১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজধানীর আশপাশে লাশের রহস্যময় ডাম্পিং জোন!

শংকর কুমার দে ॥ রাজধানীর আশপাশের এলাকায় লাশের ‘রহস্যময় ডাম্পিং জোন’ তৈরি করেছে ঘাতকরা। কারা ঘাতক, কবে-কোথায় খুন করা হলো, খুনের কারণ কি, খুন করে ঘাতকরা নির্বিঘেœ উধাও হয়ে যাচ্ছে কিভাবে, তদন্তে কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না-এসব অপহরণ, গুম, খুন ও লাশ উদ্ধারের ঘটনা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ভাঙ্গিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার আর নিখোঁজ থাকার পর মিলছে লাশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, এই ধরনের অপহরণ, গুম, খুনের ঘটনার সঙ্গে ডিবি, র‌্যাব, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত নয়। এক দিনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চার জন ও তুরাগে দুই জনসহ ছয়জন খুনের পর এসব লাশ উদ্ধারের ঘটনা নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কারা কি উদ্দেশে কোথায় তাদের খুন করা হলো এবং খুনের পর নির্বিঘেœ অন্যত্র ‘ডাম্পিং জোনে’ লাশ ফেলে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনার ধারাবাহিকতা যেন রীতিমতো রহস্যেঘেরা উপন্যাস। মাঝে মধ্যে হঠাৎ করে একইস্থানে একাধিক গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনা আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার জন্ম দিচ্ছে।

এ সব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তার দাবি। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আশপাশের নির্জন এলাকায় লাশের ডাম্পিং জোন হিসাবে বেছে নেয়া হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে ও তুরাগে একদিনে ছয় লাশ উদ্ধারের ঘটনার ৩৭ দিন আগে তিন ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায় রাজধানীর উপকণ্ঠে পূর্বাচল উপশহরের নির্জন এলাকায়। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর তিন জনের লাশ পাওয়া যায়। রাজধানীর পূর্বাচলে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ও তুরাগে পাওয়া লাশগুলো ছিল গুলিবিদ্ধ। একই ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পেছন দিক থেকে গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। তবে লাশগুলো যেখানে পাওয়া গেছে সেখানেই তাদের হত্যা করা হয়েছে এমন তথ্য মিলছে না। অন্যত্র হত্যাকা- ঘটিয়ে লাশগুলোকে যেখানে ফেলে দেয়া হচ্ছে সেটাকে লাশের ডাম্পিং জোন হিসেবেই বেছে নিয়েছে ঘাতকরা এমনটাই মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, হঠাৎ করেই একেক সময়ে একেক ধরনের অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। যেমন, যখন নিখোঁজের ঘটনা ঘটে তখন শুধু নিখোঁজের ঘটনাই ঘটতে থাকে। আবার যখন ইভটিজিং বা অন্য কোন ঘটনা ঘটে তখন সেই ঘটনাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। পূর্ব শত্রুতা, প্রেম পরিণয়, জমিজমা, ব্যাবসা-বাণিজ্য, লেনদেন নানা বিষয়ের বিরোধ কেন্দ্র করে অপহরণ, গুম, খুনের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় ডাম্পিং জোনে লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে কিনা কে জানে? অনেক নিখোঁজ বা অপহৃতদের জীবিত উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু এসব ঘটনায়ও শনাক্ত হয়নি দোষীরা, এমনকি তদন্তও ঠিকমতো হয়নি। ফলে বেশিরভাগ ঘটনার বিচার তো হচ্ছেই না, বরং এসব ঘটনা রীতিমত রহস্যে ঘেরাই থেকে যাচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, প্রায় ৩৭ দিন আগে রাজধানী ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ পূর্বাচলে থেকে তিন বন্ধুর লাশ উদ্ধার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিন যুবক হত্যাকা-ে কারা ঘাতক, কেন খুন করা হয়েছে, কোথায় খুন হয়েছে, কিভাবে খুন হলো তা এখনও শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবারও ৩৭ দিনের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রাজধানীর তুরাগ থেকে ছয়জনের লাশ পাওয়া যাওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, এই ছয়জনকে মারল কারা? কেন, কী কারণে কারা তাদের টার্গেট করেছিল ? একের পর এক গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে অজানা আতঙ্ক ও ভীতি ছড়াচ্ছে। জড়িতদের শনাক্ত করতে না পারায় দীর্ঘ হচ্ছে রহস্যের জাল। বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে উদ্ধার করা ৪ লাশের পরিচয় মিলেছে, যাতে তারা কেউই তেমন ধানাঢ্য বা উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য না। অনেকটা দিন মজুর নি¤œবিত্ত শ্রেণীর খেটে খাওয়া চার জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে, ঢাকা থেকে উদ্ধার দুই লাশে পচনের কারণে শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে কি-না তা শনাক্ত করা যায়নি।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের কাছে গেলে বলা হয়, তদন্ত হচ্ছে, তদন্ত চলছে। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তোতাপাখির মতো বলা হয় এই ধরনের কথা। দিনের পর দিন ভুক্তভোগীরা এই ধরনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে ত্যক্তবিরক্ত। অথচ উপায় নেই। নিখোঁজ ব্যক্তি বা অজ্ঞাত লাশের মিছিলে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রিয় মুখ। আর যাদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে তাদের খুনের ঘটনার কোন কূল-কিনারা হচ্ছে না।

পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ডিবি, র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সব ইউনিটকে আইন মেনে অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেয়া আছে। কেউ যদি অপহরণ, গুম, খুন বা আইনবহির্ভূত কাজ করে তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকতে হবে। কারও নিখোঁজের সংবাদ পেলে পুলিশ তাকে উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা করে। যারা ফিরে আসেন তারা পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন না। তাই গুম বা নিখোঁজের ক্লু মিলছে না। এ কারণে অপহরণকারীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এখনও যারা নিখোঁজ আছেন তাদের উদ্ধারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত আছে। নারায়ণগঞ্জ আড়াইহাজারে ও তুরাগে উদ্ধার করা লাশ দেখে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ঘটনাস্থলে এনে কিংবা অন্যত্র তাদের হত্যা করে লাশগুলো ফেলে রাখা হয়েছে। তাদের খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। গুলি লেগে প্রত্যেকের মাথার মগজ বেরিয়ে এসেছে। কেন, কী কারণে, কারা তাদের হত্যা করেছে, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সবার পরিচয় পাওয়ার পর সেটা বলা যাবে। মনে হচ্ছে, নির্জন স্থানকে নিরাপদ ভেবে এই ধরনের জোন বেছে নিচ্ছে ঘাতকরা। পেশাদার ঘাতকরাই এই ধরনের ডাম্পিং জোনকে বেছে নিচ্ছে বলে পুলিশ কর্মকর্তার দাবি।