১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুটি জোট দুই অবস্থানে থাকবে কি?

  • মমতাজ লতিফ

দুটি জোট- ঐক্যফ্রন্ট ও যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছেএ বাইরের চেহারায় যাদের মধ্যে একটি- বিএনপিপন্থী যেটি বিএনপির উদ্যোগে গঠিত, সুতরাং এ জোটের অবস্থান খুবই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। জাতি কিছুটা বিস্ময়ের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনকে বিএনপি ঘরানার সঙ্গে অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধী-মিত্রদের নেতৃত্ব দিতে দেখে কিছুটা আশাহত হয়েছে! কিন্তু প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের ঐক্যফ্রন্টের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত, ঐক্যফ্রন্টের প্রতি সংবাদপত্রের সঙ্গে মানানসই নয় এমন অতিরিক্ত সমর্থন দিয়ে সরকারকে, প্রধানমন্ত্রীকে দোষী করে সংবাদ বিশ্লেষণ, রিপোর্টিং দেখে জনগণ বিশেষত আমরা যারা ভেবেছিলাম যে, ড. কামাল আর যাই হোক, যুদ্ধাপরাধীর মতো, ফৌজদারি মামলা, দুর্নীতি-অর্থ আত্মসাত ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশ দাতার মামলায় দ-িত হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুক্তি চাওয়ার দাবিটি তাদের দাবির তালিকায় রাখবেন না। তাছাড়া, কিছুদিন আগেই পেট্রোল বোমা হামলা করে বিএনপি নেত্রী দু’শ’রও বেশি মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে- সেটি তাঁর, শিক্ষিত ও মানবিক মনে স্থায়ী চিহ্ন না ফেলে পারে না- এ ধারণা দেখা যাচ্ছে মহা ভুল ছিল! তিনিই প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধী ও পাকিস্তানের মিত্র বিএনপির আত্মিক অভিভাবক হয়ে উঠেছে যা বিস্ময়কর। এ কাগজ দুটির খবর ও খবর পরিবেশনের কৌশল এবার জাতির কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে। অপরদিকে, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক যিনি দীর্ঘকাল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তার যুক্তিপূর্ণ দাবিগুলো এবং আইনিভাবে দ-িত বিএনপি নেত্রীর অযৌক্তিক, বেআইনী মুক্তি দাবি না করা দু’জনের আদর্শিক অবস্থান যে বিপরীত তা স্পষ্ট করেছে। অথচ ড. কামাল ছিলেন দীর্ঘদিন যাবত বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ, তাঁর প্রথম মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রী, এমনকি আওয়ামী লীগ থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হয়েছিলেন!

ড. বদরুদ্দোজা তারেকের উত্থানের পর ২০০১-এর বিতর্কিত নির্বাচনে জিতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রথমপ্রেসিডেন্ট হন। যাকে খুব অল্পদিন পরেই খালেদা, নিজামী, তারেক পুরোপুরি বেআইনীভাবে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন! সেই ড. বদরুদ্দোজা যেন ড. কামালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন আর ড. কামাল যেন বিএনপি নেতা ও তাদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা গ্রহণ করলেন! এ দৃশ্য ছিল জাতির কাছে অভাবনীয়, তবুও এটি সংগঠিত হয়েছে! রূপকথার সেই- ‘দাসী হলো রানী, রানী হলো দাসী’, কথাটি মনে হচ্ছে খনার বচনের মতো অভ্রান্ত! তা না হলে চিরকালের মুক্তিযুদ্ধপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা, বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন বিশিষ্ট আইনবিদের উপস্থাপিত দাবিতে কেন থাকে আইনে দ-িত বাংলাদেশের এক বড় দুর্নীতিবাজের বেআইনী মুক্তির দাবি? তাঁর দাবিতে কেন থাকল নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেবার কথা? একজন আইনবিদ তো দেখেছেন ২০০১ এর লতিফুর রহমান গং য়ের বানানো নির্বাচনী ফল তৈরির পক্ষে কাজ করতে বাংলাদেশে এই প্রথম ও শেষবার সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়ে নির্বাচনে ব্যবহার করে সারাদেশে কি ব্যাপক সহিংসতা, হামলা, হত্যা, লুট, ধ্বংসযজ্ঞ, দেশত্যাগ ও গ্রাম থেকে উৎখাতের শিকার আওয়ামী রাজনীতিক এবং হিন্দুদের করা হয়েছে! এ সময়ে (২০০১-২০০৬) আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী সমর্থক এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু দেশত্যাগ ও গ্রামত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল! তিনি যদি তারেকের নির্দেশে বা অনুরোধে ঐক্যজোটের নেতৃত্ব দেন, তাহলে গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ তারেকের কাছে নতি স্বীকার করতে পারেন কি? ড. কামাল এতকাল ধৈর্য ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধপন্থী রূপটি ধরে রেখে এখন কোন চাপে তার ভিন্ন, প্রকৃত রূপটি, আসল চরিত্রটি, তিনি কাদের লোক, কাদের পক্ষে, তাই জানান দিলেন কি? উদঘাটন করলেন কি তার প্রকৃত অবস্থান? দেশে তো বর্তমানে এমন কোন সঙ্কট, সমস্যা, অশান্তি নির্দেশ দেন তাহলে কি তারেকের চেয়েও শক্তিশালী অন্য কোন শক্তির বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে সব উন্নয়ন যজ্ঞকে ধ্বংস করার ব্রতে ব্রতী তাদের শেষ ঘুঁটি-খালেদা-তারেকের পক্ষে যখন বাস্তব ক্ষেত্রে নামার এবং খেলার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে, তখন তাদের শেষ খেলুড়ে কে এবার নামানো হলো কি? এ প্রশ্ন জাতির, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধ পন্থী বুদ্ধিজীবীদের মনে না উঠে পারে না।

জাতি ড. কামালের এই আকস্মিক ইউটার্ন, যুদ্ধাপরাধী-মিত্র প্রীতি, বে-আইনী, অসাংবিধানিক অবস্থান গ্রহণের পেছনে নেপথ্যে বড় কোন শক্তি রয়েছে বলে মনে করে ? কেননা তিনি তারেক, মির্জা ফখরুলদের অনুরোধে এতবড় ঢেঁকি গিলবেন, এটি অবিশ্বাস্য! যদিও মা, পুত্র বর্তমানে গায়ের জোর দেখাবার অবস্থান হারিয়ে, রাজ্যপাটও প্রায় হারিয়ে ফেলার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন এস. কে সিনহার ওপর ভর করে তাঁকে শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য করেছে- এসব গোয়েবলসীয় প্রচারণায় যে জনগণের মন ভিজেনি, তা তো তারা দেখেছে! এখন কি তাহলে দুইয়ে দুইয়ে চার অঙ্কটি মিলে যাচ্ছে? নতুবা এখন কেন জনগণ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারছে- বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে ড. কামালের ভূমিকা থাকার সন্দেহের কথা?

তাহলে জিয়া, খালেদা, ড. কামাল কি অনেক আগে থেকেই আইএসআই অথবা পাকিস্তান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিবাহসূত্রে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্ত ছিলেন? আইএসআই এবং পাকি সেনাদের বাংলাদেশে ধ্বংসের দাবা খেলার প্রধান ঘুঁটিগুলোর যখন পতন হয়েছে, তখন কিন্তু তাদের শেষ চেষ্টাটি করবারই কথা।

বিনা যুদ্ধে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার হাতে ছেড়ে দিয়ে তার পরিকল্পনায় কেবল তাকেই একা খেলবার সুযোগটি ওরা নীরবে মেনে নেবে- তাই কি হতে পারে? ড. কামালকে এটা তো মানতেই হবে, তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে বর্ডার পার হননি! তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাহায্য সহযোগিতা, বক্তব্য-বিবৃতি, অর্থ সংগ্রহ ইত্যাদি কাজের কোনটিই তো করেননি! তাহলে, কিছু একটা না করে তিনি পাকিস্তানে অলস বসে থাকেননি নিশ্চয়। এতদিন একটা কথা প্রচারিত ছিল, উনি পাকিস্তানের অন্য কোন্ কারাগারে বন্দী ছিলেন। এখন সেটাও সত্য নয় বলে জানা গেছে। তাহলে পাকিস্তানী নারীর স্বামীকে পাকিস্তান সরকার আদর-যতেœ রেখেছিল কি? যেমন খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসে রেখেছিল?

অপরদিকে ডা. বদরুদ্দোজা হয়তো জিয়ার সহচর হয়েও আইএসআই এর তৈরি বিএনপি দলের প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি হয়েও যথেষ্ট পরিমাণ আইএসআই এর বিশ্বস্ত ঘুঁটি হয়ে উঠতে পারেননি! অথবা আইএসআই তাকে কোন বিশেষ কারণে আস্থাভাজন বিশ্বস্ত ঘুঁটি গণ্য করেনি! ২০০১ এ প্রেসিডেন্ট হয়ে ডা. বদরুদ্দোজার বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা অর্পণ, সন্দেহ নেই, ঐ অশুভ গোষ্ঠীর কাছে বিশ্বাসঘাতকতার সমান গণ্য হয়েছিল কি?

যখন সম্প্রতি ঐক্যজোট বিকল্প ধারাকে বর্জন করল বা করতে বাধ্য হলো, তখন আর যে না হোক, আমি ধারণা করেছিলাম যা বদরুদ্দোজা তার যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-মুক্ত জোট যুক্তফ্রন্ট বা এ জাতীয় কিছু একটা গঠন করবেন এবং সেটি হয়তো হবে জাতির জন্য সবদিক থেকে মঙ্গলজনক। কেননা জাতির জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী দলকে সরকারে এবং বিরোধী দলে দেখতে পারা যারা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের ও জাতির উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে এবং সবরকম ধ্বংসাত্মক কাজকে অপরাজনীতি গণ্য করবে। তাই এদের থেকে সাবধান।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক