১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্ষতিপূরণ পেতে ভোগান্তি

বিদেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশীর কঠিন শ্রমের কল্যাণে অর্জিত প্রবাসী আয়ে দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের জাতীয় আয় ও সমৃদ্ধি। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সে তুলনায় যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা তারা পান নাÑ না স্বদেশে না বিদেশে। বাস্তবতা হলো বিদেশে কর্মরতদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণীর। কায়িক শ্রমের সঙ্গে জড়িতÑ একেবারে মাথার ঘাম পায়ে ফেলার অবস্থা আর কি! দক্ষ ও আধা দক্ষ কিছু শ্রমিক থাকলেও তাদের সংখ্যা খুব কম। যা হোক, প্রতিনিয়ত কায়িক শ্রমে জর্জরিত এসব শ্রমিক কালেভদ্রে দেশে এলে তেমন সমাদর পান না শাহ্ জালাল অথবা শাহ্ আমানত বিমানবন্দরে। সে অবস্থায় বিদেশ-বিভুঁইয়ে শ্রমজীবীদের কি রকম দুরবস্থার মুখোমুখি ও হেনস্তা হতে হয় তা সহজেই অনুমেয়। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের কল্যাণে প্রায় প্রতিদিনই অসহায় এসব শ্রমজীবীর সুখ-দুঃখের খবর আমাদের গোচরে এসে থাকে। এর পাশাপাশি পাওয়া যায় কর্মস্থলে কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুসহ সড়ক দুর্ঘটনা অথবা অন্যবিধ কারণে মৃত্যুর খবরাখবরও। এর বাইরেও রয়েছে মর্মান্তিক মৃত্যুর পর প্রাপ্ত দেনা-পাওনার হিসাব ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ। এই হিসাব পেতে এবং মেলাতেই নিহত ও আহতদের স্বজনদের কেটে যায় বছরের পর বছর। প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর শুধু সৌদি আরবেই প্রবাসী শ্রমিক মৃত্যুর হার মাসে প্রায় ৩০টি। মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্য সব দেশ মিলিয়ে প্রতি মাসে দুই শতাধিক শ্রমিকের মরদেহ এসে থাকে ঢাকায়। বিমান বাংলাদেশ এ হতভাগাদের দেশে ফিরিয়ে আনে বিনা ভাড়ায়। কেননা সৌদি আরবসহ প্রায় দেশেই দুর্ঘটনা বা অন্যবিধ কারণে অকাল মৃত্যু হলেও ক্ষতিপূরণসহ দেনা-পাওনা আদায় দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ। এসব ক্ষেত্রে আইনী নানা বাধ্যবাধকতা ও জটিল হিসাব-নিকাশ রয়েছে, যেগুলো আমলাতান্ত্রিক ও দেন-দরবারের বিষয়। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে এক্ষেত্রে জনবল সঙ্কটসহ চেষ্টা-তদ্বিরের ঘাটতির বিষয়টিও সুবিদিত। প্রবাসীর লাশ বাংলাদেশে পৌঁছালেও ভোগান্তির অন্ত থাকে না স্বজনদের। দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে তারা প্রিয়জননের লাশ নিতে যেখানেই ধর্ণা দেন না কেন, পদে পদে ভোগান্তি। এমনকি শাহজালাল বিমানবন্দর কার্গো হাউস থেকে লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা পেতেও ভোগান্তির শেষ নেই, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি দূর অস্ত। তবে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফরের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাতে ওই দেশে নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ স্বল্প সময়ে যাতে নিশ্চিত করা যায়, তার চেষ্টা চলছে।

এর পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমিক ও কর্মীদের জন্য বীমা করার পথও প্রশস্ত হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে জাতিসংঘ প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষণে জীবন বীমা (ইন্স্যুরেন্স) করার জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে। সম্প্রতি প্রবাসী কলাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী জেনেভায় এতদসম্পর্কিত জাতিসংঘ কনভেনশনে অনুসমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশের পক্ষে। ফলে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তায় বিভিন্ন ধরনের বীমা করার পথ সুগম হয়েছে। আরও যা আশার কথা তা হলো, এর জন্য আপাতত নতুন করে অর্থ বরাদ্দের আবশ্যকতা নেই। প্রবাসী কল্যাণ তহবিলে বিদেশে কর্মরতদেরই প্রায় ১১শ’ কোটি টাকা পড়ে আছে। বিদেশে কোন কর্মী মৃত্যুবরণ করলে আপাতত এই তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা হয়। যা হোক, প্রবাসীদের জন্য বীমা কোম্পানি চালু করা হলে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনসহ নানা ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা করা যাবে। মনে রাখতে হবে যে, প্রবাসী কর্মী ও শ্রমজীবীরা নানা দেশে নানা রকম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। তাদের প্রতিনিয়ত কষ্টার্জিত অর্থেই দিন দিন সচল ও সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি।