১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোডিয়াম সালফেটের আমদানিতে দেশীয় লবণ শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

সোডিয়াম সালফেটের আমদানিতে দেশীয় লবণ শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ অবাধে বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেটের আমদানির সুযোগে দেশীয় লবণ শিল্প ধ্বংসের দ্বাপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতি। সংগঠটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক সোডিয়াম সালফেট খাবার লবণ হিসেবে ব্যবহার, সোডিয়াম সালফেটের নামে ফিনিশড লবণ আমদানি, বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি এবং বিসিকের তথ্যবিভ্রাটের কারণে দেশীয় লবণ শিল্প ও চাষীরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

ইতোমধ্যে ৩ শতাধিক মিল বন্ধ হয়ে প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হওয়ার পথে রয়েছেন। অপরদিকে, সোডিয়াম সালফেট খেয়ে ভোক্তাদের লিভার, কিডনি ও পাকস্থলীর মতো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ জটিল রোগব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। অচিরেই সোডিয়াম সালফেট খাবার লবণ হিসেবে ব্যবহার বন্ধ না হলে পুরোজাতি মারাত্বক স্বাস্থঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে চাষীরা আগামী লবণ উৎপাদন মৌসুমের উৎপাদিত প্রাকৃতিক লবণ বিক্রি করতে পারবেনা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে।

বুধবার রাজধানীর স্থানীয় এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির পক্ষ থেকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সভাপতি নুরুল কবির।

তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, মানবদেহের জন্য বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে খাবার লবণ। প্রায় বিনাশুল্কে আমদানি করা যায় সোডিয়াম সালফেট, অন্যদিকে অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানিতে প্রায় ৯০ শতাংশ কাষ্টমস ডিউটি প্রদান করতে হয়। এতে করে শিল্পে ব্যবহারের জন্য সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে পরবর্তীতে তাই খাবার লবণ হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে। এছাড়া অনুমতি না থাকারপরও একটি অসাধু ব্যবসায়ীচক্র সরাসারি ফিনিশড লবণ আমদানি করছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন বিসিক বিষয়টি জানার পরও সোডিয়াম সালফেট আমদানি নিয়ন্ত্রণে কর্ণপাত করছে না। বরং লবণ ঘাটতির যে তথ্য দিয়েছে বিসিক তাও সঠিক নয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লবণের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে সোডিয়াম সালফেট দিয়ে।

তিনি বলেন, বছর প্রায় ৫ লাখ মেট্রিকটন (বিসিকের হিসেব মতে ১ লাখ ২৮ হাজার মেট্রিক টন) লবণ ঘাটতি থাকা স্বত্বেও আজ পর্যন্ত কোন লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হাজার হাজার টন সোডিয়াম সালফেট দেশে আনা হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র। সোডিয়াম সালফেট বাজারজাত করার কারণে দেশের ৩ শতাধিক লবণ মিল এখন বন্ধ প্রায়। এ অবস্থায় কিছু চিহ্নিতকারী অসাধু সিন্ডিকেট চক্র এ শিল্প ধবংসে মিল মালিক ও চাষীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

আমরা লবণ মিলমালিকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলতে চাই, লবণ চাষী ভাইয়েরা এবং লবণ মিলমালিকরা একে অপরের পরিপূরক। এ অবস্থায় দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষায় জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সোডিয়াম সালফেট আমদানি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। অথবা দেশীয় লবণ শিল্প রক্ষায় সোডিয়াম সালফেট আমদানিতে ১০০ ভাগ কাষ্টমস ডিউটি আরোপ করার কথা বলা হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয় লবণ নীতি অনুযায়ী বিগত দিনে ঘাটতি পূরণে লবণ আমদানির অনুমতি প্রদানের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু এই বছর তা করা হয়নি। বিসিকের তথ্য বিভ্রাটের কারণে শিল্পমন্ত্রী মহোদয় আমির হোসেন আমু কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চলতি বছরের লবণ মজুদের হিসেব নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ে লবণ সংক্রান্ত এক বৈঠকে ট্যারিফ কমিশনর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তথ্য বিভ্রাটের কারণে চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর ৪-৫ লাখ টন লবণ অবৈধভাবে আনা হয়ে থাকে। সাধারণত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি নিষিদ্ধ।

লবণ সাধারণত দেশেই উৎপাদিত হয়। তবে কখনো দেশে লবণের উৎপাদন কম হলে ঘাটতি লবণ আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। অন্যদিকে যে কেউ ইচ্ছে করলেই সোডিয়াম সালফেট আমদানি করতে পারেন। অনেক অসৎ আমদানিকারক প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে বাকিটা খাবার লবণ বলে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। অথচ কাঁচামাল সঙ্কটে এ খাতের ৩ শতাধিক মিল বন্ধ থাকলেও সরকার ঘাটতি লবণ আমদানির অনুমতি দিচ্ছে না। এতে করে সোডিয়াম সালফেট খাবার লবণ হিসেবে বাজারকরণ করা হচ্ছে। এ কারণে সোডিয়াম সালফেট আমদানি নীতিমালা তৈরির পাশাপাশি এর ব্যবহারের ওপরও নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজ বলে আমি মনে করি।

এদিকে, সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনেই গত কয়েকবছর ধরে অপরিশোধিত বোল্ডার লবণ আমদানি করা হয়েছে। গত ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিসিকের কথায় কর্ণপাত না করে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রণালয় যৌথ সিদ্ধান্তে যথাক্রমে ২.৫০ লাখ মেট্রিকটন এবং ৫ লাখ মেঃটন অপরিশেধিত লবণ মিলমালিকদের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঘাটতি থাকা স্বত্বেও বিসিকের কারণে আজ পর্যন্ত আমদানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।

এ অবস্থায় লবণের পরিবর্তে দেশের ভোক্তা সাধারণ নিজের অজান্তেই বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেট খাবার লবণ হিসেবে গ্রহণ করছে। জনবসতিপূর্ণ ১৮ কোটি মানুষের দেশে চাষী ও মিলমালিকদের হাতে ৪ লাখ মেঃটন লবণ সব সময় মজুদ থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।