১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টকটাইম ফেরতের হার

  • নাজমুল হক

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিশ্ব আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। এর ফলে আমরা পৃথিবীর যে কোন তথ্য পাচ্ছি অতি দ্রুত এবং একে অপরের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে সক্ষম হচ্ছি। আর এই দ্রুত যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোন যেমন আমাদের উপকার দিচ্ছে তেমনি রয়েছে কিছু সমস্যা। তন্মধ্যে অন্যতম ও প্রধান সমস্যা হলো কলড্রপ। সাধারণ গ্রাহকদের সর্বাধিক অভিযোগ এই কলড্রপ নিয়েই। মোবাইলে কথা বলা চলাকালীন হঠাৎ করেই অপরপক্ষের কথা শোনা যায় না অথচ স্ক্রিনে নেটওয়ার্ক সচল ও সেকেন্ড বেড়েই চলে। কেটে দিয়ে পুনরায় কল দিলেও একই অবস্থা। সবসময় এ রকম কলড্রপ চলতেই থাকে। এতে করে গ্রাহকদের ভোগান্তির শেষ নেই। একদিকে যেমন এটা গ্রাহকদের জন্য সময় নষ্ট ও বিরক্তিকর অন্যদিকে ব্যালেন্স থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। উভয়দিক দিয়েই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে গ্রাহকরা। শুধু আমরা নয় বরং এমপি, মন্ত্রীরাও বাদ যাচ্ছে না কলড্রপের আগ্রাসন থেকে। তাই তো বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘গ্রামীণফোন ব্যবসার জন্য কলড্রপ করে। গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় একটা কলে ৪-৫ বার কলড্রপ হয়। এটা বাস্তবসম্মত না। এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এতে বোঝা যায়, দেশের প্রতিটি মানুষই কলড্রপের শিকার। তাহলে কি এই সমস্যা থেকে উত্তরণ পাব না?

বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, ‘চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত গ্রাহক ছিল ১৫ কোটি ৪১ লাখ ৭৯ হাজার’ যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যে হারে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে না। তাই গ্রাহক সংখ্যার আধিক্যর জন্য নেটওয়ার্ক বিঘিœত হয়ে কলড্রপের সৃষ্টি করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি পর্যাপ্ত নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে কেন? অথবা বাজারে নতুন নতুন সিম কেন? অপারেটররা অধিক লোভের বশবর্তী হয়ে আজ সাধারণ গ্রাহকদের জিম্মি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এর কি কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নেই? অথচ এ বিষয়ে কোন ভ্রক্ষেপ নেই কারোরই। বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে কলড্রপের সংখ্যা ২২২ কোটি। তন্মধ্যে, গ্রামীণফোনের ১০৩ কোটি ৪৩ লাখ, রবির ৭৬ কোটি ১৮ লাখ, বাংলালিংক ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ও টেলিটকের ৬ কোটি। বিটিআরসির ২০১৬ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘কোন মোবাইল সংযোগ থেকে দিনে একের অধিক কলড্রপ হলে এক মিনিট টকটাইম ফেরত দিতে হবে এবং সেটা এসএমএসের মাধ্যমে জানাতে হবে।’ কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। বেশিরভাগ গ্রাহক এ সুযোগ পাচ্ছে না। এবার আসি কে কতটুকু পূরণ করেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অপারেটর গ্রামীণফোন ১০ কোটি ৩৩ লাখ, রবি ৬ কোটি ৮২ লাখ, বাংলালিংক ৪ কোটি ৯৪ লাখ ফেরত দিয়েছে। হিসাব অনুযায়ী আরও ১০০ কোটি কি তাহলে কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে? এর কি কোন সুরাহা হবে না? বিটিআরসির কাছে তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন নীরব ভূমিকা, এইটা ভাবার বিষয়।আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের নির্ধারিত মান অনুযায়ী, ‘বেতার তরঙ্গ নির্ভর মোবাইল নেটওয়ার্কে ৩ শতাংশ কলড্রপ গ্রহণযোগ্য।’ অপারেটরদের দাবি, ‘তাদের কলড্রপ ৩ শতাংশের নিচে আর ১ শতাংশের বেশি নয়।’ সে তুলনায় কলড্রপ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে অপারেটরদের কথার বড় ফারাক দেখা যায়।

কলড্রপের কারণ হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৪টি সক্রিয় মোবাইল ফোন অপারেটরের কাছে ১১৫ মেগাহার্জ বেতার তরঙ্গ রয়েছে যা দিয়ে ১৩ কোটি ৯৩ লাখ গ্রাহক সেবা গ্রহণ করছে। এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইন্টারকানেকশান এক্সচেঞ্জ বা আইসিএক্স রাখার কারণে ওই এক্সচেঞ্জের সক্ষমতার অভাবে কলড্রপ হচ্ছে। এক অপারেটরের সঙ্গে অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক যুক্ত করে থাকে আইসিএক্স। কিন্তু অন্যান্য দেশগুলোতে এই কাজটি করে অপারেটররা নিজেরাই। ফলে খরচ কম লাগে, গ্রাহকের ওপর চাপ কমে। এখানে বিটিআরসির দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। সরকার বেতার তরঙ্গে বরাদ্দ করলে এবং বেতার তরঙ্গ ব্যবহারে প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করার সুযোগ দিলে গ্রাহক সেবার মান উন্নত হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে