১৪ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুরু হলো ঢাকা লিটফেস্ট, উৎসবমুখর মুক্ত চিন্তার প্রতিচ্ছবি

শুরু হলো ঢাকা লিটফেস্ট, উৎসবমুখর মুক্ত চিন্তার প্রতিচ্ছবি

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ কত্থকের নাচের নান্দনিকতায় শুরু আয়োজন। সেই সৌন্দর্যে হেমন্তের সকালটা হয়ে ওঠে প্রাণময়। এরপর ধীরে ধীরে ডানা মেলে উৎসব। উঠে আসে সাহিত্যের কথকতা। শিল্পের সঙ্গে সাহিত্যের সখ্যে বাংলা একাডেমির বিশাল আঙিনাটি পরিণত হয় সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। সময়ের গান আর অসময়ের কবিতা শীর্ষক অধিবেশনে ছড়ায় মুগ্ধতা। কবিতা পাঠের আসর টেনে নেয় সাহিত্য রসিককে। সেই সঙ্গে নানা দেশের শিল্পী-সাহিত্যিকের বহুমাত্রিক বিষয় নির্ভর কথোপকথনে মুক্তচিন্তার প্রতিফলন ঘটে আয়োজন জুড়ে। পাশাপাশি উৎসবের চারপাশজুড়ে রকমারি বইয়ের সম্ভার নিয়ে ছড়িয়ে আছে বুক স্টল। বিকেলে উর্দু ভাষার লেখক সাদাত হোসেন মান্টোকে নিয়ে নির্মিত ছবির পাবলিক প্রিমিয়ারে ঢল নামে সিনেমারসিকের। এভাবেই শিল্প-সাহিত্যের যুগলবন্দী উদ্যাপনে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হলো ঢাকা লিট ফেস্ট। তিনদিনের এ আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশের তিনশতাধিক কবি-সাহিত্যিক, লেখক, অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা গবেষক, সাংবাদিক ও প্রকাশক। এর মধ্যে আছেন দেড় শতাধিক দেশের কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংবাদিক। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় উৎসবের আয়োজক যাত্রিক। সহযোগিতায় রয়েছে বাংলা একাডেমি।

বৃহস্পতিবার সকালে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে মুনমুন আহমেদ, অপরাজিতা মুস্তাফা এবং রেওয়াজ পারফর্মিক আর্টের কত্থক নৃত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় লিট ফেস্টের উদ্বোধনী আয়োজন। উৎসব উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্্ সিদ্দিকী ও আহসান আকব, পুলিৎজারজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক এ্যাডাম জনসন এবং ভারতের প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা নন্দিতা দাস।

উদ্বোধনী বক্তব্যে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ একটি সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানালে তিনি অগ্রাহ্য করেন। তিনি বলেন, আমি একজন রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিকদের এই মিলন মেলায় আমি কীভাবে যাই। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আমাকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করলে একটি শর্ত আছে। ওই সাহিত্য সম্মেলনে কবি জসীমউদদীন, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরীকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। এটা থেকেই বোঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল এবং জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস করতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তাধারা ঠিক একই রকম। তিনি সব সময় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

কাজী আনিস আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিককালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে বাকস্বাধীনতা হরণের একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা লিট ফেস্ট সবসময় মুক্তচিন্তা এবং বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ঢাকা লিট ফেস্ট বরাবরই নারী, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে। লিট ফেস্টে কেউ কথা বলতে বাধার সম্মুখীন হয় না। এটা একটি মুক্ত জায়গা, খোলামেলা আলোচনা করার জন্য।

সাদাফ সায্ সিদ্দিকী বলেন, বিশ্বের সব জায়গায় মুক্তচিন্তার জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, সেখানে এ রকম আয়োজন করতে গেলে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের আয়োজনে আমরা যেসব বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করব তা বিশ্বের কোথাও হয়ত একত্রে করা সম্ভব নয়। নারীবাদ, #মিটু, রোহিঙ্গাসহ নানা বিষয়ে আলোচনায় উঠে আসবে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা। ফলে ঢাকা লিট ফেস্টের ধারণাটি অনেক শক্তিশালী।

আহসান আকবার বলেন, পুলিৎজার, অস্কার, কমনওয়েলথের মতো নামীদামী পুরস্কার বিজয়ীরা এবার এসেছেন, যাদের নাম নিয়ে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশকে বিশ্বের সাহিত্যের বাজারে নিয়ে যাওয়াই এ আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য।

‘ভাঙ্গা-গড়ার দিনগুলোÑস্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধু’ ॥ একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘ভাঙ্গা-গড়ার দিনগুলো : স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা। এতে ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’, ‘মুজিব ভাই’ ও ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ এ্যান্ড ট্রাজেডি’ নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, গবেষক ও লেখক আফসান চৌধুরী এবং গবেষক কাইয়ূম খান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফিরোজ আহমেদ।

আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইগুলো থেকে জানা যায়, তারা বঙ্গবন্ধুর সময় নষ্ট করে নিজেদের কতৃত্ব দেখালেও বঙ্গবন্ধুর অনেক ক্ষতি করেছিল।

‘চেনা বিশ্বে চলছে বিরামহীন যুদ্ধ’ : ‘ক্র্যাশিং রিয়েলিটিস’ শিরোনামে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মঞ্চে কথা বলেছেন পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ। তার সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ সাহিত্য ম্যাগাজিন গ্রান্টার নির্বাহী সম্পাদক রস পর্টার।

মোহাম্মদ হানিফ বলেন, যখন আমি প্রথম শ্রেণীতে পড়াশোনা করি তখন বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুদ্ধ এবং যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ! সেই যুদ্ধ এখনও চলমান। বিরামহীন, নামহীন, ক্লান্তিহীন এক যুদ্ধ ! নিজের বক্তৃতায় তিনি বারবার ব্যঙ্গ করে তুলে এনেছেন গুম হয়ে যাওয়ার ভয়। জন্মভূমির প্রিয় বন্ধুদের কথা স্মরণ করেছেন বারবার যাদের গুম করা হয়েছে।

‘সময়ের গান, অসময়ের কবিতা’ ॥ ‘সময়ের গান, অসময়ের কবিতা’ অধিবেশনে যোগ দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তারা শুনিয়েছেন তাদের বেড়ে ওঠার গল্প। কি করে হলেন সাধারণ থেকে বিশেষ। এ অধিবেশন সঞ্চালনা করেন কবি শামীম রেজা।

নেতা না অভিনেতা- কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, অনুভবের জায়গা থেকে কথা উঠলে বলব- এখন নাটক করছি। গ্যালিলিও নিয়ে মঞ্চে ফিরেছি। জীবনে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, বিতর্ক, নাটক, ফুলের বাগান, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ সবই করেছি। তাই কোনটাই ঠিকঠাক করা হয়ে ওঠেনি। তবে যেদিন নাটক করে বাড়ি ফিরি, আমার চিকিৎসক স্ত্রী আমার রক্তচাপ ঠিকঠাক থাকে! অন্যদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকে। আবার রাজনীতিতে মানুষের যে ভালবাসা, মানুষের জন্য কিছু করতে পারার যে আনন্দ, তা অনন্য। সত্যি বলতে দু’দিকেই একটা আনন্দ আছে, প্রাপ্তি আছে।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, একটা সময় মানুষ বই পড়ত। এখন অবশ্য সেটা কমে গেছে। এ সময় তিনি মজা করে বলেন, এখন কিছু লিখে বাড়িতে পড়তে দিলেও মেয়ে পৃষ্ঠা উল্টে বলে ৫০০ টাকা দাও। এটা পড়তে তো আমার সময় লাগবে !

যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা ॥ উত্তর আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের সূচনাপর্বে ক্ষমতায় আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান সময়ের গ-ি বিবেচনায় দুই শ’ বছরের পুরোনো এই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভবিষ্যত খুঁজতে আলাপে বসেন এ্যাডাম জনসন, ডেভিড বিয়েলো, জেমস মিক, কোর্টনি হোডেল ও নিশিদ হাজারি। ‘পোস্ট-আমেরিকা ফিউচার’ শিরোনামে ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধনী এই অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন উৎসবের অন্যতম পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ।

এ্যাডাম জনসন বলেন, যেকোন কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থার ফলাফল হিসেবে শোষিত গোষ্ঠী আরও বেশি শোষণের শিকার হয়। আর এর পেছনে সেই সরকার রাষ্ট্রের সামষ্টিক উন্নতির চিন্তাকে কারণ হিসেবে দাঁড় করায়।

রিক্সা বালিকার গল্প ॥ বাংলাদেশের মেয়ে নাইমার প্রবল ইচ্ছা রিক্সা চালানোর। সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছে কি হয়নি- তা নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন শিশু সাহিত্যিক মিতালি বোস পার্কিন্স লিখেছেন ‘রিক্সা গার্ল’ উপন্যাসটি। যা নিউইয়র্ক লাইব্রেরি নির্বাচিত গত শতাব্দীর সেরা ১০০ শিশু সাহিত্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। এ বইটি গতকাল লিট ফেস্টের মঞ্চে কথা বললেন সুপ্রভা তাসনিমের সঙ্গে।

মিতালি বোস পার্কিন্স বললেন, শিশুদের জন্য লেখার কারণ, আমি বড়দের পছন্দ করি না। শিশুদের কোনও ধরনের পূর্বানুমান থাকে না। তারা খোলা চোখে যা দেখে, যা পড়ে সেভাবেই কল্পনার রাজ্য বিস্তৃত করতে পারে। তাই শিশুদের নিয়ে, শিশুদের জন্য কাজ করতেই তার যত আগ্রহ।

প্রকাশনা শিল্পের সঙ্কট ॥ প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণনের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। ‘প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণন’ শীর্ষক আলোচনায় তারা এ শঙ্কা প্রকাশ করেন। আলোচনায় যোগ দেন প্রকাশক খান মাহাবুব, মিলনকান্তি নাথ, সৈয়দ জাকির হোসাইন, মাহরুখ মহিউদ্দীন এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘দে প্রকাশনা’র প্রকাশক অপু দে। সঞ্চালনায় ছিলেন ফিরোজ আহমেদ।

মিলনকান্তি নাথ বলেন, দুই যুগ আগে গ্রন্থনীতি করা হয়েছে। কিন্তু দশ শতাংশও পালন করা হয়নি। এটাই আমাদের বড় সঙ্কটের বিষয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশক অপু দে বলেন, ভারতে ইংরেজী বইয়ের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাংলা বইয়ের চাহিদাও সেই হারে বাড়ছে কিনা, সেটা বলতে না পারলেও কমছে না- সেটা নিশ্চিত।

অন্যান্য অধিবেশন ॥ বেলা সাড়ে বারোটায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘যে গল্পের পাঠক নেই’ শিরোনামে আলোচনা। এতে অংশ নেন কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবের, আহমেদ মোস্তফা কামাল, হামিম কামরুল হক ও রাশিদা সুলতানা। সঞ্চালনা করেন পারভেজ হোসেন। আলোচনা চলতে চলতেই নভেরা প্রদর্শনালয়ে উদ্বোধন করা হয় সান্ড্রা কুপের প্রদর্শনী ‘দ্য ট্রি অব লাইফ।

দুপুর পৌনে দুইটার পর্বে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে প্রু রোল্যান্ডসনের সঙ্গে ‘দ্য ডে দ্যাট ওয়েন্ট মিসিং’ শিরোনামে আলোচনা করেন রিচার্ড বেয়ার্ড। নভেরা প্রদর্শনালয়ে ছিল ‘দ্য রাইট টু লাই’। পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যিক গার্গ চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন জাকির কিবরিয়া, সৈয়দ মাফিজ কামাল অনিক ও ডেভিড বিয়েলো।

বিকেল তিনটার পর্বে নভেরা প্রদর্শনালয়ে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর সঞ্চালনায় ‘অনুবাদ : মূলানুগ নাকি রূপান্তর’ শিরোনামে আলোচনা করেন আলম খোরশেদ, আলিম আজিজ, মোজাফ্্ফর হোসেন ও মিহির মুসাকি। কসমিক টেন্টে ছিল ‘টেলস অব ওয়ান্ডার : মিথস্ এ্যান্ড ফেয়ারিটেলস’। স্যালি পোমি ক্লাইটন ও কায়সার হকের আলোচনায় সঞ্চালনা করেন সুমন রহমান। একই সময় নজরুল মঞ্চে ছিল মুক্তিযুদ্ধের কবি আবৃত্তি।