংঘর্ষিক ১১ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও। এই অনুচ্ছেদ গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে অন্তরায়। এটি অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের এই ভাষ্য অনুচ্ছেদের মূল ‘স্পিরিট’কে এড়িয়ে একটি বায়বীয় রূপকল্প স্থাপনের নামান্তর। বাস্তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা নয়। সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ নিজ দলীয় বিজয়ী সদস্যদের নিয়ে সংসদীয় দল বা গ্রুপ গঠন করে থাকে। যেখানে সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে তাদের ভূমিকা কি হবে, আইন পাসের ক্ষেত্রে কী ধরনের বক্তব্য প্রদান করা হবে, তাও নির্ধারণ করা হয়। কোন্ ইস্যুতে কোন্ সদস্য বক্তব্য প্রদান করবেন, চীফ হুইপ তা নির্ধারণ করে স্পীকারের কাছে তালিকা পেশ করেন। সে অনুযায়ী এমপিরা তাদের বক্তব্য পেশ করে থাকেন। দলের রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকারের আলোকেই তারা অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন যা রাজনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য।

প্রতিটি সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সামনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরে। নির্বাচিত হলে এবং সরকার গঠন করা গেলে এই ইশতেহার বা অঙ্গীকার পূরণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তারা জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন। ভোটাররা তো স্রেফ ব্যক্তিকে নয়, দল এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বিবেচনা করেই তবে ভোটদান করেন। একটি দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী জনগণের কাছে যখন যান ভোট চাইতে, তিনি তখন তার দলের ইশতেহারে বর্ণিত বিষয়গুলোই তুলে ধরেন। ক্ষমতায় গেলে দেশ ও জনগণের জন্য কি কি দায়িত্ব পালন করা হবে, তার ফিরিস্তি ও ব্যাখ্যা প্রদান করেন। জনগণ যদি তাতে সন্তুষ্ট হন, তবে সেই দলের প্রার্থীকেই ভোট দেন। প্রার্থীর ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা ও মতামতকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়ার সুযোগ সীমিত। এই মতপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদীয় দলের বৈঠকে। সেখানে তা গৃহীত হলে, তবে সংসদের বলার সুযোগ মেলে। কিন্তু সংসদীয় দলের বৈঠকে মতামত তুলে না ধরে, সংসদে দলবিরোধী অবস্থান গ্রহণ তো শৃঙ্খলা পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়। এটা তো সত্য যে, রাজনৈতিক দল কোন ক্লাব বা সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়, স্বার্থ বিতরণের স্থানও নয়, আর আদর্শহীন তো নয়ই। রাজনৈতিক দলের রয়েছে নিজস্ব আদর্শ, উদ্দেশ্য। সেই আদর্শকে মেনে এবং তার বাস্তবায়নের অঙ্গীকারই একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীর প্রধান ব্রত। এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য তার লড়াই-সংগ্রাম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ। ভোটাররাও দলগুলোর আদর্শ ও লক্ষ্য বিবেচনা করেই একটি দলকে তাদের মনঃপূত মনে করে থাকেন। অধিকাংশ ভোটার সেই পছন্দই দলের প্রার্থীকে ভোটদান করে থাকেন। স্রেফ প্রার্থীকে পছন্দ করে ভোট দেন, এমন ভোটারও রয়েছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর প্রার্থীরা দলীয়ভাবে শপথও গ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু দলীয় এমপিদের ৬ দফা ও স্বাধিকারের পক্ষে অটুট থাকার শপথ বাক্যও পাঠ করান। যুদ্ধকালে সেই সাংসদরা সংসদীয় দলের বৈঠক করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সত্তরের সব নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিল বাংলাদেশ গণপরিষদ। এই পরিষদই অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করে এবং ১৯৭২ সালের ৪ নবেম্বর সংসদে তা গৃহীত হয়। ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। এই সংবিধানেই ৭০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত হয়। যা আজও বহাল রয়েছে অবিকৃতভাবে। পদত্যাগ বা বিপক্ষে ভোটদান ছাড়া সংসদে নিজস্ব মতামত উপস্থাপন এই অনুচ্ছেদভুক্ত নয়। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কী করে বিঘিœত হতে পারে, তার কোন ব্যাখ্যা ঐক্যফ্রন্ট নেতা প্রদান করেননি। নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত সংসদীয় দলে গৃহীত হওয়ার পর সংসদে এর বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখা কোনভাবেই সঙ্গত নয়। কারণ নিজস্ব মতামত তুলে ধরার ফোরাম সংসদীয় দল। সুতরাং সেখানেই তা পেশ করাই যথাযথ ও বাঞ্ছনীয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে গৃহীত সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়েছিল। এতে বলা হয়, যদি কোন সাংসদ, যে দল নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত করেছে, সে দলের নির্দেশ অমান্য করে (ক) সংসদে উপস্থিত থেকে ভোট দানে বিরত থাকেন, অথবা (খ) সংসদের কোন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন; তাহলে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেছেন বলে গণ্য হবেন। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকার সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী আনে। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এই সংশোধনীতে ৭০ অনুচ্ছেদে আরও দুটি ব্যাখ্যা সংযোজন করা হয়। প্রথমত, কোন সময় কোন রাজনৈতিক দলের সংসদীয় দলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে এবং স্পীকার বিভক্তি ভোটের দ্বারা উক্ত দলের নেতৃত্ব নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিলে, কোন সংসদ সদস্য ভোটদানের ব্যাপারে এরূপ নির্ধারিত নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করলে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং সংসদে তার আসন শূন্য হবে। অপরটি হচ্ছে, কোন ব্যক্তি নির্দলীয় প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কোন রাজনৈতিক দলে যোগদান করলে তিনি উক্ত দলের প্রার্থীরূপে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন। আওয়ামী লীগের ২০০৯-১৩ সালের মহাজোট সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দ্বাদশ সংশোধনী পর্যন্ত সংশোদিত ৭০ অনুচ্ছেদটি মূল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, আবার ক্ষমতাসীন সরকার এই অনুচ্ছেদে নতুন করে কোন কিছুই সংযোজন করেনি।

পাকিস্তান যুগের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে বাহাত্তর সালের সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তানে তখন সকালে এক সরকার, বিকেলে আরেক সরকার হতো। লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে তখন সংসদ সদস্যরা বেচাকেনা হতেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে স্বাধীন দেশে এ অনুচ্ছেদটি অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে দেখা গেছে, বিধানসভার কংগ্রেস সদস্যরা প্রথমে তৃণমূলে যোগ দেয় এবং পরে বিজেপিতে। ফলে বিধানসভা কংগ্রেসশূন্য হয়ে পড়ে। এখানেও কেনাবেচার ঘটনা রয়েছে। সাংসদরা বেচাকেনার শিকার হয় বলে উত্তর প্রদেশে নির্বাচিত বিরোধী সদস্যদের হোটেলে আটকে রাখা হয়েছিল দলের পক্ষ থেকে। যাতে দলবদল করতে না পারে। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, একটি দলের মনোনয়ন নিয়ে সেই দলের আদর্শ ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি আনুগত্য জানিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে দলবিরোধী অবস্থান গ্রহণ কতটা নীতিসঙ্গত। রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে দলীয় নেতারা নিশ্চয় ভিন্নমত তুলে ধরেন না। দলীয় মতাদর্শকে সামনে রেখে বক্তৃতা করেন। একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেতারা যদি ভিন্ন মতামত প্রকাশ করেন, তবে দলীয় শৃঙ্খলা থাকে কোথায়। দলীয় আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিল করা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রোতারাও হবেন বিভ্রান্ত। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বিএনপি দলীয় প্রায় ৬০ জন সাংসদ দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আবদুল জলিলের ৩০ এপ্রিলের ট্রামকার্ড ছিল তারই নমুনা। কামাল হোসেন এবং তার সৃষ্ট ঐক্যফ্রন্ট ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে কি উদ্দেশ্য হাসিল করতে চান? সরকার পতন, সরকার গড়া, দলীয় ইশতেহার বাস্তবায়নে বিঘœ ঘটানোর অসৎ উদ্দেশ্য যে এক্ষেত্রে কাজ করছে, তাতো স্পষ্ট। তাই তারা বাগাড়ম্বর করছেন মতপ্রকাশের জজবা তুলে। ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল তখনই সম্ভব, যখন সংসদীয় গণতন্ত্র বিকশিত হবে, মানসিকতায় আসবে পরিবর্তন। নতুবা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির ঘটবে বিস্তৃতি। ব্যক্তিস্বার্থে সাংসদদের ডিগবাজি বন্ধে এই অনুচ্ছেদ সতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করুক, তা কামাল হোসেন চাইছেন না। অস্থিতিশীলতা যত হবে, গণতন্ত্র তত নাজুক হবে। কামালদের বাগাড়ম্বর গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিকাশের জন্য নয়, ধ্বংসের জন্য।

নির্বাচিত সংবাদ