১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডায়াবেটিস ও নারী

নারীর শরীরে ডায়াবেটিসের প্রকিক্রিয়া অনেক কঠিন হয় কেননা এই রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারী ও তার গর্ভস্থ সন্তানকে ক্ষাতগ্রসাত করে। শরীরে (রক্তে) অতিরিক্ত ও উচ্চমাত্রার শর্করার উপস্থিতি শরীরে ফাংগাস বা ছত্রাকের বেড়ে ওঠার জন্য সহায়ক হিসাবে কাজ করে বিধায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের বারেবারে ফাংগাস বা ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়াও ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের মেনোপজ তুলনামূলক সময়ের আগেও হতে পারে ফলে তৎপরবর্তী হৃদরোগের ঝুঁকি ত্বরান্বিত হতে পারে। ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের জনন অঙ্গে কিছু কিছু উপসর্গ বেশি থাকে ফলে কিছু কিছু রোগও বেশি হতে পারে যেমনÑ জনন অঙ্গে ছত্রাক জাতীয় ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন, মূত্র নালী বা মূত্র থলিতে প্রদাহ ইত্যাদি। তাই সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীর শারীরিক পরীক্ষা করা উচিত, এটা বোঝার জন্য যে ডায়াবেটিসের কারণে তার জনন অঙ্গে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কি না। ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের যোনিপথে অস্বস্তি ও ব্যথা এবং যোনিপথ শুকনো ও অপিচ্ছিল থাকার কারণে শারীরিক সম্পর্কে অনীহা হতে পারে।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের জন্মনিরোধক বড়ি ব্যবহারে ঝুঁকি আছে। জন্মনিরোধক বড়ি ব্যবহারে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। এক বা দুই বছর বা ততোধিক সময় ধরে জন্মনিরোধক বড়ি খেতে থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। তাই সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে স্বল্প মাত্রার জন্মনিরোধক বড়ি খাওয়া উচিত।

অধিকাংশ চিকিৎসকের মতেই যে সকল নারী গর্ভধারণের আগে থেকেই টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ভুগে থাকে, তাদের গর্ভধারণের সব ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা নির্ণয় করার জন্য প্রথম দিকে দিনে ৬-৮ বার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা দরকার। যেমন প্রতিবার খাওয়ার আগে, প্রতিবার খাওয়ার ১-২ ঘণ্টা পরে, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় এবং মাঝে মাঝে রাত ২টা-৩টায়। এরপর ডায়াবেটিস কন্ট্রোল হওয়ার পর নিয়মিত চেকআপ করতে হয়।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়েদের অনেক ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে। যেমন- গর্ভধারণের প্রথম দিকে বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি (এবরশন বা মিসক্যারেজ) সন্তান পরিপূর্ণতার পূর্বেই জন্ম হওয়া, (প্রিটার্ম লেবার) অত্যাধিক ওজন বেড়ে যাওয়া এমন কি সন্তান মায়ের পেটে মরেও যেতে পারে। জন্মের পরে সন্তানের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে যেমন সন্তানের শরীরে গ্লুকোজ কমে যাওয়া (হাইপো গ্লাইসিমিয়া) বা রক্তে ক্যালসিয়াম কমে গিয়ে সন্তান দুর্বল হয়ে যাওয়া (হাইপো ক্যালসিমিয়া), সন্তানের শ্বাসকষ্ট হওয়া, মায়ের বুকের দুধ ঠিকভাবে টেনে খেতে না পারা (ল্যাকটেশন ফেইলিওর), ইত্যাদি আরও নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে। এজন্য ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়েদের গর্ভাবস্থায় কঠোরভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। হিমোগ্লোবিন এ ওয়ান সি (ঐন অ১ঈ) হলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার ৮-১০ সপ্তাহ সময়ের একটি গড় মাত্রা। যাদের ডায়াবেটিস নেই, তাদের শতকরা ৬ এর নিচে ঐন অ১ঈ থাকে যদিও গর্ভাবস্থায় তা শতকরা ৫ এরও নিচে নেমে আসে। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারীদের রক্তে ঐন অ১ঈ মাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকা উচিত।

শতকরা ৯০ ভাগ নারীর ক্ষেত্রে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে, জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ভোগা নারীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে আসে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দেখা উচিত; যদি তা স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে আসে তবে সন্তান জন্ম হওয়ার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পরে আবার রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। অন্য কোন কারণে নিষেধ না থাকলে, পূর্বে থেকে ডায়াবেটিস আক্রান্ত বা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত নারী, সকলেই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। তবে সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়, তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ নারী পরবর্তী ১০-২০ বছরের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

বাবা-মার মধ্যে যে কোন একজন ৫০ বছরের পূর্বে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে, তাদের সন্তানের শতকরা ১৪ ভাগ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া মা-বাবা দুজনেরই টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে, সন্তানের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি শতকরা ৪৫ ভাগ।

মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তির পরে নারীর শরীরের ইস্ট্রোজেন হরমোনের অভাব পূরণে ওষুধের মাধ্যমে হরমোন প্রদান করাকেই হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বলে। এর উপকারীতাগুলো হলো, মেনোপজের পরে নারীর হাড় দুর্বল হয়ে ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বা অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি কমায়, হট ফ্লাশের ঝুঁকি কমায় যাতে মাথাসহ মুখম-ল রক্তিম ও গরম হয়ে যায়, যোনিপথে ব্যথাযুক্ত প্রদাহ বা ভ্যাজিনাইটিসের ঝুঁকি কমায়; নারীর ত্বকের স্বাভাবিক লাবণ্য ঠিক রাখে ও ত্বকের সৌন্দর্য ধরে রাখতে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ইত্যাদি। দীর্ঘদিন হরমোন নেয়ার কারণে নারীর ব্রেস্ট ক্যান্সার বা জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই হরমোন নিতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাঝে মাঝে কিছু কিছু পরীক্ষা করা উচিত এতে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায় এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি নেয়া ঠিক না।

এ ব্যাপারে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডাঃ হাসিনা আফরোজ

বিশিষ্ট স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ

ইউনাইটেড হসপিটাল