১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হেফাজতে ইসলাম এবং মাদ্রাসা শিক্ষার ধারাবাহিকতা

  • মিলু শামস

আধুনিক রাষ্ট্র সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল সুর মানবতাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। এর বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম দু’হাজার তের সালে বেশ কিছুদিন রাজনীতির মাঠ গরম করেছিল। তাদের নাটকীয় আবির্ভাব ও বিকাশ এবং দ্রুত ক্লাইমেক্সে পৌঁছানোয় আধুনিক রাষ্ট্র চিন্তায় অভ্যস্ত মনন হতচকিত ও খানিক বিস্ময় বিহ্বল হলেও এ কথা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি যে, এ ধরনের উত্থানের পেছনে সমসাময়িক রাজনৈতিক চালবাজি যেমন আছে তেমনি আছে বাঙালী মুসলমানের আধুনিকতা ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতার টানাপোড়েনের দীর্ঘ ইতিহাস।

আঠারো শতকের ইউরোপ চিন্তাজগতের বিপ্লব, অর্থনৈতিক ও বুর্জোয়া বিপ্লবের সম্মিলিত আলোয় যেভাবে জেগে উঠেছিল তার আভা উপনিবেশ শাসিত ভারতবর্ষেও পৌঁছেছিল। কিন্তু তাতে বাঙালী হিন্দু সমাজ আলোকিত হলেও মুসলমান সমাজকে তা স্পর্শ করেছে অনেক পরে, আঠারো শ’ সাতান্নর সিপাহী বিদ্রোহের পর। এতকাল পর তারা ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করলেন, সেই সঙ্গে ইংরেজী শিক্ষার গুরুত্ব। ততদিনে ‘ইয়ংবেঙ্গল’রা তোলপাড় তুলে সমাজ সংস্কারসহ ইংরেজী শিক্ষা প্রায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যার প্রভাব পড়ছিল মাতৃভাষাতেও। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সেসময় এগুচ্ছিল দুর্দান্ত গতিতে। শহর-গ্রাম, অভিজাত- নিম্নবর্গ সবার ভাষা বাংলা হওয়ায় বাংলা ভাষার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হয়েছিল সহজে। তবে উনিশ শতকে মুসলমানরা ইংরেজী শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করলেও শিক্ষার একটি ধারা পেছনমুখী রয়ে যায়। এ ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন আবদুল লতিফ নামে ব্রিটিশ সরকারের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং সে সময়ের মুসলমান সমাজের প্রভাবশালী নেতা। ধর্মীয় আবেগ অনুভূতিতে আঘাত লাগার অজুহাতে তিনি গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে সযতেœ লালন ও বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন গতানুগতিক মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে। সমাজ যখন আধুনিকতার তীব্র জোয়ারে এগিয়ে চলার কথা সে সময় তিনি সমাজ সংস্কার করতে চেয়েছিলেন মূলত ধর্মের ঘেরাটোপে থেকে। তিনি গতানুগতিক মাদ্রাসা শিক্ষা প্রসারের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। যদিও মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজী শিক্ষা প্রসারের জন্য সবচেয়ে সরব ছিলেন তিনি। কিন্তু চিন্তায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য নিয়ে তিনি চাইতেন মুসলমানরা ইংরেজী ভাষায় শিক্ষিত হবে ঠিকই কিন্তু পাশ্চাত্য আধুনিক চিন্তা ধারায় প্রভাবিত হবে না।

এর প্রচ- বিরোধিতা করেছিলেন ইংরেজী শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত সংস্কারবাদী নেতা সৈয়দ আমির আলী। তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা তুলে দিয়ে আধুনিক ইংরেজী ও কারিগরি শিক্ষা চালু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রক্ষণশীলতার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। আবদুল লতিফের প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে পরাজয় মানতে হয়েছিল তাঁকে। ব্রিটিশ সরকারের নবাব উপাধি পাওয়া আবদুল লতিফ নিজের প্রভাব খাটিয়ে গতানুগতিক মাদ্রাসা শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। ইতিহাসবিদদের মতে, আবদুল লতিফের সক্রিয় তাৎপরতা ও তদ্বিরের জন্যই মূলত বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার সমান্তরালে গতানুগতিক মাদ্রাসা শিক্ষা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে উদারনৈতিক ও সংস্কারবাধী নেতাদের এই পরাজয় বাংলার শিক্ষা জগতে যে সুদূরপ্রসারি প্রভাব ফেলেছিল হেফাজতে ইসলামের সাম্প্রতিক উত্থান সে কথা মনে পড়িয়ে দেয়। যে ঘরানার মাদ্রাসায় হেফাজতের বিকাশ শিক্ষামন্ত্রীর তথ্যানুযায়ী সেই কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা দেশে এখন প্রায় একুশ হাজার। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেই জাতীয় পতাকা ওড়ে না। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। জাতীয় দিবস কাকে বলে এসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষকরা তা জানে না। বলার অপেক্ষা রাখে না এই গতানুগতিক মাদ্রাসা পড়ুয়াদের মননে মগজে আধুনিকতার আলো হাওয়া পৌঁছানোর ভেন্টিলেটর আগে ছিল না, এখনও নেই। উনিশ শতকে তারা যেমন নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে চোখ মেলার প্রয়োজন বোধ করেনি, একুশ শতকেও তাই। সদ্য কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদের সরকারী স্বীকৃতি তাদের মনের জানালা খুলে দেবে বলে আশা করছেন অনেকেই।

ধর্মকে অতি রক্ষণশীলতার বর্ম থেকে বের করে যুক্তির আলোয় আনার চেষ্টা ছিল বহু আগে থেকেই। অনেক উদারনৈতিক ইসলামী চিন্তাবিদ যুগোপযোগী করে ইসলামের ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। সেই আব্বাসীয় খলিফাদের সময় একদল মুক্তমনা ইসলামী দার্শনিক ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রাচীন গ্রীসের যুক্তিবাদী দর্শন ও দার্শনিক এরিস্টটলের যুক্তিবিদ্যায় তাঁরা গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু ধর্মের সঙ্গে যুক্তির সমন্বয় তাঁরা করতে পারেননি। বাধা এসেছিল গোঁড়া রক্ষণশীলদের কাছ থেকে।

ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আব্বাসীয় আমলে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ উৎকর্ষ অর্জন করে দর্শন বিজ্ঞান ইতিহাস চিকিৎসা শাস্ত্র অঙ্ক জ্যোতির্বিজ্ঞান সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি সব বিষয়ে মৌলিক অবদান রেখেছিলেন। তাঁদের অর্জিত জ্ঞানে প্রভাবিত হয়ে গ্রীকদের জ্ঞানচর্চা নতুনভাবে শুরু হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে আরবদের এ উৎকর্ষ মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে হয়নি। কারণ মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে অন্য কোন জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল না। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যে মাদ্রাসার উল্লেখ পাওয়া যায় তার নাম মাদ্রাসা সাফ্ফা। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হয়রত মুহাম্মদ (স)। এখানে স্বাভাবিকভাবেই কোরান পড়ানো হতো মুখে মুখে। কারণ সে সময় পর্যন্ত কোরান শরীফ লিখিত রূপ পায়নি। হযরত মুহাম্মদ (স.) এর মৃত্যুর দু’দশক পর কোরানের আয়াতগুলো সঙ্কলিত হলেও তাঁর সময়ে মুখে মুখে কোরান পড়ানোর যে পদ্ধতি চালু ছিল সে ধারা আজও চলছে। মাদ্রাসা সাফ্ফায় কোরানের তাফসির ও ফিকাহ্ শেখানো হতো।

মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমপর্যায়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৈমুর লঙের বংশধর উলুঘ বেক। চৌদ্দ শ’ বিশ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সমরখন্দের সবচেয়ে বড় উলুঘ বেক মাদ্রাসা। সেখানে মাদ্রাসার প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। তৈমুর লঙের পৌত্র উলুঘ বেক নিজে গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প-িত ছিলেন। ওই মাদ্রাসায় তিনিও পড়াতেন। সমরখন্দে তিনি একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং কোপারনিকাসের আগে নিজের আবিষ্কার করা টেলিস্কোপে অনেক নতুন তারার অস্তিত্ব খুঁজে বের করেছিলেন।

বাংলায় মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিলেন ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত উদার ও সংস্কারবাদী একদল তরুণ যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সৈয়দ আমীর আলী। তিনি ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রগতির ধারক হিসেবে। পবিত্র কোরানকে মুক্তমনে পাঠ করার কথা বলেছেন, কোন অনির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নয়। তাঁর পূর্বসূরি উত্তর ভারতের সৈয়দ আহমদ খান, যিনি এ উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে ইতিহাস হয়ে আছেন, তিনিও ধর্মের সঙ্গে আধুনিক উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী চিন্তাধারার সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উত্তর প্রদেশে তিনি সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলায় সৈয়দ আমীর আলীর উদার নৈতিক চিন্তায় বাধা এসেছিল রক্ষণশীলদের কাছ থেকে। যারা মানুষের চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনি। এই মৌলবাদী ধারাটিই পৃথিবীময় ইসলাম ধর্মের আগ্রাসী ইমেজ তৈরি করেছে।

আমাদের দেশে কট্টর ইসলামী মৌলবাদী দলের তৎপরতার সঙ্গে আমরা পরিচিত। স্বাধীনতার আগে ও পরে ভয়ঙ্কর সব কর্মকা- দিয়ে তারা নিজেদের পরিচয় স্পষ্ট করে রেখেছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম নিজেদের দ্বীনের সেবক এবং অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবি করে।

ইসলামের শান্তিপূর্ণ মানবিক ধারার চেয়ে মৌলবাদী ধারাটিই এখন পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইসলামের জঙ্গীবাদী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে নেপথ্যের খেলোয়াড়দের সুবিধা অনেক। তাদেরই অর্থ এবং অস্ত্রের জোরেই যে পৃথিবীময় মৌলবাদীদের এত দাপট- সচেতন মানুষ মাত্রই তা জানেন। তবে সব কিছুর পরও এ অঞ্চলের মানুষ শান্তিপ্রিয়। ইসলামের শান্তির ধারাতেই আস্থা রাখতে চান তারা।

নির্বাচিত সংবাদ