১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয়!

  • এএইচ খান রতন

১৯৪১ সালে ব্রিটিশ সরকার অসম এবং বর্মায় তাদের সামরিক যোগাযোগের সুবিধার্থে তেজগাঁও বিমানবন্দরের কাছে শুধুমাত্র সামরিক যোগাযোগের জন্য কুর্মিটোলায় একটি ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের প্রায় ১৯ বছর পর ১৯৬৬ সালে কুর্মিটোলায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ফ্রান্সের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নতুন একটি বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেয়। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনায় রাজধানীর কাছে এ জাতীয় একটি স্থাপনা আদৌ যৌক্তিক ছিল না। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অর্ধ নির্মিত বিমানবন্দরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীনতা উত্তর সরকার পুনরায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, নীর্মাণাধীন ও ক্ষতিগ্রস্ত এ বিমানবন্দরটি পুনর্নির্মাণ হবে এবং এটিই হবে দেশের প্রধান ও আন্তজার্তিক বিমানবন্দর। পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রান্সের একটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় নিয়োগ দেয়া হয়। শুরু হয় এর পুনর্নির্মাণ কাজ। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই হলো দেশের সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংক্ষিপ্ত বায়োগ্রাফি।

১৯৪১ সালে ব্রিটিশ দলোনির চিন্তা শক্তির একটি বীজ বাংলাদেশের যে জায়গাটিতে তারা বপন করে যায়, কালক্রমে সে জায়গাটি আজ বাংলাদেশের রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দু ‘হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।’ পৃথিবীর কোথায়ও রাজধানীকেন্দ্রিক এমন বিমানবন্দরের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। ব্রিটিশদের ওপর গায়ের ঝাল ঝারার জন্য এ লেখা নয়। প্রশ্ন হলো, ক্রমবর্ধমান পরিবর্তিত বিশ্বে আধুনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাজধানীর কেন্দ্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কতটুকু যৌক্তিক ছিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ গেল। কিন্তু নতুন করে সুদূর পরিকল্পিত এবং পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা না করে ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকার ওই একই স্থানে প্রকল্প গ্রহণ করে। ধরে নিলাম তখন সমীক্ষার বিষয়টি আজকের দিনের মতো এত উন্নত ছিল না। কিন্তু এ জাতীয় একটি আন্তর্জাতিক স্থাপনা তো কয়েক শতাব্দীর কথা চিন্তা মাথায় রেখেই করা উচিত ছিল। তা না করে স্বাধীনতা উত্তর সরকার আবারও ওই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সমস্যাটিকে স্থায়ী রূপ দেয়। যে কারণে বিমানবন্দরে কোন ভিভিআইপি আগমন করলে যানজটে গোটা রাজধানী স্থবির হয়ে পড়ে এবং পর্যায়ক্রমে যার প্রভাব গোটা দেশ ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে পূর্বসৃষ্ট সমস্যা হতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, তা সমাধানের চিন্তা করে রাজধানীর বাইরে কোথাও নতুন বিমানবন্দর স্থাপন করা যেত, তা না করে জাতির জন্য বিষফোঁড়া বিমানবন্দরটি ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয় সম্প্রসারণ করার জন্য?

দেশে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় আছে। আছে বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, সরকারের সমালোচক, সচিব-মন্ত্রী কত কত হাই প্রেফাইল উপদেষ্টা। তারা কি প্রধানমন্ত্রীকে এর নেতিবাচক দিক নিয়ে কিছু বলেছেন? প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়টি সার্বিকভাবে উপস্থাপন করলে অন্তত রাজধানীর বুকে তিনি এর সম্প্রসারণের বিষয়টি ভেবে দেখতেন। কারণ এ দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষও এটা বোঝে যে, বিদ্যমান বিমানবন্দরটি নতুন করে সম্প্রসারণ নয়, এখানে থেকে সরানো উচিত। ধরে নিলাম যদি দুই কোটি মানুষ বছরে এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করে, তা হলে প্রতিদিন গড়ে ৫৪ হাজার ৭৯৪ জন যাত্রী এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করবে। যদি প্রতি ১০ জনেও একটি করে গাড়ি ব্যবহার করে, তা হলে গাড়ির সংখ্যা দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪৭৯টি। যত আধুনিক প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হোক এ পরিমান গাড়ি মুভ করার ক্যাপাসিটি আমাদের পক্ষে আদৌ কি সম্ভব? আর ৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করার তো প্রশ্নই আসে না। ক্রমবর্ধমান উন্নয়নশীল পৃথিবীতে আজ আমরাও পিছিয়ে নেই। গোটা বিশ্বে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে নতুন পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ভুল আমাদের অনেক পিছিয়ে দেবে। এ বিমানবন্দরটি সম্প্রসারিত হলে তা হবে একটি বড় ভুল।

নতুন বিমানবন্দর স্থাপন ও এর জন্য উপযুক্ত জায়গা আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে, যা রাজধানীর বাইরে এবং সারাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জায়গাটি অত্যন্ত উপযোগী। প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনা।

কালীগঞ্জ থানার বারিয়া ও জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন সংযুক্ত করেছে বেলাই বিল। যার দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১০-১৫ কিমি এবং প্রস্থ ৫-৭ কিমি। যেখানে বাড়িঘরের সংখ্যা হাতেগোনা যায়। সর্বত্রই ফাঁকা। ইদানীং ভূমিখেকোদের নজরেও পড়েছে জায়গাটি। বেলাই বিলটি এমনি একটি অবস্থানে রয়েছে যার দক্ষিণ-পূর্বে পূর্বাচলসহ ঢাকা সিটি, পশ্চিমে গাজীপুর সদর, দক্ষিণ-পূর্বে কালীগঞ্জ, এবং উত্তর-পূর্বে শ্রীপুর-কাপাসিয়া অবস্থিত। এর আরও সুবিধা হলোÑ নারায়ণগঞ্জ হতে বর্মী পর্যন্ত শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে চলছে ব্যক্তি উদ্যোগে শিল্প- কলকারখানা স্থাপন। শীতলক্ষ্যা নদী গতিশীল হলে অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি সঞ্চারিত হবে। আর বেলাই বিলে বিমানবন্দর হলে সিলেটসহ রাজধানীর বাইরের প্রতিটি জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে । জাতি পরিত্রাণ পাবে একটি মহাযানজটের অসহনীয় মহাপরিকল্পনার সম্ভাবনা থেকে।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী