১৩ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

হাজার বছর ধরে নানা জাতি-ধর্মের মানুষ এই ভূখণ্ডে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এ দেশের সুমহান ঐতিহ্য। বাংলাদেশের পরিচিতি মূলত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে। এ দেশের মানুষ নিজ নিজ ধর্মে নিষ্ঠাবান হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে তারা অনুকরণীয় আদর্শ বলে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক বলেই ভিন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতার আদর্শ এ দেশে মূর্তমান। দেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও বকধার্মিক ও কা-জ্ঞানহীনদের কারণে কখনও কখনও তাদের সুনামও কণ্টকিত হয়ে ওঠে। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ বহু দেশে সংখ্যালঘুরা যেভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে হিসেবে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত বটে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে অব্যাহত রাখতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সম্মিলিতভাবে এ ঐতিহ্যকে অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ স্কাউটসের জাতীয় কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভায় তিনি ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে এ আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে আবহমানকাল ধরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের লোক একত্রে আন্তরিকতা আর সৌহার্দ্যরে সঙ্গে বসবাস করে আসছে। ইসলাম বিশ্ব মানবতার ধর্ম, কল্যাণ ও শান্তির ধর্ম। এ ধর্ম কখনই অন্য ধর্মের উপাসনালয় কিংবা বাড়িঘরে হামলা করার অনুমোদন দেয় না। বরং ইসলামী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইসলাম কখনও কোন ধরনের সহিংসতা, হানাহানি ও অন্যায় কর্মকা- সমর্থন করে না। তবে এ দেশে বকধার্মিক, ধর্মান্ধ, ধর্ম ব্যবসায়ী, কূপম-ূকদের তৎপরতা নানা সময়ে দেখা গেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেশের ঐতিহ্যের অংশীদার বেশ কিছু মূল্যবান স্থাপনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

কেউ যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তাহলে তা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সচেতন সব মানুষের এগিয়ে আসা উচিত। এদেশে সকল ধর্মের মানুষ একে অপরের সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসে। একসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন করে থাকে। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। সকল ধর্মের মানুষের মধ্যে এমনতর সম্প্রীতির বন্ধন পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়। তাছাড়া সকল ধর্মের নানা আচার, অনুষ্ঠান, উৎসব বেশ জাঁকজমকের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। এ দেশে তাই উচ্চারিত হয় ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ ধর্মীয় উৎসবগুলোতে সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ এবং সৌহার্দ্যে এক অভাবনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়।

এদেশে পাকিস্তান পর্বে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যেমন ছড়ানো হয়েছিল, তেমনি পঁচাত্তর পরবর্তী সময়েও হানাহানি, হাঙ্গামা কম হয়নি। পাকিস্তানী সামরিক শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নানাবিধ নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে তাদের একটা বড় অংশকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। অনেকের জীবনাবসান ঘটানো হয়। অবাঙালীরা বাড়িঘর, জমি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দখলের জন্য হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, যা কলঙ্কিত ইতিহাস। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ধর্ম ও সাম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। ধর্মনিরপেক্ষ মূলমন্ত্র যে দেশের, সেখানে এই জাতীয় দলের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সামনে নিয়ে আসে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা। ধর্ম ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বহাল করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধী গণহত্যাকারী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার করা হয় পরবর্তীকালে। সামরিক শাসকদের তত্ত্বাবধানে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালানো হয় ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এমন নিপীড়ন চালায় যে, তাদের অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয়। ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিনষ্ট করার চক্রান্ত অবশ্য ব্যর্থ হয়। শেখ হাসিনার সরকার গত দশ বছরে ক্ষমতায় থাকাকালে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনে। বিশ্বে বাংলাদেশকে সম্প্রীতির মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে হলে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে।

নির্বাচিত সংবাদ