১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জট খোলা নিয়ে সংশয়

  • মিয়ানমার প্রতিনিধি দল আসছে ২৮ অক্টোবর

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥‘মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তচ্যুত নাগরিক’- এ নামেই বাংলাদেশ সরকার বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচয়পত্র দেয়া হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর সংস্থার উদ্যোগে একই শিরোনামে পরিবারভিত্তিক স্মার্ট কার্ড তৈরির কাজ চলছে।

বেসরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে যে জট সৃষ্টি হয়েছে সেটির অবসান হবে কি হবে না তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। তবে মিয়ানমার পক্ষ শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যাবাসনের ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে ৮ হাজার ৩২ রোহিঙ্গার একটি লিস্ট নিয়ে একমত হয়েছে। আগামী ২৮ অক্টোবর মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছে। যৌথ ওয়ার্কিং বৈঠকে এ দলটি অংশ নেবে এবং রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করবে। প্রতিনিধি দলের সফরকালে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বড় একটি তালিকা প্রদান করা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

ওপারের সূত্রগুলো জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যজুড়ে বাস্তচ্যুত মিয়ানমারের বসতিগুলোতে ইতোমধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে আদর্শ বৌদ্ধ পল্লী, সেনা ও পুলিশ ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থাপনা। যারা প্রত্যাবাসিত হবে তাদের রাখার জন্য এক ধরনের আশ্রয় শিবির তৈরির কাজও চলছে। কিছু নির্মিতও হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যেসব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়া হবে তাদের এ ধরনের আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হবে এবং তা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ পাড়ে আশ্রিত রোহিঙ্গারা নতুন করে বন্দী জীবন বলে আখ্যায়িত করছে। কেননা, ইতোপূর্বে রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে যাদের নেয়া হয়েছিল তাদের অনেকে এ ধরনের আশ্রয় ক্যাম্পে বছরের পর বছর অবস্থান করছে।

ফলশ্রুতিতে প্রত্যাবাসন বিষয়টি রোহিঙ্গাদের জন্য মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। কেননা, যারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইছে তারা নতুন করে বন্দী শিবিরের ন্যায় জীবনযাপন করতে হবে এ আশঙ্কায় আতঙ্কিত। আর বড় একটি অংশ চায় ইতোপূর্বে তাদের প্রদত্ত নাগরিকত্বসহ অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করে। এ অবস্থায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ কিভাবে দেখছে এবং এর শান্তিপূর্ণ সমাধান আদৌ আসবে কি না, এর পাশাপাশি রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে পূর্বের ন্যায় বসবাস করতে পারবে কি না সেটা নিয়ে নানা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

অনুরূপ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের একটি অংশ আশ্রিত ৩০ শিবিরে প্রত্যাবাসনবিরোধী তৎপরতা যে শুরু করেছে তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব সন্ত্রাসীর সংখ্যা শতাধিক। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে এমন একটি সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের জলদস্যু, কক্সবাজারের মহেশখালির ডাকাত, সন্ত্রাসী ও সাগর দস্যুদের যেভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়েছে, অনুরূপ পদ্ধতিতে ৩০ আশ্রয় শিবির এবং সংলগ্ন পাহাড়গুলোতে অবস্থানরত এসব রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের আত্মসমর্পণে আনা এখন সময়ের দাবি। কেননা, এরাই আশ্রয় শিবিরে হত্যা, গুম, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের বেআইনী কর্মকা-ে লিপ্ত রয়েছে। গত বছরের ২৭ আগস্ট থেকে এ বছর জানুয়ারি পর্যন্ত ঢালাওভাবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে যখন অনুপ্রবেশ করে তখন তাদের সঙ্গে এসব সন্ত্রাসীদেরও একটি অংশ এসেছে। যাদের রয়েছে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। ইতোমধ্যে এসব সন্ত্রাসীদের মধ্যে ২০ জনকে অস্ত্রসহ গ্রেফতারও করা হয়েছে। আশ্রয় শিবিরে কিছু রোহিঙ্গা যুবক নিজেদের আরসা সদস্য বলেও দাবি করে গোপনে। দলে ভেড়ানোর জন্য অন্যদের চেষ্টা চালায়। এরা মূলত শিবির সংলগ্ন জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে অবস্থান করে রাতের বেলায় প্রবেশ করে শিবিরে। এরা ঘন ঘন স্থান বদলায়। ভারি অস্ত্রের মজুদ রাখা হয়েছে গর্ত করে মাটির নিচে। ছোট আকৃতির অস্ত্র কোমরে বেঁধে রাতে শিবিরে চলাফেরা করে। ফলে প্রাণভয়ে আশ্রিত রোহিঙ্গারা কোন শব্দ করতে পারে না।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যত বিলম্বিত হচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা ততই তাদের অকর্ম বৃদ্ধি করছে। বিষয়টি শান্তিপ্রিয় রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রতিনিয়ত হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ৩০ আশ্রয় কেন্দ্র ও সংলগ্ন পাহাড়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অর্থাৎ যৌথ বাহিনী চিরুনি অভিযান চালালে এরা নিশ্চিতভাবে জালে আটকা পড়বে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। পাশাপাশি এর আগে তাদের আত্মসমর্পণের সুযোগও দেয়া যায়, যা ইতোমধ্যে সুন্দরবন ও মহেশখালিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, আগামীতে প্রত্যাবাসন শুরু হলে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদেও কোথায় এবং কিভাবে রাখবে সেটি তাদের বিষয় এবং এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এর ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ নিয়ে এদেশের করার কিছুই নেই। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের এ পর্যন্ত যে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে সেটাই তাদের জন্য বড় পাওয়া। তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে উখিয়া- টেকনাফ অঞ্চলে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে স্থানীয় লোকজন যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পরিবেশ যেভাবে কলুষিত হয়েছে তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় যে লাগবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোতে একটি প্রশ্ন বার বার দোল খাচ্ছে এবং সেটি হচ্ছে প্রত্যাবাসন আদৌ শুরু হচ্ছে কি না, শুরু হলে কত সংখ্যক তারা নিচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কত বছর পেরিয়ে যাবে ইত্যাদি নিয়ে।