১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খালেদা তারেকের অধ্যায় শেষ ॥ সুস্থ ধারার পথে রাজনীতি -স্বদেশ রায়

’৯১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুনের রাজনীতি থাকার কথা ছিল না। খালেদা ও তারেক রহমান এই খুনের রাজনীতি নতুন করে চালু করেন। তারা জিয়াউর রহমানের সেই খুনের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি। অন্যদিকে ’৯১-এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালুর পরে জামায়াতের রগকাটা, চাপাতি কোপের রাজনীতিও সকল গণতান্ত্রিক দল মিলে বন্ধ করা উচিত ছিল। এই ’৭১-এর খুনীদের রগকাটা, চাপাতি ও চাইনিজ কুড়ালের রাজনীতি ফুলে-ফেঁপে বেড়ে উঠতে দিল বিএনপি অর্থাৎ খালেদা ও তারেক। তাই ’৯১ পরবর্তীতে খুনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার যে বিষয়টি সম্মিলিতভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেটা এখন ২০১৮তে এসে হতে যাচ্ছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় রাজপথে রিপোর্ট করতে গিয়ে বার বার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দেখা হতো, অর্থাৎ তাদের মিছিল-মিটিং কভার করতে হতো। তার পরেও মনে হতো, এরশাদের পতনের পরে এই খুনের রাজনীতি বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এই ভুলটি প্রথমে ভাঙিয়ে দেন নাম না জানা এক মুক্তিযোদ্ধা। সম্ভবত ঘটনাটি ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০ হবে। এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। রাজপথে তখন মিছিল আর মিছিল। সবার ভেতর একটা ঈদের খুশির আমেজ। তার ওপরে আমরা যারা সচিত্র সন্ধানীর আড্ডা ঘিরে আছি, তাদের একটু বেশি। কারণ, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীর সবাই সেখানে আসছেন। তাদের হিসাব নিকাশে বাংলাদেশ তখন নবজন্ম পেয়েছে। এ সময়ে সম্ভবত ৫ তারিখের সকাল ১১টার দিকে তোপখানা মোড় থেকে হেঁটে প্রেসক্লাবে যাচ্ছি, ফুটপাথ ধরেই হাঁটছি। ওই সময়ে প্রেসক্লাব থেকে একটি বিশাল মিছিল বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের দিকে যাচ্ছে। সচিবালয়ের দেয়ালের পাশঘেঁষা ফুটপাথে হঠাৎ আমার শরীরে এক ভদ্রলোকের শরীরের ধাক্কা লাগে। স্যরি বলি, তবে ভদ্রলোক তা না শুনে স্বগত উক্তি করেন, ‘বুকটা ফেটে যায়, বাংলাদেশের বুকে জামায়াতে ইসলামীর এত বড় মিছিল।’ ভদ্রলোকের কথা শুনে থমকে দাঁড়াই। তিনি আদর করে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, ছোট ভাই দেশের ভবিষ্যত ভাল নয়। বলে কিছুটা এলোমেলোভাবে বললেন, সহ্য করতে পারি না ছোট ভাই, সহ্য করতে পারি না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, বলো কীভাবে সহ্য করব? ভদ্রলোক চলে গেলেন। তাঁর পরিচয় জানা হলো না। তবে প্রেসক্লাবে আর যাওয়া হলো না। কেমন যেন জনতায় ভরা রাজপথে একা হয়ে গেলাম। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম, তাহলে দেশের ভবিষ্যত কি? এরশাদের পতনের ভেতর দিয়েও কিছু হয়নি? এখন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী থেকে আজ অবধি হিসাব মেলাই, সে হিসাব নিয়ে বিস্তারিত বই লেখা যায়। মাঝে মাঝে লিখতে ইচ্ছে হয়। তবে সময় করতে পারি না। যাক সে কথা। তবে ওই যে মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাই চোখ খুলে দিলেন, তারপরে সেই খোলা চোখে অনেক কিছুই কয়েকদিনের ভেতর দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম অনেক ষড়যন্ত্র। যা হোক, ওই মুক্তিযোদ্ধা ভদ্রলোকের কথাই সত্য হলো। বাংলাদেশে জামায়াতী ইসলামী রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশ হলো। দেশে জঙ্গীরা প্রকাশ্য হলো। তাদের অভয়ারণ্য হলো। সর্বোপরি, প্রগতিশীল রাজনীতি ধ্বংস করে দেয়ার জন্য শেখ হাসিনা হত্যা চেষ্টার ২১ আগস্ট হলো।

তবে, আবার ইতিহাস সোজা পথে চলা শুরু করল ২০০৮ থেকে; আর এই দশ বছরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ফাঁসি হয়েছে। জামায়াতের নেতাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি হয়েছে। ’৯১-এর পরে খুনের রাজনীতির আমদানিকারক খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিচার হচ্ছে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের যাবজ্জীবন জেল হয়েছে। দুর্নীতির মামলায় খালেদার দশ বছর জেল হয়েছে। ২১ আগস্ট মামলার আসামি থেকে খালেদা কেন বাদ গেলেন সেটা বড় প্রশ্ন। তবে পেট্রোলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যা মামলার তিনি হুকুমের আসামি। দেশ স্বাভাবিক গতিতে চললে এসব মামলার বিচার কাজও শেষ হবে। আর দেশ স্বাভাবিক গতিতেই চলবে। কারণ, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্র আর গ্রহণ করছে না বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে। তার ফলে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি আর তাদের নেতা হিসেবে তারেক বা খালেদাকে রাখতে পারছে না।

রাজনীতির এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়া কিছু ব্যক্তি এসে যোগ দিয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোটে। তারা বিএনপির নেতা ও চালিকাশক্তি হতে চাচ্ছেন। এদের ভেতর ড. কামাল মূল নেতা হয়েছেন। আগামী ৮ তারিখের পরে ড. কামাল কতদিন আর দেশে থাকেন, সেটা এখন দেখার বিষয়। বাদবাকি আসম রব, কাদের সিদ্দিকী, মান্না যারা যোগ দিয়েছেন তারা আলোচনার বিষয় নয়। তারাও শীঘ্রই ছিটকে পড়বেন। তাছাড়া এরা সকলেই ছিটকে পড়া বস্তু। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্ব থেকে খালেদা ও তারেকের অবসান ঘটলে একটা ভূমিকম্প হবে বিএনপিতে। ভূমিকম্পের স্বাভাবিক নিয়মে বড় বড় ফাটল দেখা দেবে। আর ভূমিকম্পের ওই কাঁপনে যাদের ভিত্তি নেই, তারা ছিটকে পড়বে। তাই রব, কাদের, মান্না এ সমস্ত পরজীবী তো ছিটকে পড়বেই। আর সেটা আগামী কয়েক দিনের ভেতরই ঘটবে। এর পরে দেখা যাবে বড় বড় ফাটলগুলো বিএনপিকে কী আকৃতি দেয়? এখানে কতকগুলো আকৃতির কথা হিসাব করা যেতে পারে। যেমন, খালেদা ও তারেক অনুরক্ত একটা গ্রুপ ফাটলের পরে একটা প্লেটে গিয়ে আশ্রয় নেবে। তারা নিঃসন্দেহে উগ্রপন্থা নেবে। তাদের এ মুহূর্তের উগ্রপন্থা হবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো। তবে ফাটলের পরে সৃষ্ট এই উগ্র প্লেটটি ছাড়াও বেশ কিছু স্থির অংশ থাকবে অন্যান্য প্লেটে। পাশাপাশি দেশ এখন নির্বাচনমুখী। দেশের সব প্রান্তে বিএনপির প্রার্থীরা টুকটাক জনসংযোগ করছে। তাদের একটি বড় অংশ যে কোন মূল্যে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। এদের অনেকের অবস্থা হবে ভূমিকম্পের পরে গলিত লাভার যে অবস্থা হয় তাইÑ অর্থাৎ তারা নানাদিকে গতিপথ সৃষ্টি করবে। এই গতি পথে কে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা বলা কষ্টকর। তবে এটুকু বলা যায়, এরা নানা স্থানে অবস্থান নেবে শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য। অন্যদিকে উগ্রর বদলে শান্ত বা পরিপক্ব যে মাথাগুলো আছে তারা স্বাভাবিকভাবে ফাটলের ফলে আরেকটি প্লেটে জড়ো হবে। বলা যায় না, এরাই হয়ত বেশি অংশ হতে পারে। এরা তখন মূল বিএনপি হওয়ার চেষ্টা করবে খালেদা ও তারেক রহমানকে ছাড়া। আর উগ্র অংশটি আইনগতভাবে খালেদা ও তারেককে নেতৃত্বে রাখতে না পারলেও তারা খালেদা ও তারেক সমর্থক অংশ হিসেবে থাকতে পারে।

তবে ভূমিকম্পের পরে বিএনপিতে যতগুলো ফাটল হোক না কেন, যতগুলো রূপ নিক না কেন, ইতিহাসের সত্য হবে খালেদা ও তারেক আর রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন না। তারা খুব দ্রুতই বাংলাদেশের রাজনীতির অতীত ঘটনায় পরিণত হবেন। আর খালেদা ও তারেক রাজনীতি থেকে বাদ গেলে যে বিএনপি তৈরি হবে, ওই বিএনপি আর জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক থাকতে পারবে না। যার ফলে দেশে জামায়াতে ইসলামী তাদের রগকাটা রাজনীতি করার জন্য কোন আশ্রয়স্থল পাবে না। অন্যদিকে খালেদা তারেকবিহীন বিএনপি খুনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হবে বা তারা বেরিয়ে আসবে। তাই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আশা করার সময় এসেছে, আগামী কয়েক দিনে রাজনীতিতে যা ঘটতে যাচ্ছে তা শুধু খালেদা ও তারেকের অবসান নয়, রাজনীতি একটি সুস্থ ধারায় ফিরতে যাচ্ছে।

swadeshroy@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ