১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উন্নয়ন নিজস্ব অর্থে ॥ স্বনির্ভরতার পথে দেশ

উন্নয়ন নিজস্ব অর্থে ॥ স্বনির্ভরতার পথে দেশ
  • সর্বত্র উন্নয়নের ছাঁয়া;###;কঠিন শর্ত মেনে বিদেশী ঋণ ও অনুদান গ্রহণে খুব বেশি আগ্রহ নেই;###;পদ্মা সেতু নির্মাণ আত্মনির্ভরশীলতার বড় প্রমাণ

এম শাহজাহান ॥ নিজস্ব অর্থায়নে দেশের ছোট-বড় সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। উন্নয়নের ছোঁয়া এখন দেশের সবখানে। দাতাদের কঠিন শর্ত পরিপালন করে বিদেশী ঋণ ও অনুদান গ্রহণে খুব বেশি আর আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে সরকারী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে। স্বপ্নের সিঁড়ি ভেঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ দেশবাসীর সামনে এক নতুন বাস্তবতা। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর প্রায় ৫১ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্য থেকে অর্থায়ন করা হতো। সেই সংখ্যা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৩১ ভাগে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত দেশ বা উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়ার দৌড়ে যেসব দেশ রয়েছে, তারা এখন আর অনুদান গ্রহণ করে না। তাদের মতে, বাংলাদেশও গত কয়েক বছর ধরে অনুদানের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এটি একটি উন্নত এবং উৎকৃষ্ট দেশের উদাহরণ। অনুদান ও বিদেশী ঋণের ওপর বাংলাদেশের উন্নয়ন নির্ভরশীল নয় জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। তাঁর মতে, আমরা এখন স্বনির্ভরতার দিকে যাচ্ছি, স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে রয়েছি।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিজস্ব অর্থায়নে বাজেট প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নেয়া দশ মেগা প্রকল্পেও বাজেট থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানো হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাজেটে ধারাবাহিকভাবে বৈদেশিক সহায়তা কমছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী বা এডিপিতে এই চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বাজেট বাস্তবায়নে এই টাকার অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া ০.৯ শতাংশ মাত্র বৈদেশিক অনুদান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পুরো বাজেট বাস্তবায়নে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ মাত্র ১১ দশমিক ৭০ শতাংশ। বাকি ৮৯ শতাংশ অর্থায়ন নিজস্ব তহবিল থেকে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি জনকণ্ঠকে বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশের নতুন অভিজ্ঞতা। বৈদেশিক সহায়তা ছাড়াও নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশ বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে এটা তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, দেশের যে কোন উন্নয়ন এখন আর অনুদান ও বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশের ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বেড়েছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আয়করের আওতায় আসছেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার এদেশের তরুণরা কর দিতে উৎসাহিত ও সম্মানবোধ করছেন। এ কারণে সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে অনেক।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৮০ থেকে ৯০ পরবর্তী সময় পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর ৫১ ভাগ বৈদেশিক সাহায্য হতে অর্থায়ন করা হতো। যা ১৯৯১-২০০০ পর্যন্ত ৪৪ ভাগ এবং ২০০১-২০১০ পর্যন্ত ৩৭ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। গত ২০১১-১৬ সময়ে এডিপির গড়ে প্রায় ৩৪ ভাগ বৈদেশিক সহায়তা হতে অর্থায়ন করা হয়েছে। এখন এই সংখ্যা আরও কমে এসেছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। রূপকল্প-২১ সালের মধ্যেই দারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়নে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে শেখ হাসিনার সরকার আবারও প্রয়োজন।

এদিকে ২০০৯ সাল থেকে বিগত দশ বছরে সরকারী বিনিয়োগ বেড়েছে ৪.৩ থেকে ৮.২ শতাংশে। বাজেটের আয়তন বেড়েছে ৮৯ হাজার কোটি থেকে ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায়। এই সময়ে রফতানি আয় সাড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৪. ৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। শুধু তাই নয়, মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৭৫৯ মার্কিন ডলার থেকে ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলারে।

জানা গেছে, নানা ধরনের শর্তের কারণে প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তা খরচ করা যাচ্ছে না। এতে সরকারেরও বৈদেশিক অর্থায়ন খরচে অনীহা বাড়ছে। গত অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তার প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এভাবে প্রতি বছরই বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক সহায়তা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। ফলে অর্থের পাহাড় জমছে পাইপলাইনে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থ ব্যয়ে দাতাদের বিভিন্ন শর্ত পালনের বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এছাড়া চুক্তির নানা নিয়ম-কানুন মানতে হয় বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে। যেমন কেনাকাটা করতে গেলে ধাপে ধাপে দাতা সংস্থার সম্মতি নিতে হয়। একটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ-সংক্রান্ত কাজে ৩-৪ বার তাদের কাছে যেতে হয়। অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

অপরদিকে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেশীয় অর্থায়নে। দেশীয় অর্থায়নে বড় বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আযম জনকণ্ঠকে বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই নিজস্ব অর্থায়নে বাজটে প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জোর দেয়া হচ্ছে। এমনকি এডিপি বাস্তবায়নেও নিজস্ব অর্থায়নের ব্যবহার বাড়ছে। তিনি বলেন, সহজশর্ত ও দ্রুত ছাড়করণসহ বিভিন্ন কারণে দেশীয় অর্থায়নে দ্রুত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা যায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কিন্তু দেশে উন্নয়ন প্রকল্পের পরিমাণ বাড়ছে। এই বাস্তবতায় নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়া হচ্ছে।

এদিকে বাজেটে বৈদেশিক সহায়তানির্ভর বড় ২৮ প্রকল্পে কাক্সিক্ষত গতি নেই। এসব প্রকল্পে চলতি অর্থবছর বাজেটে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেটির পূর্ণাঙ্গ ব্যয় সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্প অনুমোদনের পরও সময়মতো চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় এর একটি বড় কারণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তানির্ভর বৃহৎ ২৮ প্রকল্প সময়মতো এগোচ্ছে না, এ রকম নানা কারণে। ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তি না হলে ভবিষ্যতে এডিপি প্রকল্প সাহায্য বাবদ অর্থ বরাদ্দ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইআরডি।

এদিকে এডিপিতে ২শ’ কোটি টাকা বা তার বেশি বরাদ্দ রয়েছে এমন ৬৩টি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে সম্প্রতি বৈঠক করেছে ইআরডি। এই ৬৩ প্রকল্পের মধ্যে ২৮ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। এর মধ্যে বিদ্যুতের ৯টি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ৫টি, স্থানীয় সরকার বিভাগের ৪টি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩টি ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পে চলতি অর্থবছর বাজেটে সরকারী ব্যয়ের অংশ এবং বৈদেশিক সহায়তার অংশ বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু প্রকল্পে এখনও চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। ফলে বাজেটের বৈদেশিক সহায়তার বড় অংশ ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছর এডিপিতে প্রকল্প সাহায্য বাবদ সবমিলিয়ে ৫৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা মোট এডিপি বরাদ্দের ৩৭ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় পেতে হলে অনেক প্রক্রিয়া পার করতে হয়। অর্থাৎ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী দুপক্ষের অনেক শর্ত থাকে। এসব শর্ত পূরণ করেই অর্থ পেতে হয়। তাই তাড়াহুড়ো কিংবা শর্টকাট প্রক্রিয়ায় এই টাকা খরচের সুযোগ নেই। উদ্দেশ্য ভাল হলেও নিয়মকে পাশ কাটিয়ে কেউ যেতে পারবেন না। অন্যদিকে সরকারী অর্থে এ রকম কোন বাধা নিষেধ বা তৃতীয় পক্ষ থাকে না।