১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

রাজধানীর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এতে কোন ভাল খবর নেই। শুধু আছে নাগরিক অসন্তোষের কথাই। এমন একটা পয়েন্ট তুলে ধরছি যেটা নিয়ে আমরা তেমন কথাই বলি না। ২০১১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রভাব নিয়ে করা এক জরিপে বেশিরভাগ (৬১%) উত্তরদাতার মতে, রাজধানীতে শব্দদূষণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে ধুলাবালির পরিমাণও (৫৪%)। শুধু তাই নয়, ৩৫ ভাগ উত্তরদাতা জানান, তাদের এলাকায় রোগ-ব্যাধির প্রকোপ বেড়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাথ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই সমীক্ষা করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। শব্দদূষণ আর ধুলোবালিÑ এ দুটো উপদ্রব আসন্ন ২০১৯ সালে কোন পর্যায়ে পৌঁছবে ভাবতেই শিউরে উঠছি। কর্তৃপক্ষ কি একটু সদয় ও সতর্ক হবেন?

রাজধানী ঢাকায় বসবাস এক সময় এদেশে অনেকের কাছেই ছিল স্ট্যাটাস সিম্বল। ঢাকার বাইরের স্থায়ী অবস্থাসম্পন্ন মানুষও চাইতেন ঢাকায় তাঁর একটি বাড়ি থাক। দেশের সেরা শহর যে ছিল ঢাকা! এখনও বিলক্ষণ ঢাকা সেরাÑ তবে ইতিবাচক বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়ে গেছে নেতিবাচকতায়। এখন সে সেরা দূষণে, সর্বক্ষেত্রেরই দূষণে, সেরা সে বিবিধ বিড়ম্বনায়, বিচিত্র ভোগান্তিতে। শঙ্কা, সমস্যায় ভারাক্রান্ত ঢাকা ক্রমশ হয়ে উঠছে যেন এক অভিশপ্ত নগরী। বসবাসের অযোগ্য, চলাচলের অযোগ্য ঢাকা তবু নিত্যদিন স্বাগত জানিয়ে চলেছে নতুন আগন্তুকদের। গোটা দেশের অভাবতাড়িত মানুষের কাছে ঢাকা হলো জীবনধারণের শেষ আশ্রয়। এখানে এলে দু বেলা দু’মুঠো খাওয়ার কোন না কোন ব্যবস্থা হয়েই যাবেÑ এমনটাই পাকাপোক্ত ধারণা।

প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে মানুষকে ঘর থেকে বেরুতেই হয়। মধ্যবিত্ত যে ভদ্রলোকটি অফিসে যাওয়ার জন্য রিক্সায় করে যান সিএনজি অটোরিক্সা বা বাস স্ট্যান্ডে, রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মেটাতে গিয়ে দেখেন দু’পাশে হাত পেতে আছে বৃদ্ধ কিংবা বৃদ্ধা। ওরা জীবিকার তাগিদে আগেই চলে এসেছেন তাদের ‘কর্মস্থলে’। মুখে কিছুই হয়তো উচ্চারণ করেন না তারা। শুধু ডান হাতখানি বাড়িয়ে রাখেন, আর চোখ তার ভদ্রলোকটির মানিব্যাগের দিকে। রিক্সাঅলাকে প্রাপ্য বুঝিয়ে দেবার পর যদি খুচরো কিছু জোটে তাদের। যদি রিক্সারোহী তাদের উপেক্ষা করে চলে যান তবে তারাও এক মুহূর্ত নষ্ট না করে অন্য রিক্সার দিকে ছুটে যান। হাত পাতা এবং হাত বাড়িয়ে ছিনিয়ে নেয়াÑ দুটো ‘পেশা’ই চলছে এখন পেশাদারিত্বের সঙ্গে।

এবার দারুণ পূজা

একটা কথা বেশ চালু হয়ে গেছেÑ ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আর সেজন্যই মুসলিমপ্রধান একটি দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার সময় বেশ একটা উৎসক-উৎসব ভাব বজায় থাকে। সরকারী ছুটি মাত্র একদিন ধাকলেও পূজা পালনের জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ছুটি নিতে পারেন। সাধারণত শিক্ষাঙ্গনে সাধারণ ছুটি থাকে। ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয়গুলোর কোনটি একদিন, কোনটি দুদিন ছুটি দিয়ে থাকে। কিন্তু কোন ছুটিই থাকবে না স্কুলেÑ এমনটা অস্বাভাবিকই মনে হয়। এবার উত্তরার একটি পুরনো ইংরেজী মাধ্যম স্কুল ছুটি দেয়নি। এটা কি ঠিক হলো?

এবার পূজায় উৎসব হয়েছে বেশ জমজমাট। আমি থাকি উত্তরায়। আমার সেক্টরেই (১১ নং) বেশ জমজমাট উৎসব হয়েছে। মহাষ্টমীতে মুখর ছিল উত্তরা ম-প। ২০০৮ সাল থেকে এখানে পূজা হচ্ছে। বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবেই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সব শ্রেণীপেশা ও ধর্মের মানুষের প্রবেশাধিকার থাকে। প্রতিদিনই থাকে গান-বাজনা। কখনও কখনও বিশিষ্ট শিল্পীরাও এসে যোগ দেন, গান শোনান। সব মিলিয়ে উপভোগ্যই। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সব জায়গাতেই সুন্দরভাবে পূজা হয়েছে। অন্য ধর্মের মানুষদের ভেতর এবারও বিপুল আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে পূজা দেখতে যাওয়ার। সেইসঙ্গে পূজা উপলক্ষে যেসব খাবার ও মিষ্টি তৈরি হয় সেসবে ভাগ বসাতেও সবারই আগ্রহ।

আইয়ুব বাচ্চুর প্রস্থানে

বৃহস্পতিবার বেশ ছুটির মুড নিয়েই জনকণ্ঠ ভবনে ঢুকলাম। অফিস শেষে আজ পূজামণ্ডপে যাবÑ এমনটাই ভাবনা। সপ্তম ফ্লোরের কাচের ডোর ঠেলে ঢুকতেই সহকর্মীর প্রথম কথা, আইয়ুব বাচ্চু চলে গেলেন। কী! তার কি বিদায়ের বয়স হয়েছে! মন খারাপ করা এক অসহায়ত্ব নিয়ে কম্পিউটার খুলি। প্রাথমিক কাজ গুছিয়ে ফেসবুকে ঢুঁ মারতেই দেখি অদৃশ্য অশ্রুতে ভরে উঠেছে ফেসবুক। ‘গুণীর প্রস্থানে প্রকৃতির গুনগুন থেমে যায়...’ এমন একটি লাইন টাইপ করে বসে থাকি স্তব্ধ হয়ে। আবার লিখিÑ‘ রুপালি গিটার তুলেছিল কিছু সুর স্বপ্নমধুর/

যা চির প্রেরণার, প্রেমময় আর বেদনাবিধুর...

এরপর পড়তে থাকি সদ্যপ্রয়াত শিল্পীকে উৎসর্গিত চরণসমূহ। তার থেকে দুটি এখানে তুলে দিচ্ছি। দুটো লেখাই লিখেছেন বিদেশে অবস্থানকারী লেখক-শিল্পী। কলকাতায় থাকা আমাদের চিত্রশিল্পী সিলভিয়া নাজনীন লিখেছেন: গতকাল উত্তর কলকাতায় পূজা দেখছিলাম। বাগবাজারের ম-প থেকে বেরিয়ে হঠাৎ কানে বাজল ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’! আমার বন্ধু (উন্মেষ ম-ল) বলল, ‘দ্যাখ তোদের দেশের ব্যান্ডের গান, যা আমরাও শুনে বড় হয়েছি’। হুম। আমরা নব্বইয়ের দশকে যারা জন্মেছি তাদের কাছে আইয়ুব বাচ্চু এক অন্য অনুভূতি এক অন্য ভালবাসা। আর বামবা’র কনসার্ট দিয়েই আমাদের আইয়ুব বাচ্চুর কাছে যাওয়া। ত্রিশ পেরিয়েও সেই এক অনুভূতি। মৃত্যুর ক্ষমতা নেই এই অনুভূতিকে ভুলিয়ে দেবার।

কোন কোন মানুষের মৃত্যু নেই, আর তেমনই– মৃত্যু নেই আমাদের স্মৃতির! শুধু মৃত্যুদিন হিসেবে স্মৃতি হয়ে গেল আজ। বিদায় আইয়ুব বাচ্চু।

‘দরজার ওপাশে আইয়ুব বাচ্চু’ শিরোনামে পোস্ট দিয়েছেন কানাডায় বসবাসকারী আমাদের ছড়াশিল্পী লুৎফর রহমান রিটন। তিনি লিখেছেন : ‘কাল মধ্যরাত পর্যন্ত হিউস্টনের নানান সড়কে এলোমেলো চক্কর দিচ্ছিলাম প্রীতিভাজন আরিফ বাবুর সঙ্গে। আমাকে চনমনে রাখতে বাবু ওর ছোট্ট কিউট মার্সিডিজ-এ উচ্চ ভল্যুমে চালিয়ে দিয়েছে আইয়ুব বাচ্চুর গান। রক্তে দোলা লাগানিয়া সুর ঝংকারে আইয়ুব বাচ্চু গাইছেন তার বিখ্যাত গান- ‘এক আকাশের তারা তুই একা গুনিস নে/গুনতে দিস তুই কিছু মোরে/ ওরে সব ভালো তুই একা বাসিস নে/একটু ভালোবাসতে দিস মোরে/পুরো জোছোনা তুই একা পোহাস নে/ সঙ্গে নিস রে তুই মোরে/ ওরে সব ভালো তুই একা বাসিস নে/একটু ভালোবাসতে দিস মোরে...।’

বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের সব ভালবাসা একাই জিতে নিয়েছিলেন বাচ্চু তাঁর সুরের জাদুতে। আমাদের ব্যান্ড সঙ্গীতের জাতীয় সঙ্গীত বলা হয় বাচ্চুর ‘সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’ গানটিকে। বাচ্চু সম্পর্কিত আমার উচ্ছ্বাসপূর্ণ কথাবার্তায় বাবু খানিকটা বিস্ময়ই প্রকাশ করল। গিটারিস্ট হিসেবে বাচ্চুকে আমি বাংলাদেশের এবং উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বা শীর্ষস্থানীয় বাজিয়ের আসনে দেখি। প্রবাসে, মন খারাপের অশ্রুমাখা দহনদগ্ধকালে বহুদিন আমি বাচ্চুর রুপালি গিটারের অকল্পনীয় দক্ষতায় নির্মিত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটা শুনেছি।

গিটার কথা বলে ওঠে বাচ্চুর আঙুলের স্পর্শে।

কাল রাতে আমাদের ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী বাচ্চুকে নিয়ে আমার উচ্ছ্বাস আর আবেগ যেন উপচে পড়ছিল। ভায়োলিনের করুণ মূর্ছনায় হৃদয় মোচড় দেয়া সুতীব্র ক্রন্দনের মতো একটা সঙ্গীতায়োজনে বাচ্চুর হিরন্ময় কণ্ঠ বলে যাচ্ছিল-‘এখন অনেক রাত/খোলা আকাশের নিচে/জীবনের অনেক আয়োজন আমায় ডেকেছে/তাই আমি বসে আছি দরজার ওপাশে...।’

জীবনের কী আশ্চর্য ম্যাজিক! চব্বিশ ঘণ্টাও পেরোয়নি, আজকে, ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটার ঘরে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা আগেই পৃথিবীতে লেখা হয়ে গেছে একটা মন খারাপ করা গল্প। টিভি স্ক্রলে ধাবমান একটা খবরের ওপর দৃষ্টি পড়তেই চোখ আমার ঝাপসা হয়ে উঠল। প্রিয় শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু কিছুক্ষণ আগে চলে গেছেন দরজার ওপাশে। যেখান থেকে কেউ আর ফিরে আসেন না।

গতকাল রাতেও আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন আমার সঙ্গে। বাচ্চু গাইছিলেন- এখন অনেক রাত। হিউস্টনের আকাশে তখন সত্যি সত্যি অনেক রাত ছিল। এখনও অনেক রাত, হিউস্টনের আকাশে। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু আজ নেই। তিনি চলে গেছেন দরজার ওপাশে...।’

রাজধানীর নানা ধ্বনি

ঢাকার রেলপথ ঘেঁষে বসা অন্তত একটি বাজারের কথা বলি। ঢাকা শহরের ভেতর দিয়ে চলা রেলগাড়িগুলোর চলাচলে প্রতিবন্ধকতা যাতে সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ সজাগ থাকে হয়ত। দু-দশটা রেল ক্রসিংয়ের অরক্ষিত থাকার বিষয়টি না হয় আপাতত উহ্যই রাখলাম। রেললাইনের আশপাশে থাকা মানুষগুলোর দায়িত্ব নিজেকে বাঁচানোর। এমন রোগীও একবার দেখেছিলাম পঙ্গু হাসপাতালে যিনি রেললাইনের পাশ দিয়ে যেতে যেতে এমনই অন্যমনস্ক কিংবা বেখেয়াল হয়ে পড়েছিলেন যে, রেলগাড়ির বডির একটি অংশ তার দেহে আঘাত করে। যা হোক, আমরা দেখি ঢাকায় রেললাইন ঘেঁষে বাজার বসে থাকে। তেজগাঁও এলাকায় এমন একটি বাজারে বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছিল চলন্ত রেলগাড়ির আঘাতে। রেলগাড়ি আসতে দেখলে বাজারের দোকানিরা তাদের ভাসমান বাজার তুলে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় একটু সরে যান। সব সময় যে সেটা সম্ভব হয় না তা বলাই বাহুল্য। জুরাইন রেললাইন ঘেঁষে নয়, বলা চলে রেললাইনের ওপরই বাজার বসে গেছে। যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। মেয়র চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

সেইসঙ্গে বলা যাক ঢাকার প্রধান একটি সড়ক ভিআইপি রোডের ছোট্ট একটি অংশের কথা। ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজারের মোড়ের সার্ক ফোয়ারা পর্যন্ত জায়গাটুকুর কথাই ধরা যাক। শুধু সড়কের ওপর নয়, দু’পাশের ফুটপাথ এবং পার্শ্ববর্তী পায়ে চলা মাটির পথের দিকে দৃষ্টি দিন। দু’পাশের ভবনগুলোর দিকেও তাকান, সাইনবোর্ড বিলবোর্ড কিছুই বাদ দেবেন না। রাস্তার ওপর খানাখন্দ, ফুটপাথকে ডাস্টবিন ও শৌচাগার বানানোর প্রবণতা দেখবেন।

অনেক ভবনের ‘দাঁত’ বেরিয়ে পড়েছে। আবার নতুন ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি চলছে বছরের পর বছর ধরে, অগ্রগতি নেই। সাইনবোর্ডগুলো কী বিচিত্র, অনেকগুলোই কদর্য। সব কিছু ঠিক করা যাবে না, আমরা জানি। তবে চেষ্টা করতে দোষ কি? এইটুকু রাস্তা ও তার চারপাশ যদি আমরা পরিচ্ছন্ন, সুন্দর, সুরুচিকর, সংস্কৃতিমণ্ডিত ও নজরকাড়া করে তুলতে পারিÑ তাহলে সেটাও একটা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

১৯ অক্টোবর ২০১৮

marufraihan71@gmail.com